গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে ১৮ বছর থেকে ৫০ ঊর্ধ্ব বয়সের প্রতিটি নাগরিকের শেষ বয়সের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পরনির্ভরশীলতামুক্ত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ হলো সর্বজনীন পেনশন স্কিম (Universal Pension Scheme - UPS)। ২০২৩ সালের ঐতিহাসিক উদ্বোধনের পর থেকে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ (National Pension Authority - NPA)-এর অধীনে লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি, বেসরকারি চাকরিজীবী, অনানুষ্ঠানিক খাতের স্বকর্মসংস্থানকারী (ব্যবসায়ী, কৃষক, রিকশাচালক, ফ্রিল্যান্সার) এবং স্বল্প আয়ের নাগরিক ৪টি প্রধান স্কিমে (প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা) স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিবন্ধন করেছেন। এই স্কিমের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—এখানে আপনার কষ্টার্জিত জমার প্রতিটি টাকার শতভাগ সরকারি জামানত রয়েছে এবং প্রাপ্ত জমার ওপর চক্রবৃদ্ধি হারে মুনাফা যুক্ত হয়ে ৬০ বছর বয়স পূর্তির পর আজীবন নিশ্চিত মাসিক পেনশন প্রদান করা হয়।
তবে প্রাথমিক রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করার পর এখন সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে সবচেয়ে বড় ও বাস্তবমুখী জিজ্ঞাসা তৈরি হয়েছে নিয়মিত মাসিক কিস্তি পরিশোধ এবং ব্যক্তিগত হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে। অনেকেই বুঝতে পারেন না কীভাবে ঘরে বসেই মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, নগদ, রকেট) বা ভিসা/মাস্টারকার্ড দিয়ে প্রতি মাসের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়, অনলাইনে কীভাবে জমার ডিজিটাল স্টেটমেন্ট ও অর্জিত মুনাফা চেক করা যায়, কোনো মাসে কিস্তি দিতে দেরি হলে কত জরিমানা কাটা হয় কিংবা কিস্তি বকেয়া পড়লে একাউন্ট পুনরায় সচল করার আইনি নিয়ম কী। এছাড়া কোন স্কিমে কত বছর কত টাকা জমালে ৬০ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর প্রতি মাসে কত হাজার বা লাখ টাকা পেনশন পাওয়া যাবে, পেনশন কিস্তিতে কীভাবে বার্ষিক আয়করের কর রেয়াত (Tax Rebate) পাওয়া যায় এবং পেনশনারের অবর্তমানে নমিনি কীভাবে পেনশন পাবেন—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা অত্যন্ত জরুরি। একজন সিনিয়র পার্সোনাল ফিন্যান্স গবেষক ও ডিজিটাল নাগরিক সেবা বিশ্লেষক হিসেবে আজ আমি ২০২৬ সালের হালনাগাদ জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ বিধিমালা অনুযায়ী ঘরে বসে কিস্তি জমার ৩টি সহজ পদ্ধতি, ডিজিটাল স্টেটমেন্ট ডাউনলোড, বিলম্ব সারচার্জ হিসাব, বিভিন্ন স্কিমের মাসিক রিটার্ন ক্যালকুলেটর সারণি এবং পেনশনার সুবিধার সম্পূর্ণ মাস্টার গাইডলাইন বিস্তারিত তুলে ধরছি:
১. সর্বজনীন পেনশনের ৪টি স্কিম ও কিস্তি পরিশোধের সময়সূচি
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের অধীনে ৪টি সুনির্দিষ্ট স্কিম পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রতিটি স্কিমের কিস্তির পরিমাণ ভিন্ন:
৪টি স্কিমের কিস্তির কাঠামো:
