অনলাইনে ই-ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করার নিয়ম ২০২৬: etradelicense.gov.bd পোর্টালে আবেদন, ফি ও সারচার্জ, চালান ও কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল লাইসেন্স ডাউনলোড গাইড

Online e-Trade License Renewal Fee and Digital Download Guide Bangladesh 2026

বাংলাদেশে যেকোনো বৈধ ব্যবসা পরিচালনা, বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসাব খোলা, মার্চেন্ট পেমেন্ট গেটওয়ে সচল রাখা, আমদানি-রপ্তানি সনদ (ERC/IRC) নবায়ন, বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ প্রাপ্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ গ্রহণের একমাত্র অপরিহার্য প্রাথমিক আইনি সনদ হলো ট্রেড লাইসেন্স (Trade License)। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ) আইন অনুযায়ী প্রতিটি ব্যবসার জন্য ইস্যুকৃত এই লাইসেন্সের মেয়াদ থাকে মাত্র এক অর্থবছর অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট বছরের ১ জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। ফলে ব্যবসা যেমনই হোক—একটি ক্ষুদ্র মুদি দোকান, ই-কমার্স বা এফ-কমার্স উদ্যোগ, সফটওয়্যার এজেন্সি কিংবা বহুজাতিক করপোরেট প্রতিষ্ঠান—প্রতি বছর ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে এই ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন (Renewal) করতে হয়।

অতীতে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করা ছিল ব্যবসায়ীদের জন্য এক ক্লান্তিকর হয়রানি। ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিস, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব সার্কেলে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো, জটিল কাগুজে চালান ব্যাংকে জমা দেওয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের অতিরিক্ত ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে থাকার মতো বহু তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। তবে ২০২৬ সালে এসে সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং আইসিটি বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়াকে শতভাগ পেপারলেস ও ডিজিটাল রূপান্তর করা হয়েছে। এখন আর কোনো অফিসে যেতে হয় না; জাতীয় ট্রেড লাইসেন্স পোর্টাল etradelicense.gov.bd কিংবা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব পোর্টালে ঘরে বসেই মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটে আবেদন দাখিল, বিকাশ বা সোনালী ব্যাংক এ-চালানে ফি পরিশোধ এবং তাৎক্ষণিকভাবে কিউআর কোড সংবলিত (QR-Coded) ডিজিটাল ট্রেড লাইসেন্স ডাউনলোড করা সম্ভব। একজন সিনিয়র বিজনেস লিগ্যাল কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল নাগরিক সেবা গবেষক হিসেবে আজ আমি ২০২৬ সালের হালনাগাদ নবায়ন নীতিমালা, সরকারি ফি ও সাইনবোর্ড করের হিসাব, ৩০ সেপ্টেম্বরের সারচার্জ থেকে বাঁচার উপায়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের চেকলিস্ট এবং ধাপে ধাপে ডিজিটাল লাইসেন্স ডাউনলোড করার সম্পূর্ণ প্র্যাকটিক্যাল গাইডলাইন তুলে ধরছি:

১. ট্রেড লাইসেন্স সময়মতো নবায়ন না করলে কী কী আইনি বিপত্তি ঘটে?

অনেকেই মনে করেন ট্রেড লাইসেন্স একবার করলেই বুঝি বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু সময়মতো নবায়ন না করলে একজন উদ্যোক্তাকে মারাত্মক আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকটে পড়তে হয়:

অনবায়নকৃত লাইসেন্সের ৫টি প্রত্যক্ষ ঝুঁকি:

