বাংলাদেশে যেকোনো স্থাবর সম্পত্তি বা জমিজমার মালিকানা প্রমাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে মৌলিক এবং অলঙ্ঘনীয় আইনি দলিল হলো খতিয়ান বা পর্চা (Khatian / Porcha)। আপনি যদি জমি ক্রয়-বিক্রয় করতে চান, রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল সম্পাদন করতে চান, ব্যাংকে জমি বন্ধক রেখে গৃহনির্মাণ বা কৃষি ঋণ নিতে চান, ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ করতে চান, কিংবা এসি ল্যান্ড (AC Land) অফিসে মিউটেশন বা নামজারি আবেদন করতে চান—সর্বত্রই হালনাগাদ খতিয়ানের সত্যায়িত বা সার্টিফাইড কপি থাকা বাধ্যতামূলক। অতীতে একটি খতিয়ান বা পর্চা তুলতে সাধারণ মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হতো। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের (DC Office) রেকর্ড রুমে মাসের পর মাস ঘুরে, অসাধু মুহুরি ও দালালের খপ্পরে পড়ে হাজার হাজার টাকা খরচ করেও অনেক সময় জাল বা ঘষামাজা করা ভুয়া পর্চা হাতে পেতেন নাগরিকরা।
এই শতবর্ষী জটিলতা দূর করতে এবং নাগরিকদের দোরগোড়ায় ভূমি সেবা পৌঁছে দিতে বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় চালু করেছে সর্বাধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ই-পর্চা পোর্টাল (eporcha.gov.bd)। এই জাতীয় ভূমি সেবা পোর্টালের মাধ্যমে দেশের প্রায় সব মৌজার সিএস (CS), এসএ (SA), আরএস (RS), বিএস/বিআরএস (BS/BRS) এবং সিটি জরিপের খতিয়ান ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। বর্তমানে কোনো নাগরিককে আর ডিসি অফিসে সশরীরে গিয়ে লাইন ধরতে হয় না। ঘরে বসে নিজের স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করে মাত্র কয়েক মিনিটে খতিয়ান যাচাই করা যায়, তাৎক্ষণিক ২০ টাকায় অনলাইন কিউআর কোডযুক্ত কপি ডাউনলোড করা যায় এবং ডিসি অফিসের রেকর্ড রুমের সিল-স্বাক্ষর সম্বলিত অফিশিয়াল 'সার্টিফাইড কপি' (Certified Copy) মাত্র ১০০ টাকায় সরাসরি বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে নিজের বাড়ির ঠিকানায় হোম ডেলিভারি পাওয়া যায়। একজন অভিজ্ঞ ডিজিটাল ভূমি সেবা বিশ্লেষক ও নাগরিক আইন গবেষক হিসেবে আজ আমি ২০২৬ সালের হালনাগাদ সিস্টেম অনুযায়ী eporcha.gov.bd পোর্টালে খতিয়ান অনুসন্ধান, অনলাইন কপি বনাম সার্টিফাইড কপির পার্থক্য, সরকারি ফি এবং ডাকযোগে খতিয়ান পাওয়ার সম্পূর্ণ এ-টু-জেড প্র্যাকটিক্যাল গাইড বিস্তারিত তুলে ধরছি:
১. খতিয়ান বা পর্চা কী এবং জরিপভেদে খতিয়ানের ৪টি প্রধান প্রকারভেদ
আইনি ভাষায় খতিয়ান হলো ভূমিস্বত্ব সংরক্ষণ ও রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে জরিপ বিভাগ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত জমির স্বত্বলিপি (Record of Rights বা ROR)। এতে জমির মৌজা, জেএল নম্বর, দাগ নম্বর, জমির শ্রেণি (নাল, ভিটি, পুকুর, বাড়ি ইত্যাদি), জমির পরিমাণ এবং জমির প্রকৃত মালিক ও তার অংশের সুনির্দিষ্ট বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত ভূমিস্বত্ব জরিপের ভিত্তিতে খতিয়ান প্রধানত ৪টি শ্রেণিতে বিভক্ত:
বাংলাদেশে প্রচলিত ৪টি প্রধান জরিপ ও তাদের বৈশিষ্ট্য:
- সিএস খতিয়ান (CS - Cadastral Survey): ১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনামলে পরিচালিত ভারত উপমহাদেশের প্রথম বিজ্ঞানসম্মত ও ঐতিহাসিক ভূমি জরিপ। এটি সব খতিয়ানের আদি উৎস বা মূল ভিত্তি। জমির ধারাবাহিক মালিকানা বা শিকড় খুঁজতে সিএস খতিয়ানের প্রয়োজন হয়।
- এসএ খতিয়ান (SA - State Acquisition Survey): ১৯৫০ সালের জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের পর ১৯৫৬ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে জমিদারদের কাছ থেকে প্রজা বা কৃষকদের নামে সরাসরি জমির মালিকানা রেকর্ড করার জন্য এই জরিপ হয়। জরুরি ভিত্তিতে আগের সিএস রেকর্ড সংশোধন করে এটি প্রস্তুত করা হয়েছিল।
- আরএস খতিয়ান (RS - Revisional Survey): এসএ রেকর্ডের বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন এবং সরেজমিনে নতুন নকশা তৈরি করে পরিচালিত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও নিখুঁত জরিপ। এটিই বর্তমানে বাংলাদেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে মালিকানা যাচাইয়ের প্রধান মানদণ্ড।
- বিএস / বিআরএস / সিটি জরিপ (BS / BRS / City Survey): ১৯৯৮-২০০০ সাল থেকে শুরু হওয়া আধুনিক বাংলাদেশ জরিপ। ঢাকা মহানগরে এটি 'সিটি জরিপ' নামে পরিচিত। যেসব এলাকায় বিএস চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত ও গেজেটভুক্ত হয়েছে, সেখানে জমি হস্তান্তর ও নামজারির জন্য বিএস খতিয়ানই চূড়ান্ত ভিত্তি।
২. অনলাইন কপি বনাম সার্টিফাইড কপি: কোনটির কী আইনি মর্যাদা?
ই-পর্চা পোর্টালে খতিয়ানের দুটি বিকল্প পাওয়া যায়। কোনটি কোন কাজে ব্যবহার করা যায়, তা না জানার কারণে অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়েন:
| তুলনার বিষয় | খতিয়ানের অনলাইন কপি (Online Copy) | খতিয়ানের সার্টিফাইড কপি (Certified Copy) |
|---|---|---|
| প্রস্তুতির মাধ্যম | ওয়েবসাইট থেকে তাৎক্ষণিক ডাউনলোডযোগ্য প্রিন্ট কপি (সিস্টেম জেনারেটেড)। | ডিসি অফিসের রেকর্ড রুমের সহকারী কমিশনার ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক মূল খতিয়ানের সাথে মিলিয়ে সিল ও সইযুক্ত অফিশিয়াল কপি। |
| পাওয়ার সময়কাল | ফি পরিশোধের সাথে সাথে তাৎক্ষণিক (Instant) স্ক্রিনে দেখা যায় ও পিডিএফ ডাউনলোড করা যায়। | সাধারণ ডেলিভারিতে ৭ থেকে ১০ কার্যদিবস; জরুরি ডেলিভারিতে ৩ থেকে ৫ কার্যদিবস (ডাকযোগে বা কাউন্টারে)। |