- ১. প্রবাস স্কিম (Probhash Scheme): বিদেশে কর্মরত বা অবস্থানরত যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য। মাসিক কিস্তির পরিমাণ: ৫,০০০ টাকা, ৭,৫০০ টাকা বা ১০,০০০ টাকা (বৈদেশিক মুদ্রায় বা সমমূল্য টাকায় পরিশোধযোগ্য)।
- ২. প্রগতি স্কিম (Pragoti Scheme): বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, এনজিও বা কোম্পানিতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। মাসিক কিস্তির পরিমাণ: ২,০০০ টাকা, ৩,০০০ টাকা বা ৫,০০০ টাকা (প্রতিষ্ঠান ও কর্মী ৫০-৫০ যৌথভাবে অথবা কর্মী এককভাবে দিতে পারেন)।
- ৩. সুরক্ষা স্কিম (Surokkha Scheme): অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত সকল স্বকর্মসংস্থানকারী নাগরিক যেমন—কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, কামার-কুমার, জেলে, হস্তশিল্পী, আইনজীবী, চিকিৎসক, ফ্রিল্যান্সার ও ব্যবসায়ীদের জন্য। মাসিক কিস্তির পরিমাণ: ১,০০০ টাকা, ২,০০০ টাকা, ৩,০০০ টাকা বা ৫,০০০ টাকা।
- ৪. সমতা স্কিম (Somota Scheme): বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী স্বল্প আয়ের নাগরিকদের জন্য (যাদের বার্ষিক আয় সর্বোচ্চ ৬০,০০০ টাকা)। মাসিক কিস্তির পরিমাণ মোট ১,০০০ টাকা—যার মধ্যে গ্রাহক নিজে জমা দেন ৫০০ টাকা এবং অবশিষ্ট ৫০০ টাকা সরকার অনুদান হিসেবে জমা দেয়।
কিস্তি পরিশোধের ফ্রিকোয়েন্সি ও তারিখ: গ্রাহক তার সুবিধামতো মাসিক (Monthly), ত্রৈমাসিক (Quarterly - প্রতি ৩ মাস পর) অথবা বার্ষিক (Yearly - এককালীন ১ বছর) কিস্তি পরিশোধের অপশন বেছে নিতে পারেন। প্রতি মাসের কিস্তি চলতি মাসের শেষ কার্যদিবসের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়।
২. অফিশিয়াল সরকারি পেনশন পোর্টাল ও হেল্পলাইন পরিচিতি
নিরাপদ ও সরকারি অনুমোদিত গেটওয়েতে লেনদেন করতে নিচের লিংক ও সহায়তা কেন্দ্র ব্যবহার করুন:
- জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় পোর্টাল: https://upension.gov.bd — কিস্তি পরিশোধ, প্রোফাইল লগইন, স্টেটমেন্ট ডাউনলোড ও স্কিম পরিবর্তনের প্রধান ওয়েবসাইট।
- অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থ বিভাগ: https://mof.gov.bd — সর্বজনীন পেনশন সংক্রান্ত সরকারি নীতিমালা ও গেজেট।
- সোনালী ব্যাংক পেনশন সেবা উইং: https://sonalibank.com.bd — সরাসরি ব্যাংক কাউন্টারে চালান জমা ও তথ্য।
- পেনশন হেল্পলাইন ও কল সেন্টার: যেকোনো তথ্য ও অভিযোগের জন্য সরাসরি কল করুন 16122 (টোল ফ্রি) অথবা 09612316122 নম্বরে (সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত)।
৩. কিস্তি প্রদান ও স্টেটমেন্ট ডাউনলোডে প্রয়োজনীয় তথ্যের অফিশিয়াল চেকলিস্ট (Checklist Table)
পেনশন কিস্তি জমা দেওয়া এবং নিজের জমার হিসাব ডাউনলোড করার জন্য নিচের তথ্য ও উপকরণ প্রস্তুত রাখুন:
| ক্রমিক | তথ্য বা নথিপত্রের নাম | প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র | সংগ্রহের উৎস | জরুরি নির্দেশনা ও ব্যবহারিক নিয়ম |
|---|---|---|---|---|
| ০১ | পেনশন আইডি নম্বর (PID - Pension ID) | সকল কিস্তি পেমেন্টে | নিবন্ধন স্লিপ / এসএমএস | নিবন্ধনের পর প্রাপ্ত ১০ ডিজিটের অনন্য পেনশন আইডি নম্বর। বিকাশ বা ব্যাংকে কিস্তি দেওয়ার সময় এই নম্বরটি ইনপুট দিতে হয়। |
