বাংলাদেশে পূর্বে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা মানেই ছিল এক চরম ভোগান্তি—বছরের পর বছর বিভিন্ন কর সার্কেল অফিসে ঘুরে লাইনে দাঁড়ানো, জটিল ও দুর্বোধ্য আট পাতার কাগুজে ফরম নিজ হাতে পূরণ করা, হিসাব মেলাতে না পেরে কর আইনজীবী বা মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করা এবং রিটার্ন জমা দিয়ে রিসিভিং কপির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করা। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) যুগান্তকারী ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে সেই দুঃসহ দিন এখন সম্পূর্ণ অতীত। সরকারের বিশেষায়িত পোর্টাল etaxnbr.gov.bd-এর মাধ্যমে এখন প্রতিটি নাগরিক ঘরে বসে নিজের স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ দিয়ে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটে সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে বার্ষিক অনলাইন আয়কর ই-রিটার্ন (Online e-Return) দাখিল করতে পারছেন এবং সাবমিট হওয়ামাত্রই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডাউনলোড করে নিতে পারছেন কিউআর কোডযুক্ত সরকারি রিটার্ন প্রাপ্তিস্বীকারপত্র (Acknowledgment Receipt) ও অফিশিয়াল আয়কর নির্ধারণী সনদপত্র (Income Tax Certificate)।
২০২৩ সালে জাতীয় সংসদ কর্তৃক পাসকৃত নতুন আয়কর আইন ২০২৩ (Income Tax Act 2023) কার্যকরের পর সরকারি কর্মচারী, তফসিলি ব্যাংক কর্মকর্তা, টেলিকম কোম্পানি, বহুজাতিক করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং নির্দিষ্ট কিছু পেশাজীবীদের জন্য অনলাইনে ই-রিটার্ন দাখিলকে আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সাধারণ ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের ক্ষেত্রেও সনাতন কাগুজে রিটার্নের চেয়ে অনলাইন ই-রিটার্নকেই উৎসাহিত করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময় অর্থাৎ ৩০ নভেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে কর রেয়াত (Tax Rebate) সুবিধা বাতিল হয়ে যায় এবং আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা মোতাবেক অতিরিক্ত মাসিক ২ শতাংশ বিলম্ব ফি ও এককালীন জরিমানা আরোপিত হয়। একজন অভিজ্ঞ পার্সোনাল ট্যাক্সেশন গবেষক ও ডিজিটাল নাগরিক সেবা বিশ্লেষক হিসেবে আজ আমি ২০২৬ সালের হালনাগাদ কর স্ল্যাব, পোর্টাল সাইন-আপের নিয়ম, আয়ের খাতভিত্তিক হিসাব, কর রেয়াত ক্লেইম, সম্পদ ও ব্যয় বিবরণী (IT-10B ও IT-10BB) পূরণ, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অনলাইন কর পরিশোধ এবং ইনস্ট্যান্ট ট্যাক্স সার্টিফিকেট সংগ্রহের সম্পূর্ণ এ-টু-জেড প্র্যাকটিক্যাল গাইড তুলে ধরছি:
১. অনলাইনে ই-রিটার্ন দাখিলের পূর্বে প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত ও নথিপত্র
কম্পিউটার বা মোবাইল নিয়ে বসার আগে করদাতাকে নিশ্চিত করতে হবে যে তার কাছে নিচের মৌলিক তথ্য ও নথিপত্রগুলো প্রস্তুত রয়েছে:
ই-রিটার্ন দাখিলের মূল ৪টি পূর্বশর্ত:
- নিজস্ব এনআইডিতে বায়োমেট্রিক সিম: ই-রিটার্ন পোর্টালে রেজিস্ট্রেশন করার সময় যে মোবাইল নম্বরটি দেবেন, সেটি অবশ্যই করদাতার নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (Smart NID) দিয়ে বায়োমেট্রিক ভেরিফাইড হতে হবে। অন্যের নামে থাকা সিমে ওটিপি (OTP) কোড আসবে না এবং রেজিস্ট্রেশন ব্যর্থ হবে। সিমের মালিকানা যাচাই করতে ডায়াল করুন
*16001#। - ১২ ডিজিটের কার্যকর ই-টিন নম্বর: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক ইস্যুকৃত ১২ সংখ্যার সক্রিয় টিন সার্টিফিকেট।
- ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট (১ জুলাই থেকে ৩০ জুন): করবর্ষের পূর্ববর্তী অর্থবছরের (১ জুলাই থেকে ৩০ জুন) প্রতিটি সচল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বার্ষিক স্টেটমেন্ট এবং ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাংক সুদ ও উৎসে কর কর্তন সনদ (TDS Certificate)।
- বেতন বা আয়ের প্রমাণপত্র: চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে অফিস থেকে প্রদত্ত বার্ষিক স্যালারি সার্টিফিকেট (Salary Certificate); ব্যবসায়ী হলে আয়-ব্যয়ের লাভ-ক্ষতি বিবরণী।
২. প্রয়োজনীয় সরকারি ওয়েবসাইট ও পোর্টাল লিংক
আয়কর রিটার্ন দাখিল ও কর সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রমের জন্য নিচের অফিশিয়াল সরকারি পোর্টালগুলো ব্যবহার করুন:
- অনলাইন ই-রিটার্ন পোর্টাল: https://etaxnbr.gov.bd — ই-রিটার্ন সাইন-আপ, রিটার্ন ফরম পূরণ, কর ক্যালকুলেশন এবং প্রাপ্তিস্বীকারপত্র ও ট্যাক্স সার্টিফিকেট ডাউনলোডের একমাত্র অফিশিয়াল পোর্টাল।
- ই-টিন পোর্টাল: https://incometax.gov.bd — পুরাতন টিন নম্বর চেক, টিন সার্টিফিকেট ডাউনলোড ও কর সার্কেল জানার ওয়েবসাইট।
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর): https://nbr.gov.bd — বার্ষিক আয়কর পরিপত্র, এসআরও এবং ট্যাক্স জোন ডিরেক্টরি।
৩. ই-রিটার্নে প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অফিশিয়াল চেকলিস্ট টেবিল
রিটার্ন দাখিলের সময় কোনো তথ্য যাতে বাদ না পড়ে, সেজন্য নিচের তালিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথিপত্র গুছিয়ে রাখুন:
| ক্রম | নথিপত্রের বিবরণ | কার জন্য প্রযোজ্য? | গুরুত্ব ও নিয়মাবলী |
|---|---|---|---|
| ০১ | জাতীয় পরিচয়পত্র (Smart NID) ও ই-টিন | সকল করদাতার জন্য | সার্ভারে প্রোফাইল ভেরিফিকেশন ও সার্কেল ম্যাপিংয়ের জন্য মূল পরিচিতি। |
| ০২ | বার্ষিক বেতন সনদপত্র (Salary Certificate) | সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবী | মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও উৎসব ভাতার করমুক্ত সীমা নির্ধারণ। |
| ০৩ | ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও টিডিএস (TDS) সার্টিফিকেট | যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে | ব্যাংকে জমা থাকা সমাপনী স্থিতি এবং ব্যাংক কর্তৃক সুদ থেকে কর্তিত উৎসে কর এন্ট্রি। |
| ০৪ | ডিপিএস (DPS) ও সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের প্রত্যয়ন | বিনিয়োগ রেয়াত দাবিদার | বার্ষিক সর্বোচ্চ ১,২০,০০০ টাকা ডিপিএস এবং সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর সমন্বয়ের জন্য। |
| ০৫ | জীবন বীমা প্রিমিয়াম রসিদ ও শেয়ার স্টেটমেন্ট | বীমা ও শেয়ারহোল্ডার করদাতা | প্রিমিয়াম জমা রসিদ ও বিও হিসাবের (BO Account) পোর্টফোলিও ভ্যালু বিবরণী। |
| ০৬ | বাড়িভাড়ার চুক্তিপত্র ও পৌর কর রসিদ | গৃহসম্পত্তি আয়ের ক্ষেত্রে | ভাড়াটিয়ার নাম, বার্ষিক ভাড়া প্রাপ্তি এবং পৌর কর/সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্স রসিদ। |
| ০৭ | জমি বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের সাব-কবলা দলিল | সম্পদ বিবরণী (IT-10B) পূরণকারী | অর্থবছরে নতুন জমি, ফ্ল্যাট বা গাড়ি কিনলে তার রেজিস্ট্রেশন মূল্য এন্ট্রি। |
৪. সরকারি করমুক্ত আয়ের সীমা ও আয়কর স্ল্যাব ২০২৬
ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের ক্ষেত্রে সরকারের হালনাগাদ আয়কর আইন ২০২৩ ও অর্থ আইন অনুযায়ী করমুক্ত আয়ের সাধারণ সীমা এবং প্রগ্রেসিভ ট্যাক্স স্ল্যাব নিম্নরূপ:
| করদাতার ক্যাটাগরি | করমুক্ত আয়ের সীমা (টাকা) | পরবর্তী আয়ের ওপর কর হার |
|---|---|---|
| সাধারণ করদাতা (পুরুষ) | ৩,৫০,০০০/- টাকা | প্রথম ৩.৫ লাখ টাকায় শূন্য কর |
| নারী এবং ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের করদাতা | ৪,০০,০০০/- টাকা | প্রথম ৪ লাখ টাকায় শূন্য কর |
| তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও শারীরিক প্রতিবন্ধী | ৪,৭৫,০০০/- টাকা | প্রথম ৪.৭৫ লাখ টাকায় শূন্য কর |
| গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা | ৫,০০,০০০/- টাকা | প্রথম ৫ লাখ টাকায় শূন্য কর |
| প্রতিবন্ধী সন্তানের পিতা বা মাতা | সাধারণ সীমার চেয়ে ৫০,০০০/- বেশি | সন্তান প্রতি অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা করমুক্ত |
প্রগ্রেসিভ কর হারের স্ল্যাব (করমুক্ত সীমার অতিরিক্ত আয়ের ওপর):
- পরবর্তী ১,০০,০০০ টাকার ওপর কর হার: ৫%
- পরবর্তী ৩,০০,০০০ টাকার ওপর কর হার: ১০%
- পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকার ওপর কর হার: ১৫%
- পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকার ওপর কর হার: ২০%
- অবশিষ্ট যেকোনো অতিরিক্ত আয়ের ওপর কর হার: ২৫%
৫. এলাকাভিত্তিক ন্যূনতম কর (Minimum Tax) ও পেমেন্ট কাঠামো
করদাতার করযোগ্য আয় যদি করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে এবং যাবতীয় রেয়াত বাদ দেওয়ার পরও তার করের পরিমাণ ন্যূনতম করের নিচে নেমে যায়, তবে তাকে তার ভৌগোলিক এলাকা অনুযায়ী অবশ্যই নিচের ন্যূনতম কর পরিশোধ করতে হবে:
| করদাতার ভৌগোলিক অবস্থান / এখতিয়ার | ন্যূনতম করের পরিমাণ | পরিশোধের মাধ্যম |
|---|---|---|
| ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকা | ৫,০০০/- টাকা | এ-চালান (A-Challan) / বিকাশ / নগদ / কার্ড |
| অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এলাকা (রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ইত্যাদি) | ৪,০০০/- টাকা | অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে |
| সিটি কর্পোরেশন বহির্ভূত অন্যান্য জেলা, পৌরসভা ও উপজেলা এলাকা | ৩,০০০/- টাকা | মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস / ইন্টারনেট ব্যাংকিং |
| ই-রিটার্ন পোর্টাল সাবমিশন ফি | ০/- টাকা (সম্পূর্ণ ফ্রি) | সরকারি কোনো পোর্টাল চার্জ নেই |
৬. ধাপে ধাপে অনলাইনে ই-রিটার্ন দাখিল করার পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি
নিচের প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করে আপনি কোনো আইনজীবীর সাহায্য ছাড়াই নিজে নিজে শতভাগ নির্ভুলভাবে রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন:
ধাপ ১: পোর্টালে রেজিস্ট্রেশন ও সাইন-আপ
ব্রাউজারে সরাসরি প্রবেশ করুন: https://etaxnbr.gov.bd। হোমপেজের ডানপাশে 'Registration' বাটনে ক্লিক করুন। আপনার ১২ ডিজিটের ই-টিন নম্বর এবং আপনার এনআইডি দিয়ে বায়োমেট্রিক নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরটি লিখুন। স্ক্রিনে প্রদর্শিত ক্যাপচা কোড লিখে 'Verify' চাপুন। আপনার মোবাইলে একটি ৬ ডিজিটের ওটিপি (OTP) কোড আসবে। ওটিপি প্রদান করে আপনার অ্যাকাউন্টের জন্য একটি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড সেট করুন। সফলভাবে সাইন-আপ সম্পন্ন হলে আপনার টিন নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে পোর্টালে 'Sign In' করুন।
ধাপ ২: রিটার্ন স্কিম ও অ্যাসেসমেন্ট বছর নির্বাচন
ড্যাশবোর্ডে লগইন করার পর বামপাশের মেনু থেকে 'Single Page Return' অথবা 'Detailed Return' নির্বাচন করুন।