  1. ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও পেমেন্ট গেটওয়ে স্থগিত (Account Freeze): বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ (BFIU) ও আয়কর আইন ২০২৩-এর বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো নিয়মিত বিরতিতে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন কপি যাচাই করে। মেয়াদোত্তীর্ণ হলে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ও পিওএস (POS) মেশিন লেনদেন তাৎক্ষণিক বন্ধ করে দেওয়া হয়।
  2. বিলম্ব ফি ও চক্রবৃদ্ধি সারচার্জ (Late Surcharge): প্রতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বরের পর নবায়ন করতে গেলে মূল ফি-এর ওপর অতিরিক্ত ১০% থেকে ৩০% পর্যন্ত জরিমানা এবং মাসিক বিলম্ব সুদ ধার্য করা হয়।
  3. আমদানি-রপ্তানি ও ভ্যাট সনদ স্থগিত: কাস্টমস ও এনবিআরের অনলাইন সার্ভার ট্রেড লাইসেন্সের ডেটাবেজের সাথে সংযুক্ত। লাইসেন্স নবায়ন না থাকলে বিন (BIN) ও আইআরসি দিয়ে পণ্য খালাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
  4. স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মোবাইল কোর্ট ও জরিমানা: সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার রাজস্ব পরিদর্শকরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেন এবং অনবায়নকৃত ব্যবসার বিরুদ্ধে ৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত স্পট ফাইন করতে পারেন।
  5. টেন্ডার ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যাদেশ বাতিল: সরকারি বা করপোরেট যেকোনো দরপত্রে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে হালনাগাদ অর্থবছরের নবায়নকৃত ট্রেড লাইসেন্স দাখিল করা পূর্বশর্ত।

২. প্রয়োজনীয় সরকারি ওয়েবসাইট ও সংশ্লিষ্ট পোর্টাল লিংক

আপনার ব্যবসা যে ভৌগোলিক এলাকার অধীন, সেই অনুযায়ী সঠিক সরকারি পোর্টাল নির্বাচন করতে হবে:

  • জাতীয় কেন্দ্রীভূত ই-ট্রেড লাইসেন্স পোর্টাল: https://etradelicense.gov.bd — দেশের সমস্ত ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং অধিকাংশ সিটি কর্পোরেশনের কেন্দ্রীভূত ডিজিটাল নবায়ন পোর্টাল।
  • ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (DNCC) পোর্টাল: https://license.dncc.gov.bd — ডিএনসিসির আওতাধীন ১০টি অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষায়িত ডিজিটাল পোর্টাল।
  • ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (DSCC) পোর্টাল: https://dscc.gov.bd — ডিএসসিসির আওতাধীন অঞ্চলগুলোর অনলাইন লাইসেন্স নবায়ন ও ফি প্রদানের লিংক।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ই-রিটার্ন পোর্টাল: https://etaxnbr.gov.bd — ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে বাধ্যতামূলক আয়কর রিটার্ন প্রাপ্তিস্বীকারপত্র সংগ্রহের সরকারি পোর্টাল।

৩. ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অফিশিয়াল চেকলিস্ট

অনলাইনে আবেদন শুরু করার আগে নিচের নথিপত্রগুলোর স্পষ্ট স্ক্যান বা ছবি (সর্বোচ্চ ৫০০ কেবি, PDF বা JPEG ফরম্যাটে) সংরক্ষণ করুন:

ক্রম নথিপত্রের বিবরণ কার জন্য প্রযোজ্য? গুরুত্ব ও নিয়মাবলী
০১ বিগত অর্থবছরের মূল ট্রেড লাইসেন্সের কপি সকল বিদ্যমান ব্যবসায়ীর জন্য লাইসেন্স নম্বর, ইস্যুর তারিখ এবং পূর্ববর্তী সার্কেল নিশ্চিত করার জন্য।
০২ হালনাগাদ দোকান/অফিস ভাড়ার চুক্তিপত্র বা রসিদ ভাড়া স্পেসে পরিচালিত ব্যবসা নবায়নকৃত চলতি ভাড়ার চুক্তিপত্র অথবা বাড়ির মালিকের হালনাগাদ ভাড়ার রসিদ।
০৩ নিজস্ব জায়গার হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের দাখিলা নিজস্ব প্রাঙ্গণে পরিচালিত ব্যবসা সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভার হালনাগাদ ভূমি ও বাড়ি করের রসিদ।
০৪ মালিকের জাতীয় পরিচয়পত্র (Smart NID) ও ছবি মালিক/ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনলাইন প্রোফাইল ভেরিফিকেশন ও ওটিপি (OTP) যাচাইয়ের জন্য।
০৫ সর্বশেষ অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন দাখিলের স্লিপ কোম্পানি ও নির্দিষ্ট করদাতা আয়কর আইন অনুযায়ী ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে রিটার্ন স্লিপ দাখিল বাধ্যতামূলক।
০৬ ফায়ার লাইসেন্স ও পরিবেশ ছাড়পত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) কারখানা, কেমিক্যাল ও রেস্তোরাঁ ঝুঁকিপূর্ণ বা উৎপাদনশীল ব্যবসার ক্ষেত্রে হালনাগাদ অগ্নিনির্বাপক সনদপত্র।
০৭ সাইনবোর্ড বা বিলবোর্ডের সুনির্দিষ্ট পরিমাপ সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দোকান বা অফিসের সামনে ঝুলানো সাইনবোর্ডের সঠিক দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ (বর্গফুট)।