| ০২ | জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর (Smart NID) | লগইন ও স্টেটমেন্টে | মূল এনআইডি কার্ড | upension পোর্টালে লগইন করতে এবং পেনশন অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য যাচাই করতে এনআইডি নম্বর প্রয়োজন। |
| ০৩ | নিবন্ধিত সচল মোবাইল নম্বর | সকল প্রক্রিয়ায় | আবেদনকারীর সিম | পোর্টালে লগইনের ওটিপি (OTP) কোড এবং কিস্তি জমার পর তাৎক্ষণিক কনফার্মেশন এসএমএস পেতে এই নম্বর চালু রাখা আবশ্যক। |
| ০৪ | অনলাইন পেমেন্ট মাধ্যম (Payment Channel) | কিস্তি পরিশোধে | বিকাশ/নগদ/কার্ড/ব্যাংক | বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায় ওয়ালেট অথবা যেকোনো ব্যাংকের ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড বা সোনালী ই-সেবা অ্যাকাউন্ট। |
| ০৫ | পেমেন্ট ট্রানজেকশন আইডি (TrxID / e-Receipt) | রেকর্ড সংরক্ষণ | পেমেন্ট কনফার্মেশন | কিস্তি জমার পর ডিজিটাল মানি রিসিট ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করুন। এটি আয়কর রিটার্নে কর রেয়াত নেওয়ার একমাত্র প্রমাণক। |
৪. জমার মেয়াদ বনাম মাসিক পেনশন প্রাপ্তির সম্পূর্ণ লাভ সারণি (Profit & Return Chart)
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের অ্যাকচুয়ারিয়াল অ্যানালিসিস এবং বিধিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন স্কিমে মাসিক জমার পরিমাণ ও মেয়াদের ভিত্তিতে ৬০ বছর বয়স থেকে আজীবন প্রদেয় সম্ভাব্য মাসিক পেনশনের পূর্ণাঙ্গ চার্ট নিচে তুলে ধরা হলো:
| মাসিক কিস্তির পরিমাণ | ১০ বছর জমালে (মাসিক পেনশন) | ১৫ বছর জমালে (মাসিক পেনশন) | ২০ বছর জমালে (মাসিক পেনশন) | ২৫ বছর জমালে (মাসিক পেনশন) | ৩০ বছর জমালে (মাসিক পেনশন) | ৪২ বছর জমালে (মাসিক পেনশন) |
|---|---|---|---|---|---|---|
| ১,০০০/- টাকা (সুরক্ষা / সমতা স্কিম) |
১,৫৩০/- টাকা | ৩,০১৮/- টাকা | ৫,৪১৭/- টাকা | ৯,৩৩১/- টাকা | ১৫,৬৫৪/- টাকা | ৬২,৩৩০/- টাকা |
| ২,০০০/- টাকা (প্রগতি / সুরক্ষা স্কিম) |
৩,০৬০/- টাকা | ৬,০৩৬/- টাকা | ১০,৮৩৫/- টাকা | ১৮,৬৬১/- টাকা | ৩১,৩০৮/- টাকা | ১,২৪,৬৬০/- টাকা |
| ৩,০০০/- টাকা (প্রগতি / সুরক্ষা স্কিম) |
৪,৫৯০/- টাকা | ৯,০৫৪/- টাকা | ১৬,২৫২/- টাকা | ২৭,৯৯২/- টাকা | ৪৬,৯৬২/- টাকা | ১,৮৬,৯৮৯/- টাকা |
| ৫,০০০/- টাকা (প্রবাস / প্রগতি / সুরক্ষা) |
৭,৬৫০/- টাকা | ১৫,০৯০/- টাকা | ২৭,০৮৭/- টাকা | ৪৬,৬৫৩/- টাকা | ৭৮,৩২০/- টাকা | ৩,১১,৬৪৮/- টাকা |
| ৭,৫০০/- টাকা (প্রবাস স্কিম) |
১১,৪৭৫/- টাকা | ২২,৬৩৫/- টাকা | ৪০,৬৩১/- টাকা | ৬৯,৯৮০/- টাকা | ১,১৭,৪৮০/- টাকা | ৪,৬৭,৪৭১/- টাকা |
| ১০,০০০/- টাকা (প্রবাস স্কিম) |
১৫,৩০০/- টাকা | ৩০,১৮০/- টাকা | ৫৪,১৭৪/- টাকা | ৯৩,৩০৬/- টাকা | ১,৫৬,৬৪০/- টাকা | ৬,২৩,২৯৭/- টাকা |
চক্রবৃদ্ধি মুনাফার বিস্ময়: ১৮ বছর বয়সে কোনো তরুণ যদি প্রবাস বা সুরক্ষা স্কিমে প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা করে ৪২ বছর জমা করেন, তবে তার মোট জমার পরিমাণ হবে মাত্র ২৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু ৬০ বছর বয়স থেকে তিনি প্রতি মাসে পাবেন ৩ লাখ ১১ হাজার ৬৪৮ টাকা আজীবন পেনশন! অর্থাৎ মাত্র ১ বছরেই তিনি জমার চেয়ে বেশি টাকা ফেরত পাবেন এবং আজীবন তা অব্যাহত থাকবে।
৫. ধাপে ধাপে অনলাইনে পেনশন কিস্তি পরিশোধের ৩টি সহজ পদ্ধতি
কোনো ব্যাংকে লাইনে না দাঁড়িয়ে ঘরে বসেই স্মার্টফোনের মাধ্যমে পেনশন কিস্তি পরিশোধের বিস্তারিত কার্যপ্রণালী:
পদ্ধতি ১: বিকাশ অ্যাপ দিয়ে সরাসরি পে-বিল (bKash Pay Bill)
- বিকাশ অ্যাপে লগইন করে হোম স্ক্রিন থেকে 'Pay Bill' (পে বিল) আইকনে ট্যাপ করুন।
- প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরি হিসেবে 'Government' (সরকারি) নির্বাচন করুন অথবা সার্চ বক্সে 'Universal Pension Scheme' লিখে সিলেক্ট করুন।
- আপনার ১০ ডিজিটের পেনশন আইডি নম্বর (PID) অথবা নিবন্ধিত জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর ইনপুট দিন।
- 'এগিয়ে যান' বাটনে ক্লিক করলেই আপনার বকেয়া কিস্তির পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ক্রিনে ভেসে উঠবে।
- আপনার বিকাশ পিন নম্বর দিয়ে ট্যাপ করে ধরে রাখুন। সফল লেনদেনের পর ডিজিটাল মানি রিসিট ডাউনলোড করে নিন। পেনশনের কেন্দ্রীয় সার্ভারে টাকা সাথে সাথে জমা হয়ে যায়।
পদ্ধতি ২: upension.gov.bd পোর্টাল ও একপে (Ekpay) গেটওয়ে
- https://upension.gov.bd পোর্টালে গিয়ে 'কিস্তি পরিশোধ' (Pay Installment) অপশনে ক্লিক করুন।
- আপনার পেনশন আইডি (PID) নম্বর দিন। স্ক্রিনে আপনার নাম ও কিস্তির বিবরণ দেখতে পাবেন।
- পেমেন্ট গেটওয়েতে নগদ (Nagad), রকেট (Rocket), উপায় (Upay) অথবা ভিসা/মাস্টারকার্ড / সোনালী ই-সেবা সিলেক্ট করে পেমেন্ট সম্পন্ন করুন।
পদ্ধতি ৩: সোনালী ব্যাংকের যেকোনো শাখায় নগদ জমা
- অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করতে না পারলে সোনালী ব্যাংকের যেকোনো অনলাইন শাখায় গিয়ে পেনশন কিস্তি জমার নির্ধারিত ভাউচারে আপনার পেনশন আইডি (PID) লিখে সরাসরি কাউন্টারে ক্যাশ জমা দিয়ে সিলযুক্ত রসিদ সংগ্রহ করতে পারেন।
৬. অনলাইনে পেনশন স্টেটমেন্ট ও জমার খতিয়ান ডাউনলোড করার নিয়ম
আপনার টাকা ঠিকমতো জমা হচ্ছে কি না এবং কত টাকা সরকারি মুনাফা যোগ হয়েছে তা দেখার নিয়ম:
- upension.gov.bd পোর্টালে গিয়ে উপরে ডানপাশে 'লগইন' বাটনে ক্লিক করুন। আপনার ইউজার আইডি (এনআইডি বা ইমেইল) এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রবেশ করুন।
- ড্যাশবোর্ডে প্রবেশের পর আপনার ছবিসহ 'আমার হিসাব' (My Account / Ledger) অপশন দেখতে পাবেন।
- সেখানে এ পর্যন্ত মোট কতটি কিস্তি জমা হয়েছে, মোট জমাকৃত মূল টাকা, সরকারের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অর্জিত মুনাফা এবং মোট ব্যালেন্সের স্পষ্ট বিবরণ দেখা যাবে।
- 'স্টেটমেন্ট ডাউনলোড' (Download Statement) বাটনে ক্লিক করলেই কিউআর কোড সংবলিত ডিজিটাল অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট পিডিএফ আকারে ডাউনলোড হয়ে যাবে।
৭. বিলম্ব জরিমানা ও কিস্তি বকেয়া পড়ার আইনি নিয়মাবলী (Late Penalty Rules)
সময়ে কিস্তি দিতে না পারলে কী ধরনের আর্থিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হয় এবং প্রতিকারের উপায়:
- ১ মাস পর্যন্ত রেয়াত (Grace Period): চলতি মাসের কিস্তি দিতে না পারলে পরবর্তী ১ মাস পর্যন্ত কোনো ধরনের জরিমানা ছাড়া স্বাভাবিক কিস্তি পরিশোধের সুযোগ থাকে।
- বিলম্ব সারচার্জ (Late Fee): নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হলে বকেয়া কিস্তির ওপর প্রতি মাসের জন্য ১% হারে বিলম্ব ফি (Surplus Charge) স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়। যেমন: ১,০০০ টাকা কিস্তিতে ১ মাস দেরিতে মাত্র ১০ টাকা জরিমানা যুক্ত হবে।