| সরকারি ফি | এককালীন ২০/- টাকা (বিকাশ/নগদ/উপায় ইত্যাদি)। | কোর্ট ফি ও প্রসেসিং ফি ৫০/- টাকা + ডাকযোগে ডেলিভারি চার্জ ৪০-৫০/- টাকা (সর্বমোট ১০০/- টাকা)। |
| আইনি ও দাপ্তরিক ব্যবহার | • সাধারণ তথ্য যাচাই ও দাগ নম্বর মেলানো • অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) হোল্ডিং এন্ট্রি • প্রাথমিক ই-নামজারি আবেদনের সাথে আপলোড। |
• রেজিস্ট্রি অফিসে জমি ক্রয়-বিক্রয় ও সাফ-কবলা দলিল সম্পাদন • দেওয়ানি আদালতে জমিজমা সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমা • ব্যাংক থেকে জমির বিপরীতে মর্টগেজ বা ঋণ গ্রহণ। |
| আদালতে সাক্ষ্যমূল্য | সাক্ষ্য আইনের আওতায় আদালতে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গৃহীত নয় (তথ্যগত রেফারেন্স মাত্র)। | ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ধারা ৭৬ ও ৭৭ অনুযায়ী আদালতে চূড়ান্তভাবে গ্রহণযোগ্য সরকারি দলিল। |
৩. ই-পর্চা পোর্টালে খতিয়ান খোঁজার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের চেকলিস্ট
পোর্টালে সার্চ করার পূর্বে আপনার জমির নিচের ৫টি মৌলিক প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক তথ্য হাতের কাছে রাখুন:
| ক্রম | প্রয়োজনীয় তথ্যের নাম | কোথায় পাওয়া যাবে ও বিস্তারিত বিবরণ |
|---|---|---|
| ১ | বিভাগ, জেলা ও উপজেলা / সার্কেল | জমিটি যে প্রশাসনিক এলাকার অন্তর্গত (যেমন: ঢাকা বিভাগ -> ঢাকা জেলা -> ধানমন্ডি রাজস্ব সার্কেল)। |
| ২ | জরিপের ধরন (Survey Type) | আপনি কোন রেকর্ডের খতিয়ান তুলতে চান (CS, SA, RS, BS নাকি দিয়ারা/সিটি জরিপ)। |
| ৩ | মৌজা ও জেএল নম্বর (JL Number) | জমির মৌজার নাম ও সুনির্দিষ্ট জুরিসডিকশন লিস্ট বা জেএল নম্বর (যেমন: ধানমন্ডি মৌজা, জেএল নং-১৯)। পূর্বের কোনো দলিল বা খাজনার রসিদে জেএল নম্বর লেখা থাকে। |
| ৪ | খতিয়ান নম্বর অথবা দাগ নম্বর / মালিকের নাম | নির্দিষ্ট খতিয়ান নম্বর জানা থাকলে সরাসরি পাওয়া যায়। না থাকলে জমির দাগ নম্বর অথবা মূল রেকর্ডের মালিকের নাম দিয়েও সার্চ করা যায়। |
| ৫ | আবেদনকারীর এনআইডি ও সচল মোবাইল নম্বর | সার্টিফাইড কপির আবেদন করার সময় ওটিপি (OTP) ভেরিফিকেশন এবং ডেলিভারি ট্র্যাকিংয়ের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও মোবাইল নম্বর প্রয়োজন হয়। |
৪. খতিয়ান ও ই-পর্চার সরকারি ফি এবং ডাক মাশুল তালিকা ২০২৬
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত আধুনিক অটোমেটেড পেমেন্ট সিস্টেমে কোনো বাড়তি পয়সা নেওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৬ সালের হালনাগাদ ফি চার্ট:
| সেবার ধরন | ডেলিভারি মাধ্যম | সরকারি কোর্ট ফি | ডাকমাশুল / চার্জ | সর্বমোট পরিশোধযোগ্য ফি |
|---|---|---|---|---|
| অনলাইন কপি (PDF) | সরাসরি স্ক্রিনে ডাউনলোড | ২০/- টাকা | ০/- টাকা | ২০/- টাকা |
| সার্টিফাইড কপি (সাধারণ) | বাংলাদেশ ডাক বিভাগ (রেজিস্টার্ড ডাক) | ৫০/- টাকা | ৫০/- টাকা | ১০০/- টাকা |