৪. সরকারি নবায়ন ফি, ভ্যাট, সাইনবোর্ড কর ও সারচার্জ কাঠামো ২০২৬

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আদর্শ কর তফসিল অনুযায়ী এলাকা ও ব্যবসার ধরনভেদে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ফি নির্ধারিত হয়। নিচে ২০২৬ সালের হালনাগাদ ফি চার্ট তুলে ধরা হলো:

এখতিয়ারভুক্ত প্রশাসনিক এলাকা মূল নবায়ন ফি (আনুমানিক) সরকারি ভ্যাট ও সাইনবোর্ড কর সর্বমোট পরিশোধযোগ্য ফি পেমেন্টের মাধ্যম
ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা (ক্ষুদ্র ব্যবসা/দোকান) ৩০০/- থেকে ৮০০/- টাকা ১৫% ভ্যাট প্রযোজ্য ৪৫০/- থেকে ১,০০০/- টাকা বিকাশ / নগদ / এ-চালান
পৌরসভা এলাকা (সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যবসা) ১,০০০/- থেকে ৩,০০০/- টাকা ১৫% ভ্যাট + সাইনবোর্ড ফি ১,৫০০/- থেকে ৪,২০০/- টাকা অনলাইন ব্যাংকিং / মোবাইল ওয়ালেট
সিটি কর্পোরেশন এলাকা (স্বল্প পুঁজির খুচরা ব্যবসা) ২,০০০/- থেকে ৪,০০০/- টাকা ১৫% ভ্যাট + সাইনবোর্ড কর ২,৮০০/- থেকে ৫,৫০০/- টাকা সোনালী ব্যাংক ই-সেবা / কার্ড / এমএফএস
সিটি কর্পোরেশন এলাকা (লিমিটেড কোম্পানি/আমদানি-রপ্তানি) ৫,০০০/- থেকে ২০,০০০/- টাকা ১৫% ভ্যাট + সাইনবোর্ড কর + উৎস কর ৮,০০০/- থেকে ৩০,০০০/- টাকা এ-চালান / অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে

সাইনবোর্ড কর (Signboard Tax) গণনার সঠিক নিয়ম:

  • সাধারণ আলোবিহীন সাইনবোর্ড: সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রতি বর্গফুটের জন্য বার্ষিক ৮০/- থেকে ১০০/- টাকা।
  • আলোকিত বা নিয়ন সাইনবোর্ড (LED/Neon): প্রতি বর্গফুটের জন্য বার্ষিক ১৫০/- থেকে ২০০/- টাকা।
  • উদাহরণ: আপনার দোকানের সাইনবোর্ড যদি দৈর্ঘ্যে ১০ ফুট এবং প্রস্থে ৩ ফুট হয় (মোট ৩০ বর্গফুট আলোবিহীন), তবে সাইনবোর্ড কর হবে: ৩০ × ১০০ = ৩,০০০/- টাকা।
  • বিলম্ব ফি বা সারচার্জ: প্রতি বছর ১ অক্টোবর থেকে নবায়ন করতে গেলে মূল নবায়ন ফি-এর ওপর অতিরিক্ত ১০% থেকে ৩০% সারচার্জ যুক্ত হয়।

৫. ধাপে ধাপে অনলাইনে ই-ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি

নিচের প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করে কোনো বাড়তি খরচ বা দালাল ছাড়াই সম্পূর্ণ ঘরে বসে আপনার ব্যবসার লাইসেন্স রিনিউ করুন:

ধাপ ১: পোর্টালে প্রবেশ ও লাইসেন্স অনুসন্ধান (Search License)