টিপস: আপনার যদি করযোগ্য আয় না থাকে (মোট আয় ৩.৫ লাখের নিচে) এবং মোট সম্পদের পরিমাণ ৪০ লাখ টাকার কম হয়, তবে আপনি মাত্র এক পাতার অতি সহজ 'One Page Return' বা জিরো রিটার্ন দিতে পারবেন। আর যদি আপনার বেতন, বাড়িভাড়া বা ব্যবসায়িক করযোগ্য আয় থাকে, তবে 'Detailed Return' নির্বাচন করুন। এরপর অ্যাসেসমেন্ট ইয়ার (যেমন: ২০২৫-২০২৬ / ২০২৬-২০২৭) স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হবে।
ধাপ ৩: আয়ের খাত নির্বাচন (Heads of Income)
পর্দায় আয়ের বিভিন্ন উৎস প্রদর্শিত হবে। আপনার জন্য প্রযোজ্য খাতগুলোতে টিক চিহ্ন দিন:
- Salaries (বেতন): সরকারি বা বেসরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন ও ভাতাদি।
- Income from Rent (গৃহসম্পত্তি): ফ্ল্যাট, বাড়ি বা বাণিজ্যিক স্পেস ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয়।
- Agriculture (কৃষি): কৃষিজমি বা ফসলের আয়।
- Business (ব্যবসা): নিজস্ব একক মালিকানাধীন ব্যবসা বা পেশার আয়।
- Capital Gains (মূলধনী লাভ): জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি থেকে অর্জিত লাভ।
- Financial Assets / Other Sources (আর্থিক সম্পদ): ব্যাংক জমার সুদ, এফডিআরের মুনাফা, সঞ্চয়পত্রের সুদ ইত্যাদি।
ধাপ ৪: করমুক্ত ভাতা ও করযোগ্য আয়ের হিসাব এন্ট্রি
স্যালারি অপশনে গিয়ে আপনার বেতন বিবরণী অনুযায়ী বার্ষিক বেসিক স্যালারি লিখুন। নতুন আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার করমুক্ত সীমা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্যালকুলেটর হিসাব করে নেবে। ব্যাংকের তথ্যে গিয়ে আপনার সেভিংস অ্যাকাউন্টে প্রাপ্ত সুদের পরিমাণ লিখুন এবং ব্যাংক যে পরিমাণ উৎসে কর (AIT/TDS) কেটে রেখেছে, তা নির্দিষ্ট ঘরে বসান। মনে রাখবেন, ব্যাংকের কেটে রাখা উৎসে কর আপনার মোট প্রদেয় কর থেকে সরাসরি বাদ যাবে (Tax Credit)।
ধাপ ৫: বিনিয়োগ রেয়াত দাবি (Tax Rebate Claim)
যদি আপনি কর রেয়াত বা ট্যাক্স ডিসকাউন্ট পেতে চান, তবে 'Rebate' মেনুতে যান। ব্যাংকের ডিপিএস (বার্ষিক সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা), সঞ্চয়পত্র ক্রয়, জীবন বীমার প্রিমিয়াম বা তালিকাভুক্ত শেয়ার বাজারে শেয়ার ক্রয়ের তথ্য দিন। সিস্টেম আপনার করযোগ্য আয়ের ওপর ৩% অথবা মোট বিনিয়োগের ১৫% (যেটি কম) স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণনা করে মূল কর থেকে ছাড় বা মওকুফ করে দেবে।
ধাপ ৬: সম্পদ ও ব্যয় বিবরণী (IT-10B ও IT-10BB) পূরণ
যদি আপনার মোট স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪০ লাখ টাকার বেশি হয়, অথবা আপনার নামে ব্যক্তিগত গাড়ি থাকে, তবে IT-10B (Statement of Assets and Liabilities) পূরণ বাধ্যতামূলক। এতে আপনার জমি, ফ্ল্যাট, আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক্স এবং ব্যাংকে থাকা সমাপনী স্থিতি উল্লেখ করুন। পারিবারিক জীবনযাত্রার বার্ষিক মোট ব্যয় IT-10BB ঘরে লিখুন।
ধাপ ৭: কর গণনা ও অনলাইন পেমেন্ট
সব তথ্য দেওয়া শেষ হলে 'Tax Computation' পেজে যান। সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার নিট প্রদেয় কর (Net Payable Tax) প্রদর্শন করবে। যদি প্রদেয় কর শূন্য হয়, তবে কোনো টাকা দিতে হবে না। আর যদি কর প্রদেয় হয়, তবে পেজের নিচে 'Pay Now' বাটনে ক্লিক করে সোনালী ব্যাংক এ-চালান, বিকাশ, নগদ, রকেট বা ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সরকারি কোষাগারে কর পরিশোধ করুন। পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ামাত্রই চালানের ট্রানজ্যাকশন আইডি সিস্টেমে যুক্ত হয়ে যাবে।
