এইচএসসি রসায়ন ২য় পত্র: ৪র্থ অধ্যায় 'তড়িৎ রসায়ন' ফ্যারাডের সূত্র, নার্নস্ট সমীকরণ, কোষ বিভব ও সৃজনশীল বোর্ড সমাধান ২০২৬

HSC Chemistry 2nd Paper Chapter 4 Electrochemistry Faraday Law Nernst Equation Board Solution 2026

উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য রসায়ন ২য় পত্রে এ প্লাস (A+) সুনিশ্চিত করার সবচেয়ে নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো ৪র্থ অধ্যায় 'তড়িৎ রসায়ন' (Electrochemistry)। বিগত কয়েক বছরের ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, দিনাজপুরসহ সকল শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বোর্ড পরীক্ষার লিখিত অংশের 'খ' বিভাগ থেকে এই একটি অধ্যায় থেকেই প্রতি বছর ১০০% নিশ্চিত অন্তত ১টি এবং অনেক বোর্ডে ২টি পূর্ণাঙ্গ সৃজনশীল প্রশ্ন (১০ থেকে ২০ নম্বর) আসে। এছাড়া বহুনির্বাচনি (MCQ) অংশে ৪ থেকে ৫টি সরাসরি গাণিতিক ও তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন থাকে এই অধ্যায় থেকে।

তড়িৎ রসায়নের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—এখানে জৈব রসায়নের মতো শত শত বিক্রিয়া মুখস্থ করার চাপ নেই। কেবল ফ্যারাডের সূত্রের গণনা, ধাতুর সক্রিয়তা সিরিজ ও প্রমাণ বিজারণ বিভবের ধারণা এবং নার্নস্ট সমীকরণের (Nernst Equation) প্রয়োগ নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করতে পারলে পরীক্ষার খাতায় ফুল মার্কস পাওয়া নিশ্চিত। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থী কোষ বিভব গণনার সময় অ্যানোড-ক্যাথোড নির্বাচনে ভুল করে, কিংবা পাত্রে দ্রবণ রাখা যাবে কি না তা নির্ধারণে চিহ্নের বিভ্রান্তিতে পড়ে নম্বর হারায়। একজন সিনিয়র মেন্টর হিসেবে আজ আমি ২০২৬ সালের হালনাগাদ বোর্ড সিলেবাস অনুযায়ী ফ্যারাডের সূত্র, কোষ বিভব, নার্নস্ট সমীকরণ এবং একটি ১০০% বোর্ড স্ট্যান্ডার্ড সৃজনশীল প্রশ্নের পুঙ্খানুপুঙ্খ গাণিতিক ব্যাখ্যা তুলে ধরছি:

১. ফ্যারাডের তড়িৎ বিশ্লেষণ সূত্রাবলী ও গাণিতিক প্রয়োগ

১৮৩৪ সালে বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে তড়িৎ বিশ্লেষণের ফলে তড়িৎদ্বারে সংঘটিত রাসায়নিক পরিবর্তনের পরিমাণ সংক্রান্ত দুটি মৌলিক সূত্র প্রদান করেন:

ফ্যারাডের ১ম সূত্র:

বিবৃতি: তড়িৎ বিশ্লেষণের সময় যেকোনো তড়িৎদ্বারে সঞ্চিত বা দ্রবীভূত পদার্থের পরিমাণ প্রবাহিত মোট তড়িৎ চার্জের পরিমাণের সমানুপাতিক।

যদি তড়িৎদ্বারে সঞ্চিত পদার্থের ভর $W$ গ্রাম এবং প্রবাহিত চার্জ $Q$ কুলম্ব হয়, তবে:

$W \propto Q \implies W = Z \cdot Q$

যেহেতু $Q = I \cdot t$ (যেখানে $I$ = তড়িৎ প্রবাহ অ্যাম্পিয়ারে এবং $t$ = সময় সেকেন্ডে), তাই মূল কাজের সূত্রটি দাঁড়ায়:

$W = Z \cdot I \cdot t = \frac{M \cdot I \cdot t}{n \cdot F}$

  • $M$ (পারমাণবিক ভর): সঞ্চিত ধাতুর পারমাণবিক ভর (যেমন: $\text{Cu} = 63.5\text{ g/mol}$, $\text{Ag} = 108\text{ g/mol}$, $\text{Zn} = 65.4\text{ g/mol}$, $\text{Al} = 27\text{ g/mol}$)।
  • $n$ (যোজ্যতা বা স্থানান্তরিত ইলেকট্রন সংখ্যা): যেমন $\text{Cu}^{2+}$ এর জন্য $n = 2$, $\text{Al}^{3+}$ এর জন্য $n = 3$, $\text{Ag}^+$ এর জন্য $n = 1$।
  • $F$ (ফ্যারাডে ধ্রুবক): $1$ মোল ইলেকট্রনের চার্জ = $96,500\text{ C}$ (কুলম্ব)।
  • $Z$ (তড়িৎ রাসায়নিক তুল্যাঙ্ক): $1$ কুলম্ব চার্জ প্রবাহের ফলে তড়িৎদ্বারে যত গ্রাম পদার্থ সঞ্চিত হয়, তাকে ঐ পদার্থের তড়িৎ রাসায়নিক তুল্যাঙ্ক বলে। $Z = \frac{M}{n \cdot 96500}\text{ g/C}$।

ফ্যারাডের ২য় সূত্র:

বিবৃতি: বিভিন্ন তড়িৎ বিশ্লেষ্যের দ্রবণের মধ্য দিয়ে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রবাহিত করলে তড়িৎদ্বারসমূহে সঞ্চিত বিভিন্ন পদার্থের ভর তাদের নিজ নিজ রাসায়নিক তুল্যাঙ্কের ($E = M/n$) সমানুপাতিক হয়। অর্থাৎ, $W_1 : W_2 = E_1 : E_2$।

২. ধাতুর সক্রিয়তা সিরিজ ও প্রমাণ তড়িৎদ্বার বিভব ($E^\circ$)

তড়িৎ রাসায়নিক কোষে কোন ধাতু অ্যানোড হিসেবে জারিত হবে এবং কোনটি ক্যাথোড হিসেবে বিজারিত হবে, তা নির্ভর করে ধাতুর সক্রিয়তা এবং প্রমাণ বিজারণ বিভবের মানের ওপর। আন্তর্জাতিক রসায়ন সংস্থা (IUPAC) কর্তৃক সকল তড়িৎদ্বার বিভবকে বিজারণ বিভব (Reduction Potential) হিসেবে প্রকাশ করার সর্বসম্মত নিয়ম রয়েছে।

ধাতু / আয়ন বিজারণ অর্ধ-বিক্রিয়া প্রমাণ বিজারণ বিভব ($E^\circ$ ভোল্ট) সক্রিয়তা ও ভূমিকা
$\text{Li} / \text{Li}^+$ $\text{Li}^+ + e^- \rightarrow \text{Li}$ $-3.04\text{ V}$ সর্বোচ্চ তীব্র বিজারক (তীব্রতম অ্যানোড)
$\text{K} / \text{K}^+$ $\text{K}^+ + e^- \rightarrow \text{K}$ $-2.93\text{ V}$ অত্যন্ত সক্রিয় ধাতু
$\text{Mg} / \text{Mg}^{2+}$ $\text{Mg}^{2+} + 2e^- \rightarrow \text{Mg}$ $-2.37\text{ V}$ তীব্র সক্রিয় ধাতু
$\text{Al} / \text{Al}^{3+}$ $\text{Al}^{3+} + 3e^- \rightarrow \text{Al}$ $-1.66\text{ V}$ সক্রিয় ধাতু
$\text{Zn} / \text{Zn}^{2+}$ $\text{Zn}^{2+} + 2e^- \rightarrow \text{Zn}$ $-0.76\text{ V}$ মধ্যম সক্রিয় (সাধারণ অ্যানোড)
$\text{Fe} / \text{Fe}^{2+}$ $\text{Fe}^{2+} + 2e^- \rightarrow \text{Fe}$ $-0.44\text{ V}$ মধ্যম সক্রিয় ধাতু
$\text{H}_2 / \text{H}^+$ $2\text{H}^+ + 2e^- \rightarrow \text{H}_2$ $0.00\text{ V}$ প্রমাণ হাইড্রোজেন তড়িৎদ্বার (SHE - রেফারেন্স)
$\text{Cu} / \text{Cu}^{2+}$ $\text{Cu}^{2+} + 2e^- \rightarrow \text{Cu}$ $+0.34\text{ V}$ কম সক্রিয় (সাধারণ ক্যাথোড)
$\text{Ag} / \text{Ag}^+$ $\text{Ag}^+ + e^- \rightarrow \text{Ag}$ $+0.80\text{ V}$ নিষ্ক্রিয় ধাতু (শক্তিশালী ক্যাথোড)

