পাসপোর্টের তথ্য ও ভুল সংশোধন করার নিয়ম ২০২৬: এনআইডি অনুযায়ী নিজের নাম, পিতা-মাতার নাম ও বয়স সংশোধনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র এবং রিইস্যু আবেদন গাইড

Passport Information and Data Correction Guide Bangladesh 2026

বিদেশে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা কিংবা ভ্রমণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নাগরিক পরিচয়পত্র হলো পাসপোর্ট। কিন্তু বাংলাদেশের লাখ লাখ নাগরিকের ক্ষেত্রে একটি বড় সংকট দেখা দেয়—যখন তাদের পুরাতন হাতে লেখা পাসপোর্ট বা মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (MRP)-এর তথ্যের সাথে বর্তমান জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা স্মার্ট কার্ডের তথ্যের বড় অমিল ধরা পড়ে। অতীতে যখন এমআরপি পাসপোর্ট করা হতো, তখন এনআইডি সার্ভারের সাথে পাসপোর্ট সার্ভারের কোনো ডিজিটাল আন্তঃসংযোগ ছিল না। ফলে অসাবধানতাবশত নিজের নামের ইংরেজি বানান, পিতা বা মাতার নাম, স্বামী/স্ত্রীর নাম কিংবা জন্মতারিখ ও বয়সে ভুল তথ্য লিপিবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে যখন নাগরিকরা নতুন বায়োমেট্রিক ই-পাসপোর্ট (e-Passport) করতে যান, তখন সার্ভার ডাটা মিসম্যাচ (Data Mismatch) দেখিয়ে আবেদন বাতিল বা স্থগিত করে দেয়।

এই জটিলতা নিরসন এবং সাধারণ নাগরিক ও প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাসপোর্ট প্রাপ্তি সহজ করতে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ একটি ঐতিহাসিক সরকারি পরিপত্র জারি করেছে। এই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)-এর তথ্যকেই চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে গণ্য করে পাসপোর্টের যেকোনো তথ্য সংশোধন করার আইনি বৈধতা প্রদান করা হয়েছে। ফলে এখন আর অযথা আদালতের পেছনে না ঘুরে কিংবা কোনো দালালের কাছে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা না খুইয়ে সম্পূর্ণ সরকারি বিধিমোতাবেক ঘরে বসে নিজেই পাসপোর্টের তথ্য সংশোধনের আবেদন করা যায়। একজন সিনিয়র ডিজিটাল নাগরিক সেবা বিশ্লেষক ও পাসপোর্ট গবেষক হিসেবে আজ আমি ২০২৬ সালের হালনাগাদ সরকারি প্রজ্ঞাপন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, এফিডেভিট সংক্রান্ত স্পষ্ট বিধান, সরকারি ফি এবং epassport.gov.bd পোর্টালে রিইস্যু আবেদনের সম্পূর্ণ এ-টু-জেড প্র্যাকটিক্যাল গাইড তুলে ধরছি:

১. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগান্তকারী পরিপত্র: কী কী সংশোধন সম্ভব?

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের বহিরাগমন-১ শাখা কর্তৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপন (স্মারক নং-৫৮.০০.০০০০.০৪০.০৩.০০২.২১-৭৮৫) এবং পরবর্তী সার্কুলার অনুযায়ী স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:

সরকারি পরিপত্রের প্রধান ৪টি মৌলিক নীতি:

  1. এনআইডির তথ্যই চূড়ান্ত ভিত্তি: আবেদনকারীর পাসপোর্টের তথ্যের সাথে যদি তার জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যে অমিল থাকে, তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে (Smart NID) প্রদর্শিত তথ্যকেই সঠিক ধরে পাসপোর্ট সংশোধন বা রিইস্যু করতে হবে।
  2. নিজের নাম ও পিতা-মাতার নাম সংশোধন: আবেদনকারীর নিজের নাম, পিতার নাম এবং মাতার নামের বানান পরিবর্তন বা সংশোধন এনআইডি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের (JSC/SSC/সমমান) আলোকে সরাসরি করা যাবে।
  3. বয়স বা জন্মতারিখ সংশোধন (সর্বোচ্চ ৫ বছর): পুরাতন পাসপোর্টের তুলনায় এনআইডিতে যদি বয়সের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বছর পর্যন্ত কম বা বেশি থাকে, তবে অতিরিক্ত কোনো আইনি জটিলতা ছাড়াই এনআইডি অনুযায়ী বয়স সংশোধনযোগ্য। (তবে ৫ বছরের বেশি ব্যবধান হলে বিশেষ তদন্ত ও ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট এফিডেভিট প্রযোজ্য)।
  4. বিবাহিত নারীদের স্বামী বা পিতা নির্বাচন: বৈবাহিক অবস্থার পরিবর্তনের কারণে পাসপোর্টে স্বামীর নাম সংযোজন, বিয়োজন বা পূর্বে স্বামীর নাম থাকলে তা পরিবর্তন করে পিতার নাম বহাল রাখার ক্ষেত্রে নিকাহনামা/তালাকনামা সাপেক্ষে সম্পূর্ণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

২. কোন কোন ক্ষেত্রে এফিডেভিট (Affidavit) লাগবে আর কখন লাগবে না?

পাসপোর্ট সংশোধন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত হন ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট এফিডেভিট নিয়ে। সরকারি বিধান অনুযায়ী স্পষ্ট নিয়মাবলী:

সংশোধনের বিষয় ও মাত্রা এফিডেভিট লাগবে কি না? প্রয়োজনীয় সহায়ক প্রমাণপত্র
সাধারণ বানানের ভুল বা অক্ষরের অমিল এফিডেভিট লাগবে না মূল স্মার্ট এনআইডি কার্ডের কপি।
পিতা বা মাতার নামের সম্পূর্ণ পরিবর্তন সাধারণত প্রয়োজন হয় না (এনআইডি থাকলে) আবেদনকারীর এনআইডি + পিতা-মাতার এনআইডি কার্ডের কপি।
বয়স বা জন্মতারিখের ব্যবধান (৫ বছরের মধ্যে) এফিডেভিট লাগবে না (শিক্ষিতদের সার্টিফিকেট আবশ্যক) জেএসসি/এসএসসি মূল সনদ + স্মার্ট এনআইডি কার্ড।
বয়স বা জন্মতারিখের ব্যবধান (৫ বছরের বেশি) হ্যাঁ, বাধ্যতামূলক ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি পাবলিক এফিডেভিট + সিভিল সার্জন বয়স নির্ধারণী সনদ (যদি প্রযোজ্য হয়)।
নিজের নাম সম্পূর্ণ পরিবর্তন (Amended Name) হ্যাঁ, বাধ্যতামূলক ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট এফিডেভিট + জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় নাম পরিবর্তনের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মূল কপি।

৩. পাসপোর্ট সংশোধনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের পূর্ণাঙ্গ চেকলিস্ট

অনলাইনে ফরম পূরণ এবং পাসপোর্ট অফিসে সশরীরে জমা দেওয়ার জন্য নিচের ডকুমেন্টসগুলোর মূল কপি ও ২ সেট পরিষ্কার ফটোকপি প্রস্তুত রাখুন:

ক্রম কাগজপত্রের নাম বিস্তারিত বিবরণ ও গুরুত্ব
১ পূর্ববর্তী মূল পাসপোর্ট (Old Passport) আপনার বিদ্যমান মূল এমআরপি (MRP) বা ই-পাসপোর্ট এবং এর ডাটা পেজের স্পষ্ট ফটোকপি। (পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে থানার মূল জিডি কপি)।
২ স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র (Smart NID) আবেদনকারীর মূল স্মার্ট এনআইডি কার্ড এবং এর সত্যায়িত রঙিন ফটোকপি। (যাতে নাম ও জন্মতারিখ হুবহু সঠিক আছে)।
৩ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র (JSC/SSC) শিক্ষিত নাগরিকদের ক্ষেত্রে জেএসসি, এসএসসি বা সমমান পরীক্ষার মূল সনদপত্র বা শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত সার্টিফিকেট ও প্রবেশপত্র।
৪ পিতা ও মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র পিতা-মাতার নাম সংশোধন করতে চাইলে পিতা ও মাতার এনআইডি কার্ডের কপি। (মৃত হলে মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশান সনদ)।
৫ অনলাইন আবেদন সামারি ও পেমেন্ট স্লিপ epassport পোর্টাল থেকে ডাউনলোডকৃত 'Application Summary' (বারকোডসহ) এবং এ-চালান বা ব্যাংকের অফিশিয়াল পেমেন্ট রসিদ।
৬ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের কপি নিরাপত্তার স্বার্থে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের প্রিন্ট কপি সাথে রাখা অত্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ, যাতে কোনো কাউন্টারে বিভ্রান্তি না ঘটে।