ব্রাউজারে সরাসরি প্রবেশ করুন: https://etradelicense.gov.bd (অথবা ঢাকার জন্য license.dncc.gov.bd)। হোমপেজে থাকা প্রধান মেনু থেকে 'ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন' (Renewal) অপশনে ক্লিক করুন। স্ক্রিনে একটি সার্চ বক্স প্রদর্শিত হবে। সেখানে আপনার পূর্ববর্তী ট্রেড লাইসেন্সে থাকা ১০ বা ১৮ ডিজিটের ডিজিটাল নম্বরটি সঠিকভাবে টাইপ করুন এবং 'অনুসন্ধান' চাপুন।

ধাপ ২: ওটিপি ভেরিফিকেশন ও তথ্য যাচাই

লাইসেন্স নম্বর দেওয়ার পর সিস্টেমে আপনার ব্যবসার নাম, মালিকের নাম এবং পূর্ববর্তী ফোন নম্বরের শেষ ৪ ডিজিট প্রদর্শিত হবে। 'ওটিপি পাঠান' বাটনে ক্লিক করলে আপনার নিবন্ধিত মোবাইলে ৪ বা ৬ ডিজিটের একটি ওটিপি কোড আসবে। ওটিপি প্রদান করে সিস্টেমে প্রবেশ করুন।

ধাপ ৩: ব্যবসায়িক তথ্য হালনাগাদ ও সাইনবোর্ড পরিমাপ এন্ট্রি

স্ক্রিনে আপনার ব্যবসার প্রোফাইল ওপেন হবে। যদি বিগত এক বছরে ব্যবসার ঠিকানা পরিবর্তন না হয়ে থাকে, তবে 'অপরিবর্তিত' রাখুন। এরপর সাইনবোর্ড অপশনে গিয়ে আপনার প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের ধরন (সাধারণ নাকি আলোকিত) নির্বাচন করুন এবং ফিতা দিয়ে মেপে সঠিক দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ লিখুন। সিস্টেম নিজে থেকেই সাইনবোর্ড কর হিসাব করে নেবে।

ধাপ ৪: প্রয়োজনীয় নথিপত্র আপলোড

পূর্বে উল্লেখিত চেকলিস্ট অনুযায়ী আপনার নবায়নকৃত দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্র বা হোল্ডিং ট্যাক্স দাখিলা, সর্বশেষ অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন প্রাপ্তিস্বীকারপত্র (Acknowledgment Slip) এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অন্যান্য সনদ স্ক্যান করে নির্দিষ্ট বক্সে আপলোড করুন।

ধাপ ৫: স্বয়ংক্রিয় ফি মূল্যায়ন ও চালান প্রদর্শন

সকল তথ্য পূরণ শেষে 'হিসাব দেখুন' (Calculate Fee) চাপুন। স্ক্রিনে মূল নবায়ন ফি, ১৫% ভ্যাট, সাইনবোর্ড কর, সারচার্জ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) এবং সর্বমোট পরিশোধযোগ্য টাকার অঙ্ক স্পষ্টভাবে ভেসে উঠবে। সবকিছু যাচাই করে 'পেমেন্টে এগিয়ে যান' (Proceed to Payment) বাটনে ক্লিক করুন।

ধাপ ৬: অনলাইন পেমেন্ট সম্পন্নকরণ

স্ক্রিনে সমন্বিত সরকারি পেমেন্ট গেটওয়ে প্রদর্শিত হবে। আপনি বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়, সোনালী ব্যাংক ইন্টারনেট ব্যাংকিং কিংবা যেকোনো ভিসা/মাস্টারকার্ড ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে তাৎক্ষণিক বিল পরিশোধ করতে পারবেন। পেমেন্ট সফল হওয়ামাত্রই স্ক্রিনে ডিজিটাল ট্রানজ্যাকশন আইডি ও সরকারি ই-চালান রসিদ প্রদর্শিত হবে।

ধাপ ৭: কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল লাইসেন্স ডাউনলোড ও প্রিন্ট