অ্যানোড ও ক্যাথোড চেনার গোল্ডেন রুল:

সক্রিয়তা সিরিজে যে ধাতু উপরে থাকে তার বিজারণ বিভব ঋণাত্মক বা কম হয়। কম বিজারণ বিভববিশিষ্ট ধাতু সবসময় অ্যানোড (জারণ ঘটে) হয়। অপরদিকে যে ধাতু সক্রিয়তা সিরিজে নিচে থাকে তার বিজারণ বিভব বেশি বা ধনাত্মক হয়, এবং তা ক্যাথোড (বিজারণ ঘটে) হিসেবে কাজ করে।

৩. প্রমাণ কোষ বিভব ($E^\circ_{\text{cell}}$) ও পাত্রে দ্রবণ রাখার নিয়ম

প্রমাণ অবস্থায় ($25^\circ\text{C}$ বা $298\text{ K}$ তাপমাত্রা, $1\text{ atm}$ চাপ এবং $1\text{ M}$ ঘনমাত্রা) গ্যালভানিক কোষের তড়িৎচালক বল বা ইএমএফ নির্ণয়ের সর্বজনীন সূত্র:

$E^\circ_{\text{cell}} = E^\circ_{\text{cathode(red)}} - E^\circ_{\text{anode(red)}}$

এখানে উভয় বিভবকেই বিজারণ বিভব হিসেবে বসাতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অ্যানোডের চিহ্নে নিজে থেকে মাইনাস বসিয়ে আবার সূত্রের মাইনাস দিয়ে প্লাস করবেন না। সূত্র অনুযায়ী সরাসরি চার্টের বিজারণ বিভব মান বসিয়ে দিন।

পাত্রে দ্রবণ সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রশ্নের জাদুকরী ট্রিক:

বোর্ড পরীক্ষায় বহুল প্রচলিত একটি প্রশ্ন: "অমুক ধাতুর পাত্রে তমুক দ্রবণ রাখা যাবে কি না?"

  1. ধাপ ১: যে ধাতুর পাত্র, তাকে সবসময় অ্যানোড ধরতে হবে (কারণ পাত্র ক্ষয়প্রাপ্ত হলে জারণ হবে)।
  2. ধাপ ২: যে দ্রবণ রাখা হবে, তার ধাতব আয়নকে ক্যাথোড ধরতে হবে (কারণ দ্রবণের আয়ন বিজারিত হয়ে তলানি পড়বে)।
  3. ধাপ ৩: এবার $E^\circ_{\text{cell}} = E^\circ_{\text{cathode}} - E^\circ_{\text{anode}}$ সূত্রে মান বসিয়ে কোষ বিভব নির্ণয় করুন।
  4. সিদ্ধান্ত নীতি:
    • যদি $E^\circ_{\text{cell}} > 0$ (ধনাত্মক) হয়, তবে বিক্রিয়াটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটবে ($\Delta G^\circ = -nFE^\circ < 0$)। অর্থাৎ পাত্র ক্ষয় হয়ে ছিদ্র হয়ে যাবে, তাই দ্রবণ রাখা যাবে না।
    • যদি $E^\circ_{\text{cell}} \le 0$ (ঋণাত্মক বা শূন্য) হয়, তবে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটবে না। ফলে পাত্র অক্ষত থাকবে এবং দ্রবণটি নিরাপদভাবে রাখা যাবে।