- টানা ৩ কিস্তি বকেয়া পড়লে একাউন্ট সাময়িক নিষ্ক্রিয়: কোনো চাঁদাদাতা যদি টানা ৩ মাস কোনো কিস্তি না দেন, তবে তার পেনশন অ্যাকাউন্টটি সফটওয়্যারে সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় (Inactive / Dormant) হয়ে যায়।
- একাউন্ট পুনরায় সচল করার সহজ নিয়ম: অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় হলেও চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই; জমার টাকা কখনো বাজেয়াপ্ত হয় না। পোর্টালে ঢুকে বকেয়া কিস্তিগুলো ১% বিলম্ব ফিসহ একসাথে পরিশোধ করে দেওয়া মাত্রই সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাকাউন্টটিকে সম্পূর্ণ সক্রিয় (Active) করে দেয়। কোনো অফিসে দরখাস্ত দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
৮. আয়কর রেয়াত (Tax Rebate) এবং নমিনির পেনশন পাওয়ার আইনি অধিকার
সর্বজনীন পেনশন স্কিমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দুটি দিক হলো শতভাগ কর সুবিধা এবং নমিনির সুরক্ষা:
- সম্পূর্ণ কর রেয়াত সুবিধা: আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে চাঁদাদাতা কর্তৃক জমাকৃত সম্পূর্ণ অর্থ কর রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগ (Approved Investment for Tax Rebate) হিসেবে গণ্য হয়। ফলে প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় পেনশন জমার রসিদ সংযুক্ত করে বিশাল অংকের ট্যাক্স রিবেট পাওয়া যায়।
- পেনশন আয় সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত: অবসরকালীন সময়ে ৬০ বছর বয়স থেকে চাঁদাদাতা যে মাসিক পেনশন পাবেন, তা সম্পূর্ণভাবে আয়করমুক্ত (Tax-free)। এর ওপর কোনো প্রকার ট্যাক্স কাটা হবে না।
- পেনশনারের মৃত্যুতে নমিনির অধিকার:
• ৬০ বছর বয়সের পূর্বে মৃত্যু হলে (কিস্তি চলাকালীন): চাঁদাদাতা যদি ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা যান, তবে তার অ্যাকাউন্টে জমাকৃত সম্পূর্ণ অর্থ সরকারি মুনাফাসহ এককালীন তার মনোনীত নমিনিকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
• ৬০ বছর বয়সের পর মৃত্যু হলে (পেনশন চলাকালীন): পেনশনার যদি পেনশন পাওয়া অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার নমিনি পেনশনারের ৭৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত মাসিক পেনশন ভোগ করতে থাকবেন।
৯. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (In-Depth FAQ)
সর্বজনীন পেনশন স্কিমের কিস্তি ও সুবিধা সংক্রান্ত নাগরিকদের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ৬টি প্রশ্নের সুস্পষ্ট সমাধান:
প্রশ্ন ১: পরবর্তীতে কি কিস্তির পরিমাণ বাড়ানো বা কমানো সম্ভব?
উত্তর: হ্যাঁ, শতভাগ সম্ভব। আপনার আর্থিক সক্ষমতা বাড়লে বা কমলে আপনি বছরে একবার upension.gov.bd পোর্টালে লগইন করে আপনার কিস্তির পরিমাণ পরিবর্তন করতে পারবেন (যেমন: সুরক্ষা স্কিমে ১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩,০০০ বা ৫,০০০ টাকায় উন্নীত করতে পারেন)। কিস্তির হার পরিবর্তনের সাথে সাথে আপনার ভবিষ্যৎ পেনশনের পরিমাণও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।
প্রশ্ন ২: প্রবাসীরা দেশে স্থায়ীভাবে ফিরে এলে প্রবাস স্কিমের কী হবে?