| সার্টিফাইড কপি (জরুরি) | বাংলাদেশ ডাক বিভাগ (দ্রুত ডাক) | ১০০/- টাকা | ৫০/- টাকা | ১৫০/- টাকা |
| সার্টিফাইড কপি (সরাসরি সংগ্রহ) | ডিসি অফিস রেকর্ড রুম কাউন্টার | ৫০/- টাকা | ০/- টাকা | ৫০/- টাকা |
* পেমেন্ট পার্টনার: উপায় (Upay), বিকাশ (bKash), নগদ (Nagad), রকেট (Rocket), এবং সরকারি একপে (EkPay) গেটওয়ের মাধ্যমে ভিসা/মাস্টারকার্ড দিয়ে ঘরে বসেই ফি পরিশোধ করা যায়।
৫. eporcha.gov.bd পোর্টালে খতিয়ান অনুসন্ধান ও অনলাইন কপি ডাউনলোডের নিয়ম
আপনার কাছে যদি জমির খতিয়ান নম্বর জানা নাও থাকে, তবুও খুব সহজে জমি খুঁজে বের করে অনলাইন কপি ডাউনলোড করার ৭টি সহজ ধাপ:
অনলাইন কপি সংগ্রহের প্র্যাকটিক্যাল স্টেপ-বাই-স্টেপ প্রসেস:
- ধাপ ১ (পোর্টালে প্রবেশ):
যেকোনো ব্রাউজার থেকে বাংলাদেশ ভূমি মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল খতিয়ান পোর্টাল https://eporcha.gov.bd-এ প্রবেশ করুন। (অথবা কেন্দ্রীয় ভূমি পোর্টাল https://land.gov.bd থেকে 'খতিয়ান' অপশনে ক্লিক করুন)। - ধাপ ২ (খতিয়ান অনুসন্ধান মেনু):
হোমপেজের উপরের প্রধান মেনু থেকে 'খতিয়ান অনুসন্ধান' (Khatian Search) অপশনে ক্লিক করুন। - ধাপ ৩ (প্রশাসনিক ঠিকানা নির্বাচন):
স্ক্রিনে ড্রপডাউন মেনু আসবে। ধারাবাহিকভাবে আপনার জমির 'বিভাগ' -> 'জেলা' -> 'উপজেলা/সার্কেল' নির্বাচন করুন। - ধাপ ৪ (জরিপ ও মৌজা নির্ধারণ):
এরপর খতিয়ানের ধরন বা জরিপের নাম নির্বাচন করুন (যেমন: CS, SA, RS, বা BS)। জরিপ নির্বাচন করার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট উপজেলার সকল মৌজার তালিকা ও জেএল নম্বর নিচে ভেসে উঠবে। আপনার নির্দিষ্ট মৌজাটি সিলেক্ট করুন। - ধাপ ৫ (খতিয়ান বা দাগ নম্বর দিয়ে সার্চ):
মৌজা সিলেক্ট করার পর স্ক্রিনের ডানপাশে খতিয়ান তালিকার বক্স আসবে। আপনি সরাসরি আপনার 'খতিয়ান নম্বর' লিখে খুঁজুন দিতে পারেন। খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলে 'দাগ নম্বর দিয়ে খুঁজুন' বা 'মালিকের নাম দিয়ে খুঁজুন' রেডিও বাটনে টিক দিয়ে দাগ নম্বর বা রেকর্ডীয় মালিকের নাম লিখে সার্চ দিন। সাথে সাথে কাঙ্ক্ষিত খতিয়ান নম্বরটি প্রদর্শিত হবে। - ধাপ ৬ (খতিয়ান প্রিভিউ ও ডাবল ক্লিক):
খতিয়ান নম্বরের ওপর মাউস দিয়ে ডাবল ক্লিক (Double Click) করুন। সাথে সাথে নিচে খতিয়ানের সংক্ষিপ্ত বিবরণী (মালিকের নাম, পিতা/স্বামীর নাম, দাগ নম্বর, জমির শ্রেণি ও অংশ) প্রদর্শিত হবে। - ধাপ ৭ (অনলাইন কপি বাটন ও পেমেন্ট):
প্রিভিউ বক্সের নিচে দুটি লাল/নীল বাটন দেখতে পাবেন—একটি 'অনলাইন কপি', অন্যটি 'আবেদন করুন' (সার্টিফাইড কপি)। দ্রুত কাজের জন্য 'অনলাইন কপি'-তে ক্লিক করুন। আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ ও মোবাইল নম্বর দিয়ে যাচাই করুন। এরপর ২০ টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করলেই স্ক্রিনে সাথে সাথে ডিজিটাল কিউআর কোডসহ পূর্ণাঙ্গ অনলাইন খতিয়ান চলে আসবে। এটি সেভ বা রঙিন প্রিন্ট করে নিন।