৪. নার্নস্ট সমীকরণ (Nernst Equation) ও অপ্রমাণ কোষ বিভব

বাস্তব ক্ষেত্রে দ্রবণের ঘনমাত্রা সবসময় $1\text{ M}$ থাকে না। অপ্রমাণ অবস্থায় যেকোনো ঘনমাত্রা ও তাপমাত্রায় কোষের বিভব পরিমাপের জন্য বিজ্ঞানী ওয়াল্টার নার্নস্ট একটি যুগান্তকারী সমীকরণ প্রণয়ন করেন:

$E_{\text{cell}} = E^\circ_{\text{cell}} - \frac{2.303 \cdot R \cdot T}{n \cdot F} \log_{10} \left( \frac{[\text{Anode Ion}]^a}{[\text{Cathode Ion}]^b} \right)$

যেখানে $T = 298\text{ K}$ ($25^\circ\text{C}$), $R = 8.314\text{ J/(mol}\cdot\text{K)}$, এবং $F = 96500\text{ C}$ বসালে সাধারণ রূপটি দাঁড়ায়:

$E_{\text{cell}} = E^\circ_{\text{cell}} - \frac{0.0591}{n} \log_{10} \left( \frac{[\text{Anode Ion}]^a}{[\text{Cathode Ion}]^b} \right)$

সতর্কতা: বিক্রিয়ার সমতাকৃত সমীকরণে আয়নের আগে যে সহগ (মোল সংখ্যা) থাকে, নার্নস্ট সমীকরণে সেই সহগটি ঐ আয়নের ঘনমাত্রার ঘাত (Power) হিসেবে বসে। যেমন: $\text{Zn} + 2\text{Ag}^+ \rightarrow \text{Zn}^{2+} + 2\text{Ag}$ বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে $\log \frac{[\text{Zn}^{2+}]}{[\text{Ag}^+]^2}$ হবে।

৫. লবণ সেতু (Salt Bridge) এর ক্রিয়া কৌশল

গ্যালভানিক কোষে দুটি ভিন্ন তড়িৎবিশ্লেষ্য দ্রবণকে সরাসরি মিশ্রিত না করে তাদের মধ্যে আয়নিক সংযোগ স্থাপনের জন্য উল্টানো U-আকৃতির কাচনল ব্যবহার করা হয়, যাকে লবণ সেতু বলে। এতে নিষ্ক্রিয় লবণ (যেমন $\text{KCl}$, $\text{KNO}_3$, বা $\text{NH}_4\text{NO}_3$) আগার-আগার জেলির সাথে মিশিয়ে রাখা হয়।

  • তড়িৎ নিরপেক্ষতা রক্ষা: অ্যানোডে অতিরিক্ত ধনাত্মক আয়ন তৈরি হলে লবণ সেতু থেকে অ্যানায়ন ($\text{Cl}^-$) এসে তা প্রশমিত করে। আর ক্যাথোডে ধনাত্মক আয়ন কমে গেলে ক্যাটায়ন ($\text{K}^+$) এসে তা ব্যালেন্স করে।
  • তরল সংযোগ বিভব দূরীকরণ: দুটি ভিন্ন ঘনমাত্রার দ্রবণ সরাসরি সংস্পর্শে এলে সংযোগস্থলে যে তরল সংযোগ বিভব (Liquid Junction Potential) তৈরি হয়, লবণ সেতু তা দূর করে।
  • কেন $\text{KCl}$ সবচেয়ে উপযুক্ত? কারণ $\text{K}^+$ এবং $\text{Cl}^-$ আয়নের গতিবেগ বা আয়নিক মোবিলিটি প্রায় সমান ($7.62 \times 10^{-4}$ বনাম $7.9 \times 10^{-4}\text{ cm}^2/(\text{V}\cdot\text{s})$), ফলে উভয় প্রকোষ্ঠে সমান দ্রুততায় চার্জ ভারসাম্য অর্জিত হয়।

৬. পূর্ণাঙ্গ বোর্ড স্ট্যান্ডার্ড সৃজনশীল প্রশ্ন ও নির্ভুল সমাধান ২০২৬

উদ্দীপক:

নিচে একটি তড়িৎ রাসায়নিক কোষের দুটি প্রকোষ্ঠ দেওয়া হলো:

পাত্র-A: জিংক ($\text{Zn}$) দণ্ড নিমজ্জিত রয়েছে $0.1\text{ M } \text{ZnSO}_4$ দ্রবণে।
পাত্র-B: কপার ($\text{Cu}$) দণ্ড নিমজ্জিত রয়েছে $0.05\text{ M } \text{CuSO}_4$ দ্রবণে।
উভয় পাত্র একটি $\text{KCl}$ যুক্ত লবণ সেতু দ্বারা যুক্ত।
দেওয়া আছে: $E^\circ_{\text{Zn}^{2+}/\text{Zn}} = -0.76\text{ V}$, $E^\circ_{\text{Cu}^{2+}/\text{Cu}} = +0.34\text{ V}$, এবং $E^\circ_{\text{Fe}^{2+}/\text{Fe}} = -0.44\text{ V}$। তাপমাত্রা $25^\circ\text{C}$।

প্রশ্নসমূহ:
(ক) তড়িৎ রাসায়নিক তুল্যাঙ্ক কাকে বলে? [১]
(খ) প্রমাণ হাইড্রোজেন তড়িৎদ্বারের বিভব $0.00\text{ V}$ ধরা হয় কেন? [২]
(গ) উদ্দীপকের কোষটির $25^\circ\text{C}$ তাপমাত্রায় কোষ বিভব ($E_{\text{cell}}$) নির্ণয় কর। [৩]
(ঘ) পাত্র-B এর কপার সালফেট দ্রবণটিকে লোহার তৈরি পাত্রে সংরক্ষণ করা কি যুক্তিযুক্ত হবে? গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ কর। [৪]

(ক) উত্তর:

তড়িৎ বিশ্লেষণের সময় কোনো তড়িৎবিশ্লেষ্য দ্রবণের মধ্য দিয়ে ১ কুলম্ব ($1\text{ C}$) বিদ্যুৎ প্রবাহিত করলে কোনো তড়িৎদ্বারে যে পরিমাণ পদার্থ সঞ্চিত বা দ্রবীভূত হয়, তাকে ঐ পদার্থের তড়িৎ রাসায়নিক তুল্যাঙ্ক ($Z$) বলে। এর এসআই একক $\text{kg/C}$ বা রসায়নে সাধারণত $\text{g/C}$।

(খ) উত্তর:

কোনো একক তড়িৎদ্বারের নিরপেক্ষ পরম বিভব সরাসরি পরিমাপ করা অসম্ভব; কারণ একটি অর্ধকোষে জারণ বা বিজারণ একা একা ঘটতে পারে না। তাই অন্য যেকোনো তড়িৎদ্বারের আপেক্ষিক বিভব পরিমাপের জন্য একটি আন্তর্জাতিক প্রমাণ বা স্ট্যান্ডার্ড রেফারেন্স প্রয়োজন হয়।

আন্তর্জাতিক বিশুদ্ধ ও ফলিত রসায়ন সংস্থা (IUPAC) কর্তৃক সর্বসম্মত কনভেনশন অনুযায়ী প্রমাণ হাইড্রোজেন তড়িৎদ্বারকে (Standard Hydrogen Electrode - SHE) প্রাথমিক রেফারেন্স তড়িৎদ্বার হিসেবে নির্বাচন করে এর বিজারণ বিভব ও জারণ বিভব উভয়কেই শূন্য ভোল্ট ($0.00\text{ V}$) ধরে নেওয়া হয়েছে। এই শূন্য মানের সাপেক্ষে অন্য সকল তড়িৎদ্বারের বিভব তুলনামূলকভাবে নিখুঁতভাবে মাপা সম্ভব হয়।

(গ) উত্তর:

উদ্দীপকের কোষটির রাসায়নিক বিক্রিয়া ও কোষ বিভব নির্ণয়:

দেওয়া আছে,
জিংক তড়িৎদ্বারের প্রমাণ বিজারণ বিভব, $E^\circ_{\text{Zn}^{2+}/\text{Zn}} = -0.76\text{ V}$
কপার তড়িৎদ্বারের প্রমাণ বিজারণ বিভব, $E^\circ_{\text{Cu}^{2+}/\text{Cu}} = +0.34\text{ V}$