৪. ই-পাসপোর্ট রিইস্যু ও সংশোধনের সরকারি ফি তালিকা ২০২৬

পাসপোর্ট সংশোধনের জন্য কোনো আলাদা জরিমানা বা এক্সট্রা ফি দিতে হয় না; সাধারণ রিইস্যুর নির্ধারিত সরকারি ফি প্রযোজ্য। ২০২৬ সালের হালনাগাদ ফি চার্ট (১৫% ভ্যাটসহ চূড়ান্ত হিসাব):

পাসপোর্টের পৃষ্ঠা ও মেয়াদ সাধারণ ডেলিভারি ফি (১৫ কার্যদিবস) জরুরি ডেলিভারি ফি (৭ কার্যদিবস) অতি জরুরি ফি (২ কার্যদিবস)
৪৮ পৃষ্ঠা — ৫ বছর মেয়াদী ৪,০২৫/- টাকা ৬,৩২৫/- টাকা ৮,৬২৫/- টাকা
৪৮ পৃষ্ঠা — ১০ বছর মেয়াদী (সর্বাধিক জনপ্রিয়) ৫,৭৫০/- টাকা ৮,০৫০/- টাকা ১০,৩৫০/- টাকা
৬৪ পৃষ্ঠা — ৫ বছর মেয়াদী ৬,৩২৫/- টাকা ৮,৬২৫/- টাকা ১২,০৭৫/- টাকা
৬৪ পৃষ্ঠা — ১০ বছর মেয়াদী ৮,০৫০/- টাকা ১০,৩৫০/- টাকা ১৩,৮০০/- টাকা

* ফি পরিশোধের মাধ্যম: সরকারি এ-চালান (A-Challan) গেটওয়ের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, অথবা সরাসরি বিকাশ (bKash) বা নগদ দিয়ে ঘরে বসেই ফি পরিশোধ করা যায়।

৫. epassport.gov.bd পোর্টালে অনলাইন রিইস্যু আবেদনের ধাপে ধাপে গাইড

কোনো দালালের কাছে না গিয়ে নিজের মোবাইল বা কম্পিউটার দিয়ে মাত্র ২০ মিনিটে নির্ভুলভাবে আবেদন ফরম পূরণের পদ্ধতি:

অনলাইন ফর্ম পূরণের বাস্তব স্টেপ-বাই-স্টেপ প্রসেস:

  1. ধাপ ১ (পোর্টালে প্রবেশ ও লগইন):
    বাংলাদেশ সরকারের অফিশিয়াল পাসপোর্ট পোর্টাল https://www.epassport.gov.bd-এ প্রবেশ করুন। আপনার পূর্বের সক্রিয় ইমেইল ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন। (নতুন হলে 'Apply online for e-Passport'-এ গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলুন)।
  2. ধাপ ২ (পূর্ববর্তী পাসপোর্টের তথ্য নির্বাচন - অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ):
    আবেদনের শুরুতে প্রশ্ন আসবে—"Do you have a previous passport?" এখানে অবশ্যই 'Yes, I have a Machine Readable Passport (MRP)' অথবা 'Yes, I have an electronic passport (e-Passport)' সিলেক্ট করতে হবে। ভুলেও 'No' সিলেক্ট করবেন না।
  3. ধাপ ৩ (রিইস্যুর কারণ নির্বাচন):
    রিইস্যুর কারণ হিসেবে ড্রপডাউন মেনু থেকে 'Correction of information' বা 'Data change' নির্বাচন করুন। (মেয়াদ শেষ হয়ে থাকলে 'Validity expired and Data change' নির্বাচন করুন)। এরপর আপনার পুরাতন পাসপোর্ট নম্বর, ইস্যুর তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ টাইপ করুন।
  4. ধাপ ৪ (এনআইডি অনুযায়ী সংশোধিত তথ্য এন্ট্রি):
    এবার আপনার ব্যক্তিগত তথ্যের পাতায় আপনার স্মার্ট এনআইডি কার্ড দেখে দেখে হুবহু ইংরেজি বড় অক্ষরে আপনার নাম, পিতার নাম, মাতার নাম এবং জন্মতারিখ ইনপুট দিন। এনআইডি নম্বরের ঘরে আপনার ১০ বা ১৭ ডিজিটের এনআইডি নম্বর নির্ভুলভাবে টাইপ করুন।
  5. ধাপ ৫ (ঠিকানা ও পাসপোর্ট অফিস নির্বাচন):
    আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রে যে স্থায়ী ঠিকানা রয়েছে তা দিন। আপনি যদি বর্তমান ঠিকানার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে আবেদন জমা দিতে চান, তবে বর্তমান ঠিকানায় সংশ্লিষ্ট এলাকার তথ্য দিন।
  6. ধাপ ৬ (পৃষ্ঠা, মেয়াদ ও ফি পরিশোধ):
    আপনার পছন্দ অনুযায়ী ৪৮ বা ৬৪ পৃষ্ঠা এবং ৫ বা ১০ বছর মেয়াদ সিলেক্ট করুন। এরপর চালানের মাধ্যমে ফি জমা দিয়ে ট্রানজেকশন স্লিপের তথ্য মিলিয়ে নিয়ে ফাইনাল সাবমিট করুন।
  7. ধাপ ৭ (অ্যাপ্লিকেশন সামারি ডাউনলোড):
    সাবমিট শেষে স্ক্রিনে 'Application Summary' আসবে। এটি ডাউনলোড করে রঙিন প্রিন্ট করুন। এতে একটি বড় বারকোড ও আবেদনকারীর তথ্য থাকবে।

৬. পাসপোর্ট অফিসে ফাইল জমা ও সহকারী পরিচালক (AD)-এর অনুমোদন

যেহেতু এটি একটি তথ্য সংশোধনের আবেদন, তাই সাধারণ নতুন পাসপোর্টের চেয়ে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সামান্য ভিন্নতা রয়েছে:

  • ফাইল সাজানো: আবেদন সামারির নিচে পেমেন্ট রসিদ, পুরাতন পাসপোর্টের ফটোকপি, স্মার্ট এনআইডির সত্যায়িত কপি এবং এসএসসি সার্টিফিকেটের কপি একসাথে পিনআপ করুন।
  • সহকারী পরিচালকের (AD) রুম ভিজিট: পাসপোর্ট অফিসে প্রবেশ করে সরাসরি সাধারণ কাউন্টারে না গিয়ে দায়িত্বরত কর্মকর্তার সাথে কথা বলে সহকারী পরিচালক (Assistant Director / AD)-এর রুমে যান। তিনি আপনার পুরাতন পাসপোর্ট এবং বর্তমান এনআইডি ও সার্টিফিকেট সামনাসামনি দেখে ফাইলে 'Approved for Correction' লিখে স্বাক্ষর ও সিল দেবেন।
  • ডাটা এন্ট্রি ও বায়োমেট্রিক প্রদান: এডির অনুমোদনের পর নির্ধারিত বুথে গিয়ে ফাইল স্ক্যান করান। এরপর ফিঙ্গারপ্রিন্ট বুথে গিয়ে দুই হাতের দশ আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিশ স্ক্যান এবং সরাসরি ডিজিটাল ছবি তুলুন।
  • ডেলিভারি স্লিপ সংগ্রহ: সব প্রক্রিয়া শেষে আপনাকে একটি বারকোডযুক্ত 'Delivery Slip' দেওয়া হবে। এই স্লিপে আপনার পাসপোর্ট ডেলিভারির সম্ভাব্য তারিখ উল্লেখ থাকবে। এটি অত্যন্ত যত্ন করে সংরক্ষণ করুন।