৬. ডাকযোগে খতিয়ানের 'সার্টিফাইড কপি' আবেদন ও পাওয়ার সম্পূর্ণ পদ্ধতি
জমির সাফ-কবলা দলিল রেজিস্ট্রি বা আদালতের কাজের জন্য জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুমের মূল সিলমোহরযুক্ত সার্টিফাইড কপি তোলার নিখুঁত প্রসেস:
- সার্টিফাইড কপি আবেদন বাটনে ক্লিক:
পূর্বের নিয়মে খতিয়ান প্রিভিউ হওয়ার পর নিচে থাকা 'আবেদন করুন' বাটনে ক্লিক করুন। - ডেলিভারির মাধ্যম নির্বাচন (Delivery Method):
ফরমটিতে দুটি অপশন আসবে—'অফিস কাউন্টার' এবং 'ডাকযোগ'। ঘরে বসে পেতে চাইলে অবশ্যই 'ডাকযোগ' (Post Office) নির্বাচন করুন। ডাকযোগ সিলেক্ট করলে আপনার সামনে ডেলিভারির ধরন আসবে—'সাধারণ' (১০০ টাকা) অথবা 'জরুরি' (১৫০ টাকা)। - আবেদনকারীর ঠিকানা ও ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ:
আবেদনকারীর পূর্ণ নাম, পিতার নাম, এনআইডি নম্বর, মোবাইল নম্বর এবং যে ঠিকানায় ডাকপিয়ন চিঠিটি পৌঁছে দেবে সেই পোস্ট অফিসের নাম, পোস্ট কোড, গ্রাম/রোড ও বিস্তারিত ঠিকানা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে ইংরেজিতে বা বাংলায় টাইপ করুন। - অনলাইন পেমেন্ট সম্পন্নকরণ:
'ফি পরিশোধ' সেকশনে গিয়ে বিকাশ, নগদ বা উপায় সিলেক্ট করুন। মোট ১০০/- টাকা (৫০ টাকা কোর্ট ফি + ৫০ টাকা ডাকমাশুল) পরিশোধ করুন। ট্রানজেকশন সফল হলে স্ক্রিনে একটি বারকোডযুক্ত 'আবেদন রসিদ' (Application Receipt) এবং ট্র্যাকিং নম্বর (Application ID) আসবে। এটি পিডিএফ ফরম্যাটে সেভ করে প্রিন্ট করে রাখুন। - ডিসি অফিস কর্তৃক যাচাই ও ডাকযোগে প্রেরণ:
আপনার আবেদনটি সরাসরি সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুমে পৌঁছে যাবে। রেকর্ড রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত মোহরার মূল বালাম বই থেকে খতিয়ানটি কপি করে সহকারী কমিশনার (রেকর্ড রুম) কর্তৃক স্বাক্ষর ও সরকারি সিল দিয়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের নিকট হস্তান্তর করবেন। - হোম ডেলিভারি গ্রহণ:
আবেদনের ৭ থেকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ডাকপিয়ন আপনার প্রদত্ত ঠিকানায় এসে সরকারি সিকিউরিটি খামে মোড়ানো সার্টিফাইড খতিয়ান পৌঁছে দেবে। ডেলিভারি পাওয়ার সময় কোনো অতিরিক্ত বকশিশ বা টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
৭. আবেদন স্ট্যাটাস ও ডাক ট্র্যাকিং (Tracking ePorcha Status)
আবেদন করার পর আপনার খতিয়ানের কাজ কতদূর এগুলো তা ঘরে বসেই ট্র্যাক করা যায়:
- আবেদন ট্র্যাকিং পোর্টালে লগইন: eporcha.gov.bd-এর হোমপেজে গিয়ে 'আবেদন ট্র্যাকিং' (Application Tracking) মেনুতে ক্লিক করুন।