যেহেতু $E^\circ_{\text{Cu}^{2+}/\text{Cu}} > E^\circ_{\text{Zn}^{2+}/\text{Zn}}$, তাই কপার তড়িৎদ্বারে বিজারণ ঘটবে (ক্যাথোড) এবং জিংক তড়িৎদ্বারে জারণ ঘটবে (অ্যানোড)।

অর্ধকোষ বিক্রিয়াসমূহ:
অ্যানোড বিক্রিয়া (জারণ): $\text{Zn(s)} \rightarrow \text{Zn}^{2+}\text{(aq)} + 2e^-$
ক্যাথোড বিক্রিয়া (বিজারণ): $\text{Cu}^{2+}\text{(aq)} + 2e^- \rightarrow \text{Cu(s)}$
কোষ বিক্রিয়া: $\text{Zn(s)} + \text{Cu}^{2+}\text{(aq)} \rightleftharpoons \text{Zn}^{2+}\text{(aq)} + \text{Cu(s)}$
এখানে স্থানান্তরিত ইলেকট্রন সংখ্যা, $n = 2$।

প্রমাণ কোষ বিভব ($E^\circ_{\text{cell}}$):
$E^\circ_{\text{cell}} = E^\circ_{\text{cathode}} - E^\circ_{\text{anode}}$
$= E^\circ_{\text{Cu}^{2+}/\text{Cu}} - E^\circ_{\text{Zn}^{2+}/\text{Zn}}$
$= +0.34\text{ V} - (-0.76\text{ V}) = +0.34\text{ V} + 0.76\text{ V} = +1.10\text{ V}$

নার্নস্ট সমীকরণ প্রয়োগ করে $25^\circ\text{C}$ তাপমাত্রায় কোষ বিভব ($E_{\text{cell}}$) গণনা:
$E_{\text{cell}} = E^\circ_{\text{cell}} - \frac{0.0591}{n} \log_{10} \left( \frac{[\text{Zn}^{2+}]}{[\text{Cu}^{2+}]} \right)$

এখানে প্রদত্ত মানসমূহ:
$[\text{Zn}^{2+}] = 0.1\text{ M}$
$[\text{Cu}^{2+}] = 0.05\text{ M}$
$n = 2$
$E^\circ_{\text{cell}} = 1.10\text{ V}$

মান বসিয়ে পাই:
$E_{\text{cell}} = 1.10 - \frac{0.0591}{2} \log_{10} \left( \frac{0.1}{0.05} \right)$
$= 1.10 - 0.02955 \cdot \log_{10}(2)$
$= 1.10 - 0.02955 \cdot 0.30103$
$= 1.10 - 0.008895$
$= 1.0911\text{ V} \approx 1.091\text{ V}$

উত্তর: উদ্দীপকের কোষটির $25^\circ\text{C}$ তাপমাত্রায় কোষ বিভব হলো $1.091\text{ V}$।

(ঘ) উত্তর:

পাত্র-B এর দ্রবণ লোহার তৈরি পাত্রে সংরক্ষণ বিশ্লেষণ:

পাত্র-B এর দ্রবণটি হলো কপার সালফেট ($\text{CuSO}_4$) দ্রবণ, যেখানে দ্রবণে কপার আয়ন ($\text{Cu}^{2+}$) বিদ্যমান। পাত্রটি লোহার ($\text{Fe}$) তৈরি।

লোহার পাত্রে কপার সালফেট দ্রবণ রাখা হলে যদি তাদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত কোনো বিক্রিয়া সংঘটিত হয়, তবে লোহা জারিত হয়ে দ্রবণে প্রবেশ করবে এবং পাত্রটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ফুটো হয়ে যাবে। ফলে দ্রবণ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে না।

যদি রাসায়নিক ক্রিয়া সংঘটিত হয়, তবে সম্ভাব্য কোষটি হবে:
লোহা (পাত্র) = অ্যানোড (জারণ ঘটবে): $\text{Fe(s)} \rightarrow \text{Fe}^{2+}\text{(aq)} + 2e^-$
কপার আয়ন (দ্রবণ) = ক্যাথোড (বিজারণ ঘটবে): $\text{Cu}^{2+}\text{(aq)} + 2e^- \rightarrow \text{Cu(s)}$
মোট বিক্রিয়া: $\text{Fe(s)} + \text{Cu}^{2+}\text{(aq)} \rightarrow \text{Fe}^{2+}\text{(aq)} + \text{Cu(s)}$
এখানে স্থানান্তরিত ইলেকট্রন সংখ্যা, $n = 2$।