৭. পুলিশ ভেরিফিকেশন হবে কি না? (Verification Rules)

পাসপোর্ট সংশোধনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের একটি বড় প্রশ্ন থাকে—পুনরায় পুলিশ তদন্ত হবে কি না:

  • স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী: যদি আবেদনকারী তার বর্তমান ঠিকানায় দীর্ঘদিন বসবাস করেন এবং পুরাতন পাসপোর্টে পূর্বে অনুকূল পুলিশ প্রতিবেদন (Police Clearance) দেওয়া থাকে, তবে শুধুমাত্র নাম বা পিতা-মাতার নাম সংশোধনে নতুন করে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রয়োজন হয় না।
  • কখন পুলিশ ভেরিফিকেশন হতে পারে: আপনি যদি স্থায়ী বা বর্তমান ঠিকানা পরিবর্তন করেন, অথবা জন্মতারিখ ৩ বছরের বেশি সংশোধন করেন, তবে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ সিস্টেম জেনারেটেড পুলিশ ভেরিফিকেশন পাঠাতে পারে। তদন্তকারী কর্মকর্তা কল দিলে আপনার এনআইডি, সার্টিফিকেট ও মূল পুরাতন পাসপোর্ট দেখালেই ভেরিফিকেশন ক্লিয়ার হয়ে যায়।

৮. পাসপোর্ট তথ্য সংশোধনে সাধারণ ৫টি মারাত্মক ভুল ও প্রতিকার

  1. আগে এনআইডি ঠিক না করে পাসপোর্টে আবেদন করা: মনে রাখবেন, পাসপোর্টের সার্ভার সরাসরি এনআইডি সার্ভারের সাথে কানেক্টেড। আপনার এনআইডিতেই যদি ভুল নাম থাকে, তবে পাসপোর্ট কখনোই ঠিক হবে না। আগে নির্বাচন কমিশন থেকে এনআইডি সংশোধন করুন, এরপর পাসপোর্টে হাত দিন।
  2. রিইস্যু না দেখিয়ে 'নতুন আবেদন' (New Application) করা: অনেকে পুরাতন পাসপোর্ট লুকিয়ে নতুন হিসেবে আবেদন করেন। কিন্তু আঙ্গুলের ছাপ দেওয়ার সাথে সাথে সিস্টেম ধরে ফেলে যে এই ব্যক্তির পূর্বে আরেকটি পাসপোর্ট ছিল। এতে আবেদন 'Blocked' হয়ে যায় এবং প্রতারণার অভিযোগে বড় আইনি জটিলতা তৈরি হয়। সবসময় সততার সাথে 'Re-issue' নির্বাচন করবেন।
  3. সার্টিফিকেটের সাথে এনআইডির অমিল থাকা: আপনি যদি গ্র্যাজুয়েট বা এসএসসি পাস হয়ে থাকেন, তবে শিক্ষাগত সনদের সাথে এনআইডির মিল থাকা জরুরি। অমিল থাকলে পাসপোর্ট কর্মকর্তা অতিরিক্ত প্রশ্ন করতে পারেন।
  4. পুরাতন পাসপোর্ট সঙ্গে না নেওয়া: পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার সময় পুরাতন মূল পাসপোর্ট অবশ্যই সাথে রাখতে হবে। বায়োমেট্রিক নেওয়ার পর পুরাতন পাসপোর্টটি ছিদ্র (Cancel Stamp) করে আপনাকে ফেরত দেওয়া হবে।
  5. দালালের মিথ্যা আশ্বাসে প্রতারিত হওয়া: দালালরা প্রায়ই দাবি করে ম্যাজিস্ট্রেট এফিডেভিট ছাড়াই বয়স ১০ বছর কমিয়ে দেবে। এটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও অসম্ভব। সরকারি পরিপত্রের বাইরে গিয়ে কোনো অবৈধ পন্থায় পাসপোর্ট করানো যায় না।

৯. পাসপোর্ট সংশোধন সংক্রান্ত সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. পুরাতন পাসপোর্টে যদি চলমান কোনো দেশের ভিসা থাকে, তবে সংশোধনের পর সেই ভিসার কী হবে?