- ট্র্যাকিং নম্বর ও মোবাইল নম্বর ইনপুট: আবেদনের পর প্রাপ্ত Application ID এবং আবেদন করার সময় ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি টাইপ করে 'খুঁজুন' বাটনে চাপ দিন।
- স্ট্যাটাস চেক: আপনার আবেদনটি 'অনুমোদনের অপেক্ষায়', 'প্রক্রিয়াধীন', 'স্বাক্ষরিত' নাকি 'ডাকযোগে প্রেরিত'—তা স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। ডাকযোগে প্রেরিত হলে সেখানে ডাক বিভাগের কুরিয়ার ট্র্যাকিং নম্বর (Consignment Number) প্রদর্শিত হবে, যা দিয়ে বাংলাদেশ পোস্ট অফিসের ট্র্যাকিং পোর্টালে গিয়ে পার্সেলের বর্তমান অবস্থানও দেখা সম্ভব।
৮. ই-পর্চা ও খতিয়ান উত্তোলনে সাধারণ ৫টি মারাত্মক ভুল ও সতর্কতা
- ভুল জরিপ নির্বাচন করা: এটি সবচেয়ে সাধারণ ভুল। জমিটি যদি আরএস রেকর্ডের হয়, কিন্তু আপনি পোর্টালে সিএস বা এসএ সিলেক্ট করে দাগ নম্বর বা নাম খুঁজছেন, তবে সিস্টেম দেখাবে 'কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি'। তাই পূর্ববর্তী দলিল বা পর্চা দেখে নিশ্চিত হোন আপনার এলাকার জন্য কোন জরিপটি প্রযোজ্য।
- অনলাইন কপি দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করতে যাওয়া: অনেকেই তাড়াহুড়ো করে ২০ টাকার অনলাইন কপি প্রিন্ট করে জমি রেজিস্ট্রি করতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে চলে যান। সাব-রেজিস্ট্রার এই কপি দিয়ে কখনোই দলিল রেজিস্ট্রি করবেন না; জমি রেজিস্ট্রির জন্য ডিসি অফিসের সিলযুক্ত সার্টিফাইড কপি বাধ্যতামূলক।
- ডাক ঠিকানায় পোস্ট কোড ভুল দেওয়া: সার্টিফাইড কপি আবেদনের সময় নিজের ইউনিয়ন বা এলাকার সঠিক ৪ ডিজিটের পোস্ট কোড (Postal Code) দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল পোস্ট কোড দিলে চিঠি অন্য জেলার ডাকঘরে চলে গিয়ে ডেলিভারিতে তীব্র কালক্ষেপণ হতে পারে।
- নামজারি খতিয়ানকে সাধারণ জরিপ খতিয়ানে খোঁজা: আপনার জমিটি যদি মূল মালিকের কাছ থেকে কিনে নামজারি (Mutation) করা হয়ে থাকে, তবে সেই খতিয়ানটি সাধারণত eporcha-এর সাধারণ সিএস/আরএস মেনুতে থাকে না। নামজারি খতিয়ান যাচাইয়ের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের mutation.land.gov.bd পোর্টালে গিয়ে নামজারি খতিয়ান চেক করতে হয়।
- দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকায় খতিয়ান তোলা: অনেক ভূমি অফিসের সামনে দালালরা বলে—"অনলাইনে আবেদন করলে পর্চা আসবে না, আমাকে ৫০০ টাকা দেন আমি কালকেই এনে দিচ্ছি।" এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। অনলাইনে ডাকযোগে আবেদন করলে শতভাগ নির্ভুলভাবে সরকারি সিলযুক্ত সার্টিফাইড কপি পৌঁছে যায়। দালালের পেছনে অযথা টাকা নষ্ট করবেন না।
৯. ই-পর্চা সংক্রান্ত সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. eporcha পোর্টালে সার্চ দিয়ে খতিয়ান খুঁজে না পেলে বা 'কোন তথ্য পাওয়া যায়নি' দেখালে করণীয় কী?