প্রমাণ বিজারণ বিভবের মানসমূহ:
অ্যানোডের বিভব, $E^\circ_{\text{Fe}^{2+}/\text{Fe}} = -0.44\text{ V}$
ক্যাথোডের বিভব, $E^\circ_{\text{Cu}^{2+}/\text{Cu}} = +0.34\text{ V}$

কোষটির প্রমাণ কোষ বিভব ($E^\circ_{\text{cell}}$):
$E^\circ_{\text{cell}} = E^\circ_{\text{cathode}} - E^\circ_{\text{anode}}$
$= E^\circ_{\text{Cu}^{2+}/\text{Cu}} - E^\circ_{\text{Fe}^{2+}/\text{Fe}}$
$= +0.34\text{ V} - (-0.44\text{ V})$
$= +0.34\text{ V} + 0.44\text{ V} = +0.78\text{ V}$

গাণিতিক সিদ্ধান্ত ও যুক্তি:
যেহেতু কোষটির প্রমাণ তড়িৎচালক বল $E^\circ_{\text{cell}} = +0.78\text{ V} > 0$ (ধনাত্মক), সেহেতু কোষ বিক্রিয়াটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটবে।
তাপগতিবিদ্যা অনুসারে গিবস মুক্ত শক্তির পরিবর্তন:
$\Delta G^\circ = -n \cdot F \cdot E^\circ_{\text{cell}} = -2 \times 96500 \times 0.78 = -150,540\text{ J} = -150.54\text{ kJ}$
যেহেতু $\Delta G^\circ < 0$ (ঋণাত্মক), তাই লোহা দ্রবীভূত হয়ে পাত্র ক্ষয়প্রাপ্ত হবে এবং দ্রবণের কপার আয়ন বিজারিত হয়ে কপার ধাতু হিসেবে তলানি পড়বে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: অতএব, লোহার তৈরি পাত্রে কপার সালফেট দ্রবণ সংরক্ষণ করা মোটেই যুক্তিযুক্ত হবে না।

৭. পরীক্ষার খাতায় বেশি নম্বর নিশ্চিত করার ৭টি বিশেষ টিপস

  1. আইনের সঠিক রূপায়ণ: $E^\circ_{\text{cell}}$ গণনার সময় সবসময় প্রমাণ বিজারণ বিভবের ফর্মুলা ($E^\circ_{\text{cathode}} - E^\circ_{\text{anode}}$) লিখবেন। মিশ্রিত জারণ-বিজারণ সূত্র লিখে চিহ্নে গরমিল করবেন না।
  2. সময় সেকেন্ডে রূপান্তর: ফ্যারাডের ১ম সূত্রে সময় ($t$) যদি ঘণ্টা বা মিনিটে দেওয়া থাকে, তবে অবশ্যই তাকে ৬০ বা ৩৬০০ দিয়ে গুণ করে সেকেন্ডে নিয়ে হিসাব করবেন।
  3. আয়নের চার্জ নির্ধারণ: রূপার ক্ষেত্রে $n = 1$, তামার ক্ষেত্রে $n = 2$, অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষেত্রে $n = 3$—যোজ্যতা ভুল হলে পুরো চার নম্বরের অংক শূন্য হয়ে যাবে।
  4. নার্নস্ট সমীকরণের ঘাত: আয়নের আগে কোনো সহগ থাকলে তা অবশ্যই কনসেন্ট্রেশনের ওপর পাওয়ার হিসেবে বসাবেন। যেমন $2\text{Ag}^+$ থাকলে $[\text{Ag}^+]^2$ হবে।
  5. ফ্যারাডে ধ্রুবকের মান: সবসময় $F = 96,500\text{ C}$ ব্যবহার করবেন।
  6. কোষ ডায়াগ্রাম উপস্থাপন: খাতায় অ্যানোড ও ক্যাথোড উল্লেখ করে সেল রিপ্রেজেন্টেশন (যেমন: $\text{Zn(s)} | \text{Zn}^{2+}\text{(aq)} || \text{Cu}^{2+}\text{(aq)} | \text{Cu(s)}$) লিখলে পরীক্ষকের কাছে উত্তরের মান বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
  7. একক লেখা বাধ্যতামূলক: তড়িৎ বিভবের একক ভোল্ট ($\text{V}$), ভরের একক গ্রাম ($\text{g}$), এবং মুক্ত শক্তির একক জুল ($\text{J}$) বা কিলোজুল ($\text{kJ}$) লিখতে কখনোই ভুলবেন না।

৮. তড়িৎ রসায়ন সংক্রান্ত সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি কোষের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?