ধাপ ৮: ফাইনাল সাবমিশন ও সার্টিফিকেট ডাউনলোড
সম্পূর্ণ রিটার্নের একটি খসড়া প্রিভিউ (View Draft) দেখে নিন। সবকিছু সঠিক থাকলে 'Submit Return' বাটনে ক্লিক করে চূড়ান্ত সম্মতি দিন। সাথে সাথেই স্ক্রিনে অভিনন্দন বার্তা ভেসে উঠবে এবং আপনি দুটি পিডিএফ ফাইল ডাউনলোডের অপশন পাবেন:
- Acknowledgment Receipt (প্রাপ্তিস্বীকারপত্র): এটি প্রমাণ করে যে আপনি উক্ত করবর্ষের রিটার্ন সফলভাবে দাখিল করেছেন।
- Tax Certificate (কর নির্ধারণী সনদপত্র): কিউআর কোড সংবলিত আকর্ষণীয় ডিজিটাল সার্টিফিকেট, যা ব্যাংক লোন, ক্রেডিট কার্ড, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ভিসা প্রসেসিংয়ে চূড়ান্ত প্রমাণপত্র হিসেবে গণ্য হবে।
৭. ই-রিটার্ন দাখিলে যে ৫টি মারাত্মক ভুল কখনোই করবেন না
অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সময় সামান্য অসতর্কতায় করদাতারা অডিট বা জরিমানার মুখে পড়েন। নিচের ৫টি ভুল কঠোরভাবে এড়িয়ে চলুন:
- ব্যাংকের উৎসে কর (TDS) ও মুনাফা গোপন করা: অনেকেই ভাবেন ব্যাংকে জমানো টাকার সুদ ট্যাক্স ফাইলে না দেখালেও চলবে। মনে রাখবেন, এনবিআরের কেন্দ্রীয় সার্ভার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের সমস্ত ব্যাংকের সাথে রিয়েল-টাইম সংযুক্ত। ব্যাংকে সুদ পেলে তা অবশ্যই দেখাতে হবে এবং ব্যাংক যে কর কেটেছে তা ক্রেডিট হিসেবে ক্লেইম করতে হবে। গোপন করলে কর ফাঁকির মামলা হতে পারে।
- ভুলবশত অন্যের সিম দিয়ে সাইন-আপ করার চেষ্টা: যে সিমের বায়োমেট্রিক আপনার নিজের এনআইডির সাথে মেলেনি, তা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করলে সিস্টেম স্থায়ীভাবে এরর দেখাবে। সর্বদা নিজের এনআইডি দিয়ে কেনা সিম ব্যবহার করুন।
- সম্পদ ও আয়ের হিসাবে অসংগতি (Unexplained Wealth): আপনার বার্ষিক আয় হয়তো ৫ লাখ টাকা, কিন্তু সম্পদ বিবরণীতে হঠাৎ ২০ লাখ টাকার নতুন সম্পদ যুক্ত করে দিলেন যার কোনো বৈধ আয়ের উৎস বা ঋণের হিসাব নেই। এমনটি হলে ডিসিটি অফিস ফাইল অডিটে পাঠাবে এবং অপ্রদর্শিত আয়ের ওপর ২৫% হারে কর ও জরিমানা করবে।
- ৩০ নভেম্বরের সময়সীমা পার করা: সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রতি বছর ৩০ নভেম্বর হলো 'ট্যাক্স ডে' (Tax Day)। সময় পার হয়ে গেলে কর রেয়াত (Rebate) আর পাওয়া যায় না এবং প্রতি মাসের জন্য ২% অতিরিক্ত বিলম্ব সুদ দিতে হয়।
- ড্রাফট সেভ না করে সরাসরি সাবমিট করে দেওয়া: চূড়ান্ত সাবমিট বাটনে চাপ দেওয়ার পর তথ্য সংশোধনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত ও জটিল। তাই প্রতিটি পেজ পূরণ করে ড্রাফট সেভ করুন এবং ফাইনাল প্রিভিউ অন্তত দুইবার রিভিশন দিন।
৮. ই-রিটার্ন সংক্রান্ত সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: আমি যদি কোনো চাকরি বা ব্যবসা না করি, শুধু জমি কেনা বা ক্রেডিট কার্ডের জন্য টিন খুলেছিলাম; আমার কি ই-রিটার্ন দিতে হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই দিতে হবে। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী একবার কারও নামে ১২ ডিজিটের ই-টিন ইস্যু হলে তার ওপর বার্ষিক রিটার্ন দাখিলের স্থায়ী আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। আপনার কোনো আয় না থাকলেও পোর্টালে গিয়ে অতি সহজে ১ পাতার 'Zero Return' সাবমিট করে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র নিয়ে রাখতে হবে। রিটার্ন না দিলে ভবিষ্যতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ ও জরিমানা হতে পারে।
প্রশ্ন ২: ই-রিটার্ন সিস্টেমে কি ভুল হলে সংশোধনের (Revised Return) কোনো সুযোগ আছে?