যদি আপনার মৌজা ও দাগ নম্বর সঠিক থাকা সত্ত্বেও অনলাইনে খতিয়ান না পাওয়া যায়, তবে বুঝতে হবে সংশ্লিষ্ট বালাম বইটি এখনো ডিজিটালাইজড বা এন্ট্রি করা হয়নি (কিছু দুর্গম বা জটিল মৌজায় এখনো স্ক্যানিং চলছে)। এই ক্ষেত্রে আপনাকে সরাসরি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের (DC Office) রেকর্ড রুমে গিয়ে অফলাইন নির্ধারিত ফরমে ম্যানুয়ালি কোর্ট ফি দিয়ে সার্টিফাইড কপির আবেদন জমা দিতে হবে।
২. সার্টিফাইড খতিয়ানের মেয়াদ কতদিন থাকে? একবার তুললে কি আজীবন ব্যবহার করা যায়?
খতিয়ান কোনো পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্স নয় যে এর মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। মূল রেকর্ড সংশোধন না হওয়া বা নতুন জরিপ (যেমন আরএস-এর পর বিএস) চূড়ান্ত গেজেট না হওয়া পর্যন্ত একটি সার্টিফাইড খতিয়ান বছরের পর বছর বৈধ থাকে। তবে জমি বিক্রয় বা নামজারির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে গৃহীত সার্টিফাইড কপি জমা দেওয়া নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য।
৩. ডাকযোগে আসা সার্টিফাইড কপিতে যদি কোনো পৃষ্ঠা মিসিং থাকে বা ভুল থাকে, তবে প্রতিকার কী?
যদি ডাকযোগে প্রাপ্ত সার্টিফাইড কপিতে কোনো পাতার অস্পষ্টতা, সিল বা স্বাক্ষরের ঘাটতি থাকে, তবে সেই খাম ও রসিদসহ সরাসরি ডিসি অফিসের রেকর্ড রুমে গিয়ে সহকারী কমিশনারের নজরে আনলে তারা তাৎক্ষণিক রেকর্ড খাতা মিলিয়ে বিনামূল্যে সংশোধিত ফ্রেশ সার্টিফাইড কপি সরবরাহ করে থাকেন।
৪. প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিদেশ থেকে কীভাবে তাদের পৈতৃক জমির ই-পর্চা দেখতে ও তুলতে পারবেন?
প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে eporcha.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে ক্রেডিট/ডেবিট কার্ড বা বাংলাদেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনের বিকাশ/নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করে তাৎক্ষণিক অনলাইন কপি ডাউনলোড করতে পারেন। আর সার্টিফাইড কপির জন্য আবেদন করার সময় ডেলিভারি ঠিকানায় বাংলাদেশে তাদের গ্রামের বাড়ির বা আত্মীয়ের ঠিকানা দিলে ডাকপিয়ন সেখানে কপিটি পৌঁছে দেবে।
৫. নিজের বা আত্মীয়ের জমি ছাড়া অন্য কারো জমির খতিয়ান কি অনলাইনে দেখা বা তোলা যায়?
হ্যাঁ, যাবে। খতিয়ান বা আরওআর (Record of Rights) হলো একটি পাবলিক ডকুমেন্ট (Public Document)। বাংলাদেশের ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন এবং তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী দেশের যেকোনো নাগরিক নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ সাপেক্ষে যেকোনো মৌজার যেকোনো দাগ বা খতিয়ানের তথ্য দেখতে এবং তার সার্টিফাইড কপি পাওয়ার পূর্ণ আইনি অধিকার রাখেন।
লেখক ও গবেষক পরিচিতি:
বায়েজীদ জামান — ডিজিটাল নাগরিক সেবা ও ক্যারিয়ার পরামর্শক। korkho.blogspot.com-এর মূল লক্ষ্য সাধারণ নাগরিকদের জন্য জটিল সরকারি ও ডিজিটাল সেবাকে সহজবোধ্য করা এবং দালালমুক্ত ডিজিটাল সেবা নিশ্চিতে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া।
Post a Comment