পেমেন্ট কনফার্ম হওয়ার সাথে সাথেই সিস্টেম স্বয়ক্রিয়ভাবে আপনার নবায়নকৃত ই-ট্রেড লাইসেন্স জেনারেট করবে। 'লাইসেন্স ডাউনলোড' (Download Certificate) বাটনে ক্লিক করে রঙিন পিডিএফ কপিটি সেভ করে রাখুন। এই সনদে একটি অফিশিয়াল কিউআর (QR) কোড থাকবে, যা স্ক্যান করলে বাংলাদেশ সরকারের সার্ভার থেকে লাইসেন্সটির তাৎক্ষণিক বৈধতা যাচাই করা যাবে। এটি রঙিন প্রিন্ট ও লেমিনেটিং করে আপনার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঝুলিয়ে রাখুন।

৬. ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে যে ৫টি মারাত্মক ভুল কখনোই করবেন না

অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক ব্যবসায়ী কিছু অসচেতনতার কারণে জরিমানার মুখে পড়েন। নিচের ভুলগুলো কঠোরভাবে পরিহার করুন:

  1. আয়কর রিটার্ন স্লিপ ছাড়া নবায়নের চেষ্টা করা: আয়কর আইন ২০২৩ ও স্থানীয় সরকার বিধিমালা অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশন ও পৌর এলাকায় ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে সর্বশেষ করবর্ষের ই-রিটার্ন প্রাপ্তিস্বীকারপত্র বাধ্যতামূলক। রিটার্ন জমা না দিয়ে আবেদন করলে রাজস্ব কর্মকর্তা ফাইল রিজেক্ট করে দিতে পারেন।
  2. সাইনবোর্ডের আকার গোপন বা মিথ্যা তথ্য দেওয়া: অনেকেই সাইনবোর্ড কর বাঁচাতে ৩০ বর্গফুটের সাইনবোর্ডকে ১০ বর্গফুট দেখান। পরিদর্শক দল সরেজমিনে পরিদর্শন করে অসঙ্গতি পেলে কর ফাঁকির অভিযোগে দ্বিগুণ জরিমানা এবং লাইসেন্স স্থগিত করতে পারেন।
  3. ৩০ সেপ্টেম্বরের সময়সীমা উপেক্ষা করা: ১ জুলাই থেকেই নবায়ন উইন্ডো খুলে দেওয়া হয়। অনেকেই অলসতা করে সেপ্টেম্বর পার করে দেন এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাসে গিয়ে ১০% থেকে ৩০% অতিরিক্ত সারচার্জ বা জরিমানা গুনতে বাধ্য হন।
  4. ইউনিয়ন পরিষদের লাইসেন্স নিয়ে সিটি কর্পোরেশনে ব্যবসা চালানো: কম খরচের আশায় অনেকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করে ঢাকার মতো সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা করেন। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং ধরা পড়লে প্রতিষ্ঠান সিলগালাসহ ফৌজদারি মামলা হতে পারে।
  5. পুরনো কাগুজে ম্যানুয়াল রসিদ নিয়ে বসে থাকা: যাদের এখনও সনাতন ম্যানুয়াল বইয়ের লাইসেন্স রয়েছে, তারা ডিজিটাল সিস্টেমে মাইগ্রেশন না করে বসে থাকেন। মনে রাখবেন, ব্যাংক বা সরকারি সংস্থায় এখন আর হাতে লেখা লাইসেন্স চলে না; দ্রুত অনলাইন পোর্টালে ডাটা এন্ট্রি করে ই-লাইসেন্সে রূপান্তর করে নিন।

৭. ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন সংক্রান্ত সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১: আমার পুরনো ট্রেড লাইসেন্সটি হাতে লেখা কাগুজে; আমি কি অনলাইনে সরাসরি নবায়ন করতে পারব?

উত্তর: হ্যাঁ, পারবেন। তবে প্রথমবার অনলাইন পোর্টালে আপনাকে 'পুরাতন লাইসেন্স অনলাইনকরণ' (Migrate Old License) অপশনে গিয়ে পূর্বের কাগুজে বইয়ের লাইসেন্স নম্বর, ইস্যুর সাল এবং স্ক্যান কপি আপলোড করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সার্কেলের রাজস্ব কর্মকর্তা তা যাচাই করে ডাটাবেজে এন্ট্রি দিলে আপনার নামে একটি পার্মানেন্ট ডিজিটাল নম্বর ইস্যু হবে। এরপর থেকে প্রতি বছর এক ক্লিকেই রিনিউ করা যাবে।

প্রশ্ন ২: বিগত ২ বছর ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করিনি; এখন কি আমি জরিমানা ছাড়া রিনিউ করতে পারব?