প্রাইমারি কোষের রাসায়নিক বিক্রিয়া অপ্রত্যাবর্তী (Irreversible), অর্থাৎ একবার ডিসচার্জ হয়ে গেলে একে পুনরায় রিচার্জ করা যায় না (যেমন: ড্রাই সেল বা টর্চলাইটের ব্যাটারি)। পক্ষান্তরে সেকেন্ডারি কোষের বিক্রিয়া প্রত্যাবর্তী (Reversible), অর্থাৎ বাইরে থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পুনরায় সক্রিয় করা যায় (যেমন: লেড স্টোরেজ ব্যাটারি ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি)।

২. গ্যালভানিক কোষে অ্যানোড ঋণাত্মক কিন্তু তড়িৎ বিশ্লেষণ কোষে অ্যানোড ধনাত্মক কেন?

গ্যালভানিক কোষে স্বতঃস্ফূর্ত জারণ ক্রিয়ার ফলে অ্যানোডে প্রচুর ইলেকট্রন জমা হয়, তাই অ্যানোড ইলেকট্রন সমৃদ্ধ হয়ে ঋণাত্মক পোল তৈরি করে। অপরদিকে তড়িৎ বিশ্লেষণ কোষে ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্তের সাথে অ্যানোডকে যুক্ত করা হয়, ফলে তা জোরপূর্বক দ্রবণের ঋণাত্মক অ্যানায়নকে আকর্ষণ করে জারণ ঘটায়।

৩. জ্বালানি কোষ বা ফুয়েল সেল (Fuel Cell) কী? এর সুবিধা কী?

যে গ্যালভানিক কোষে ক্রমাগত হাইড্রোজেন, মিথেন বা মিথানলের মতো জ্বালানি ও অক্সিজেনের সরাসরি রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে সরাসরি বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করা হয়, তাকে ফুয়েল সেল বলে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর কোনো ক্ষতিকর দূষণ নেই (উপজাত কেবল বিশুদ্ধ পানি ও তাপ) এবং এর কর্মদক্ষতা প্রায় ৭০% পর্যন্ত হতে পারে।

৪. ড্রাই সেলে বা শুষ্ক কোষে ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড ($\text{MnO}_2$) কেন ব্যবহার করা হয়?

শুষ্ক কোষে ক্যাথোডিক বিক্রিয়ায় হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন হয় যা ক্যাথোডের গায়ে বুদবুদ আকারে জমা হয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে (যাকে পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ বলে)। $\text{MnO}_2$ একটি উত্তম ডিপোলারাইজার বা পোলারায়ন-নিবারক হিসেবে কাজ করে উৎপন্ন হাইড্রোজেনকে জারিত করে পানিতে রূপান্তরিত করে।

৫. নার্নস্ট সমীকরণ কি সকল তাপমাত্রায় প্রযোজ্য?

হ্যাঁ, মূল নার্নস্ট সমীকরণ $E = E^\circ - \frac{2.303RT}{nF}\log Q$ যেকোনো তাপমাত্রার জন্যই প্রযোজ্য। তবে সংক্ষেপিত $0.0591/n$ রূপটি শুধুমাত্র প্রমাণ কক্ষ তাপমাত্রা $25^\circ\text{C}$ বা $298\text{ K}$-এর জন্য প্রযোজ্য। পরীক্ষায় তাপমাত্রা ভিন্ন (যেমন $35^\circ\text{C}$) দিলে মূল সূত্রে $T$ এর মান কেলভিনে বসিয়ে গণনা করতে হবে।

Post a Comment

Previous Post Next Post