উত্তর: হ্যাঁ, সুযোগ রয়েছে। সাধারণ রিটার্ন সাবমিট করার পর যদি করদাতা কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল (যেমন: আয়ের হিসাব বা ব্যাংক তথ্যে ত্রুটি) চিহ্নিত করেন, তবে আয়কর আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পোর্টালে সংশোধিত রিটার্ন বা Revised Return দাখিল করার আবেদন করা যায়। তবে জটিলতা এড়াতে সাবমিট করার আগেই ড্রাফট কপি নিখুঁতভাবে রিভিশন দেওয়া শ্রেয়।
প্রশ্ন ৩: অনলাইনে ই-রিটার্ন দাখিল করার পর কি কোনো কাগজপত্র সশরীরে কর অফিসে গিয়ে জমা দিতে হয়?
উত্তর: না, একদমই না। এটিই অনলাইন ই-রিটার্নের সবচেয়ে বড় সুবিধা। etaxnbr পোর্টালে রিটার্ন সাবমিট করার পর আর কোনো কর সার্কেল অফিসে যেতে হয় না এবং কোনো সনদের হার্ডকপি জমা দিতে হয় না। সিস্টেম থেকে ডাউনলোড করা কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল প্রাপ্তিস্বীকারপত্রই আইনগতভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত।
প্রশ্ন ৪: ই-রিটার্নের ট্যাক্স সার্টিফিকেট দিয়ে কি ব্যাংক লোন ও বিদেশের ভিসা প্রসেস করা যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, শতভাগ গ্রহণযোগ্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন পোর্টাল থেকে জেনারেট হওয়া প্রত্যয়নপত্র ও প্রাপ্তিস্বীকারপত্রে একটি বিশেষায়িত ডিজিটাল কিউআর (QR) কোড এবং বারকোড থাকে। যেকোনো ব্যাংক কর্মকর্তা, দূতাবাস বা সরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের স্মার্টফোন দিয়ে কিউআর কোড স্ক্যান করে এনবিআরের কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে তাৎক্ষণিক সত্যতা যাচাই করে নিতে পারে। কোনো সরকারি অফিসারের ম্যানুয়াল সিলের প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন ৫: সরকারি চাকুরিজীবীদের ক্ষেত্রে কি সাধারণ জিপিএফ (GPF) বিনিয়োগে রেয়াত পাওয়া যায়?
উত্তর: হ্যাঁ। সরকারি কর্মকর্তাদের জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড (GPF)-এ মাসিক যে অর্থ কর্তন করা হয়, তা ই-রিটার্নের 'Rebate' সেকশনে পিএফ কন্ট্রিবিউশন হিসেবে দেখালে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হারে কর রেয়াত বা ট্যাক্স ছাড় সরাসরি কার্যকর হয়।
লেখক ও গবেষক: বায়েজীদ জামান — ডিজিটাল নাগরিক সেবা ও পার্সোনাল ট্যাক্সেশন পরামর্শক। korkho.blogspot.com-এর মূল লক্ষ্য সাধারণ নাগরিকদের জন্য জটিল সরকারি ও ডিজিটাল সেবাকে সহজবোধ্য করা এবং কর সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
Post a Comment