উত্তর: না, জরিমানা বা বকেয়া ছাড়া নবায়ন সম্ভব নয়। সিস্টেম আপনার পূর্ববর্তী যত বছরের নবায়ন বাকি রয়েছে, প্রতিটি বছরের মূল ফি, ১৫% ভ্যাট এবং নির্ধারিত চক্রবৃদ্ধি সারচার্জ বা বিলম্ব ফি একসাথে যোগ করে সর্বমোট বকেয়া চালান তৈরি করবে। সম্পূর্ণ বকেয়া সরকারি কোষাগারে পরিশোধ করার পরই কেবল চলতি অর্থবছরের বৈধ ডিজিটাল লাইসেন্স জেনারেট হবে।

প্রশ্ন ৩: অনলাইন থেকে ডাউনলোড করা কিউআর কোডযুক্ত ই-ট্রেড লাইসেন্স কি ব্যাংক লোন ও এলসির জন্য গ্রহণযোগ্য?

উত্তর: হ্যাঁ, শতভাগ গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সার্কুলার অনুযায়ী etradelicense.gov.bd বা সিটি কর্পোরেশনের ডিজিটাল লাইসেন্স আইনগতভাবে সম্পূর্ণ স্বয়ংসর্বস্ব। এতে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে যেকোনো ব্যাংক কর্মকর্তা এনবিআর ও সিটি সার্ভার থেকে সরাসরি সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেন। এতে কোনো ওয়ার্ড কমিশনার বা নির্বাহী কর্মকর্তার ম্যানুয়াল সিল বা স্বাক্ষরের কোনো প্রয়োজন নেই।

প্রশ্ন ৪: ই-কমার্স বা অনলাইন পেজ ভিত্তিক ব্যবসার জন্য নবায়ন ফি কি সাধারণ দোকানের চেয়ে আলাদা?

উত্তর: ই-কমার্স বা আইটি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্সের ক্যাটাগরি হয় 'আইটি অ্যানাবল সার্ভিস' (ITES) বা 'ই-কমার্স'। যদি ব্যবসার নিজস্ব কোনো ডিসপ্লে শোরুম না থাকে এবং কেবল ভার্চুয়াল বা বাসা থেকে পরিচালিত হয়, তবে সাইনবোর্ড কর মওকুফ থাকে এবং সিটি কর্পোরেশন ভেদে বার্ষিক নবায়ন ফি তুলনামূলকভাবে কম (সাধারণত ৩,০০০ থেকে ৪,৫০০ টাকার মধ্যে) হয়।

প্রশ্ন ৫: অনলাইনে ফি পরিশোধের পর কি লাইসেন্স প্রিন্ট পেতে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয়?

উত্তর: সাধারণত ফি পরিশোধ সম্পন্ন হওয়ামাত্রই সিস্টেম তাৎক্ষণিকভাবে লাইসেন্স ডাউনলোডের জন্য প্রস্তুত করে দেয়। তবে কোনো ক্ষেত্রে যদি ঠিকানা বা ক্যাটাগরি পরিবর্তনের আবেদন করা হয়ে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট রাজস্ব পরিদর্শকের অনলাইন যাচাই ও অনুমোদনের জন্য ১ থেকে ৩ কার্যদিবস সময় লাগতে পারে। অনুমোদন হওয়ামাত্রই মোবাইলে এসএমএস চলে আসে এবং পোর্টাল থেকে সরাসরি পিডিএফ নামিয়ে নেওয়া যায়।


লেখক ও গবেষক: বায়েজীদ জামান — ডিজিটাল নাগরিক সেবা ও বিজনেস লিগ্যাল কনসালট্যান্ট। korkho.blogspot.com-এর মূল লক্ষ্য সাধারণ উদ্যোক্তা ও নাগরিকদের জন্য জটিল সরকারি ও আইনি সেবাকে সহজবোধ্য ও ঝামেলামুক্ত করা।

Post a Comment

Previous Post Next Post