উত্তর: কোনো প্রবাসী যদি স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তবে তার প্রবাস স্কিম বন্ধ হবে না। তিনি দেশে এসে দেশীয় মুদ্রায় প্রবাস স্কিমের কিস্তি চালিয়ে যেতে পারবেন অথবা তার স্কিমটি পরিবর্তন করে প্রগতি বা সুরক্ষা স্কিমে রূপান্তর করে নিতে পারবেন। পূর্বের জমাকৃত টাকা সম্পূর্ণ অক্ষত থাকবে।
প্রশ্ন ৩: জরুরি প্রয়োজনে কি পেনশন ফান্ড থেকে ঋণ নেওয়ার কোনো সুযোগ আছে?
উত্তর: হ্যাঁ, সর্বজনীন পেনশন বিধিমালা অনুযায়ী কোনো চাঁদাদাতার জরুরি চিকিৎসার বা আকস্মিক সংকটে আর্থিক প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি তার পেনশন ফান্ডে জমাকৃত মোট অর্থের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ (Loan) হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন। এই ঋণ পরবর্তীতে সহজ কিস্তিতে পেনশন ফান্ডে পরিশোধ করা যায়।
প্রশ্ন ৪: পেনশন স্কিম কি মাঝপথে বন্ধ করে জমার টাকা তুলে নেওয়া যায়?
উত্তর: সর্বজনীন পেনশন স্কিম একটি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। সাধারণ নিয়মে ৬০ বছর বয়সের পূর্বে স্কিম প্রত্যাহার করে টাকা তুলে নেওয়া যায় না। তবে চাঁদাদাতা যদি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন বা পঙ্গুত্ববরণ করেন এবং চিকিৎসক কর্তৃক কাজ করতে অক্ষম ঘোষিত হন, তবে বিশেষ বিবেচনায় জমার অর্থ তুলে নেওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে।
প্রশ্ন ৫: কিস্তি জমার পর মোবাইলে কোনো এসএমএস না আসলে কী করব?
উত্তর: অনেক সময় মোবাইল নেটওয়ার্কের কারণে এসএমএস আসতে সামান্য দেরি হতে পারে। আপনি বিকাশ বা ব্যাংকে লেনদেনের পর ট্রানজেকশন আইডিটি সংরক্ষণ করুন এবং upension.gov.bd পোর্টালে লগইন করে 'আমার হিসাব'-এ চেক করুন। সেখানে টাকা সাথে সাথে ক্রেডিট হয়ে যায়। কোনো অসঙ্গতি দেখলে হেল্পলাইনে (16122) ট্রানজেকশন আইডি উল্লেখ করে যোগাযোগ করুন।
প্রশ্ন ৬: পেনশনের মাসিক টাকা কীভাবে গ্রাহকের হাতে পৌঁছাবে?
উত্তর: চাঁদাদাতার বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেনশন চালু করবে। প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে গ্রাহকের নিবন্ধিত নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (BEFTN / NPSB) অথবা মোবাইল ওয়ালেটে সরাসরি পেনশনের সম্পূর্ণ টাকা জমা হয়ে যাবে। এর জন্য কোনো অফিসে ধর্না দিতে হবে না।
লেখক ও গবেষক: বায়েজীদ জামান
পার্সোনাল ফিন্যান্স গবেষক ও ডিজিটাল নাগরিক সেবা বিশেষজ্ঞ। korkho.blogspot.com-এর মূল লক্ষ্য ও আদর্শ হলো বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের জন্য জটিল সরকারি পেনশন, সঞ্চয় ও ডিজিটাল সেবাসমূহকে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের সহায়তা ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, সহজবোধ্য ও কার্যকরভাবে ঘরে বসে পাওয়ার নির্ভরযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করা।
তথ্যসূত্র ও আইনি দায়মুক্তি: এই নির্দেশিকা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ (NPA) আইন ২০২৩, সর্বজনীন পেনশন বিধিমালা এবং upension.gov.bd-এর অফিশিয়াল নির্দেশনার আলোকে প্রণীত। সরকারি বিধিমালা ও মুনাফার হার জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যেকোনো সময় সমন্বয়যোগ্য।
Post a Comment