আপনার পুরাতন পাসপোর্টে যদি আমেরিকা, সেনজেন, যুক্তরাজ্য, কানাডা বা অন্য কোনো দেশের সচল বা ভ্যালিড ভিসা থাকে, তবে বিন্দুমাত্র চিন্তার কারণ নেই। পাসপোর্ট অফিস আপনার পুরাতন পাসপোর্টটি ক্যানসেল বা ছিদ্র করার সময় ভিসার পাতা অক্ষত রাখবে। ভ্রমণের সময় নতুন সংশোধিত পাসপোর্ট এবং পুরাতন ভিসা সম্বলিত পাসপোর্ট—উভয়টি একসাথে বহন করলেই যেকোনো দেশে বৈধভাবে যাতায়াত করা যায়।

২. বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা কীভাবে পাসপোর্টের তথ্য সংশোধন করবেন?

প্রবাসী বাংলাদেশিরা স্বশরীরে সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট জেনারেলের পাসপোর্ট উইংয়ে আবেদন করতে পারেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র বিদেশের সকল বাংলাদেশ মিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রবাসীদের ক্ষেত্রে মূল এনআইডির কপি এবং দূতাবাসের নির্ধারিত ফরম পূরণ করে আবেদন জমা দিলেই ঢাকা থেকে প্রিন্ট হয়ে সংশোধিত ই-পাসপোর্ট দূতাবাসে পৌঁছে যায়।

৩. আমার এনআইডি নেই, শুধু অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ আছে; আমি কি সংশোধন করতে পারব?

প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছরের বেশি বয়সী) নাগরিকদের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের সুবিধা নিতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থাকা বাধ্যতামূলক। শুধুমাত্র অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের পাসপোর্টের বড় তথ্য সংশোধন সহজে গ্রহণ করা হয় না। তবে যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে, তারা ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্মনিবন্ধন এবং পিতা-মাতার এনআইডি দিয়ে সংশোধন করতে পারবেন।

৪. পাসপোর্টের তথ্য সংশোধনের পর নতুন পাসপোর্ট হাতে পেতে কতদিন সময় লাগে?

সাধারণ ডেলিভারির (Regular) ক্ষেত্রে সাধারণত ১৫ থেকে ২১ কার্যদিবস সময় লাগে। তবে আপনি যদি জরুরি (Express) আবেদন করেন, তবে ৭ থেকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে এবং অতি জরুরি (Super Express) আবেদনে মাত্র ২ থেকে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে সংশোধিত ই-পাসপোর্ট প্রস্তুত হয়ে যায়।

৫. আমার পুরাতন পাসপোর্ট হারিয়ে গেছে, এখন আমি কীভাবে তথ্য সংশোধন করে নতুন ই-পাসপোর্ট পাব?

পুরাতন পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে প্রথমে নিকটস্থ থানায় গিয়ে একটি হারানো জিডি (General Diary) করতে হবে। জিডিতে পুরাতন পাসপোর্ট নম্বর এবং বর্তমান এনআইডি অনুযায়ী সঠিক তথ্যের বিষয়টি উল্লেখ থাকবে। এরপর অনলাইনে রিইস্যু আবেদন করার সময় 'Lost Passport' এবং 'Correction' অপশন দিয়ে জিডি নম্বর ইনপুট করবেন। পাসপোর্ট অফিসে মূল জিডি কপি এবং এনআইডি জমা দিলে তদন্ত সাপেক্ষে সংশোধিত নতুন ই-পাসপোর্ট ইস্যু করা হবে।


লেখক ও গবেষক পরিচিতি:

বায়েজীদ জামান — ডিজিটাল নাগরিক সেবা ও ক্যারিয়ার পরামর্শক। korkho.blogspot.com-এর মূল লক্ষ্য সাধারণ নাগরিকদের জন্য জটিল সরকারি ও ডিজিটাল সেবাকে সহজবোধ্য করা এবং দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিতে সঠিক আইনি ও প্রযুক্তিগত দিকনির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া।

Post a Comment

Previous Post Next Post