মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান কিংবা ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রায় দেড় কোটিরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। প্রবাসীদের ঘামঝরানো কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও উন্নয়নের চাকা। কিন্তু চরম পরিতাপের বিষয় হলো—বহু বছর আগে পাসপোর্ট বানিয়ে জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমানোর কারণে কিংবা প্রবাসে দীর্ঘ প্রবাসজীবনের ফলে লাখ লাখ প্রবাসী নাগরিকের কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্মার্ট এনআইডি কার্ড (Smart NID Card) নেই।
বাংলাদেশে বর্তমানে ডিজিটাল নাগরিক সেবার বিস্তার এত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে যে, এনআইডি কার্ড ছাড়া একজন নাগরিক কার্যত নিজের পৈতৃক অধিকার ভোগ করতেও বাধার মুখে পড়েন। এনআইডি না থাকার কারণে প্রবাসীরা স্বদেশে এসে নিজের কষ্টার্জিত আয়ে জমি বা ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয় করতে পারেন না, ব্যাংকে বৈধ রেমিট্যান্স অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারেন না, মোবাইল সিম নিবন্ধন বা সরকারি সঞ্চয়পত্র ও সর্বজনীন পেনশন স্কিমের (প্রবাস স্কিম) মতো আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধায় বিনিয়োগ করতে পারেন না। অতীতে কোনো প্রবাসীকে এনআইডি কার্ড তৈরি করতে হলে বিমানের লাখ টাকার টিকিট কেটে দেশে আসতে হতো এবং উপজেলা নির্বাচন অফিসের পেছনে মাসের পর মাস ধর্না দিতে হতো, যা সিংহভাগ প্রবাসীর ছুটির সময়সীমার মধ্যে কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। কিন্তু ২০২৬ সালে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (BEC) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে বিদেশের দূতাবাস ও মিশনগুলোতে 'প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম' (Expatriate Voter Registration System) পুরোদমে অনলাইন ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এখন প্রবাসে বসেই যেকোনো প্রবাসী নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় পোর্টাল services.nidw.gov.bd-এর মাধ্যমে অনলাইনে ফরম-২ পূরণ করে আবেদন করতে পারেন, নিজ দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট জেনারেলে গিয়ে ছবি ও ১০ আঙুলের ছাপ (বায়োমেট্রিক) দিতে পারেন এবং দেশে পৈতৃক ঠিকানায় স্বয়ংক্রিয় পুলিশি যাচাই শেষে ডিজিটাল কিউআর কোডযুক্ত স্মার্ট এনআইডি কার্ড ডাউনলোড করতে পারেন। একজন সিনিয়র ডিজিটাল নাগরিক সেবা গবেষক ও প্রবাসী কল্যাণ বিশ্লেষক হিসেবে আজ আমি ২০২৬ সালের হালনাগাদ নির্বাচন কমিশন নীতিমালা অনুযায়ী প্রবাস থেকে এনআইডি আবেদনের সম্পূর্ণ ধাপ, প্রয়োজনীয় ৭টি দলিলের চেকলিস্ট, দূতাবাস বায়োমেট্রিক শিডিউল, দেশে পুলিশি তদন্তের নিয়ম এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্মার্ট কার্ড সংগ্রহের সম্পূর্ণ মাস্টার গাইডলাইন বিস্তারিত তুলে ধরছি:
১. প্রবাসী বাংলাদেশিদের এনআইডি কার্ড থাকা কেন অপরিহার্য (৫টি মৌলিক কারণ)
পাসপোর্ট আন্তর্জাতিক ভ্রমণের দলিল হলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যেকোনো আইনি ও আর্থিক কার্যক্রমের জন্য এনআইডি কার্ডের কোনো বিকল্প নেই। একজন প্রবাসীর এনআইডি কার্ড থাকলে যেসব অপরিহার্য সুযোগ নিশ্চিত হয়:
প্রবাসীদের এনআইডি কার্ডের ৫টি প্রধান সুবিধা:
- স্বদেশে জমি, ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয় ও নামজারি (Mutation): রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে কোনো জমি, প্লট বা ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি করতে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস থেকে নিজ নামে নামজারি ও খাজনা দাখিলা কাটতে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের স্মার্ট এনআইডি কার্ড থাকা বাধ্যতামূলক। এনআইডি ছাড়া প্রবাসীদের কষ্টার্জিত আয়ে কেনা সম্পত্তি অন্যের নামে রেজিস্ট্রি করার চরম ঝুঁকিতে পড়তে হয়।
- ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈধ রেমিট্যান্স ও বিশেষ অ্যাকাউন্ট পরিচালনা: বাংলাদেশে যেকোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকে প্রবাসী অ্যাকাউন্ট (NRB Account), ডিপিএস কিংবা এফডিআর খুলতে স্মার্ট এনআইডি কার্ড অপরিহার্য। এনআইডি থাকলে সরকারি ২.৫% প্রণোদনা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়।
- সর্বজনীন পেনশন স্কিম ও জাতীয় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ: জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের অধীনে চালু হওয়া 'প্রবাস স্কিম'-এ প্রবাসীরা প্রতি মাসে ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা জমা করে ৬০ বছর বয়স থেকে আজীবন লক্ষাধিক টাকা পেনশন পেতে পারেন। এই স্কিমে রেজিস্ট্রেশন করতে স্মার্ট এনআইডি নম্বর থাকা বাধ্যতামূলক।
- পৈতৃক সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার সনদ (Succession) গ্রহণ: পিতা-মাতার মৃত্যুর পর পারিবারিক জমিজমার বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি এবং স্থানীয় সরকার থেকে ওয়ারিশান সনদ সংগ্রহ করতে প্রতিটি ওয়ারিশের এনআইডি কার্ড প্রদর্শন করতে হয়।
- ভোটাধিকার ও নাগরিক মর্যাদা: জাতীয় পরিচয়পত্র কেবল একটি কার্ড নয়, এটি আপনার নাগরিকত্বের ডিজিটাল সনদ। ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাস থেকে পোস্টাল ব্যালট বা প্রযুক্তিনির্ভর ভোটদানে অংশ নিতে ভোটার তালিকায় নাম থাকা অপরিহার্য।
২. অফিশিয়াল সরকারি প্রবাসী এনআইডি পোর্টাল ও হেল্পলাইন পরিচিতি
দালাল চক্রের প্রতারণা এড়িয়ে বাংলাদেশ সরকারের কেন্দ্রীয় সার্ভারে নিরাপদ আবেদন দাখিল করতে নিচের অনুমোদিত পোর্টালসমূহ ব্যবহার করুন:
- নির্বাচন কমিশন প্রবাসী এনআইডি পোর্টাল: https://services.nidw.gov.bd/nid-pub/ — প্রবাস থেকে অনলাইনে নতুন ভোটার নিবন্ধন, ফরম-২ পূরণ ও কার্ড ডাউনলোডের মূল সরকারি ওয়েবসাইট।
- বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়: https://ecs.gov.bd — প্রবাসী ভোটার হালনাগাদ সংক্রান্ত অফিশিয়াল প্রজ্ঞাপন ও মিশন তালিকা।
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহ: https://mofa.gov.bd — বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেট জেনারেলের ঠিকানা ও কনস্যুলার সেবা।
- নির্বাচন কমিশন প্রবাসী হেল্পলাইন: প্রবাস থেকে সরাসরি কল করুন +880 96667105105 অথবা দেশে থাকা আত্মীয়দের মাধ্যমে টোল ফ্রি 105 নম্বরে (বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত)।
৩. প্রবাস থেকে এনআইডি আবেদনে প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অফিশিয়াল চেকলিস্ট (Checklist Table)
অনলাইনে ফরম পূরণের সময় এবং দূতাবাসে উপস্থিত হয়ে বায়োমেট্রিক দেওয়ার জন্য নিচের ৭টি নথিপত্র প্রস্তুত রাখা আবশ্যক:
| ক্রমিক | কাগজপত্রের নাম ও বিবরণ | কার জন্য প্রযোজ্য | কপি ও সত্যায়ন নিয়ম | জরুরি নির্দেশনা ও ব্যবহারিক নিয়ম |
|---|---|---|---|---|
| ০১ | বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্ট (MRP / e-Passport) | বাধ্যতামূলক | মূল পাসপোর্ট + স্পষ্ট ফটোকপি | পাসপোর্টের ব্যক্তিগত তথ্য পৃষ্ঠা এবং ভিসার পৃষ্ঠা স্ক্যান করতে হবে। পাসপোর্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়। |
| ০২ | ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন (Digital BDRIS) | বাধ্যতামূলক | অনলাইন ভেরিফাইড কপি | হাতে লেখা পুরোনো জন্ম নিবন্ধন গ্রহণযোগ্য নয়। সনদটি অবশ্যই ১৭ ডিজিটের হতে হবে এবং bdris.gov.bd সার্ভারে অনলাইন রেকর্ড থাকতে হবে। |
| ০৩ | পিতা ও মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র (Smart NID) | বাধ্যতামূলক | উভয়ের এনআইডি ফটোকপি | পিতা-মাতার স্মার্ট এনআইডির স্পষ্ট কপি। পিতা বা মাতা মৃত হলে অতিরিক্ত হিসেবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মৃত্যু সনদপত্র সংযুক্ত করতে হবে। |
| ০৪ | বিদেশে বসবাসের বৈধ অনুমতিপত্র (Iqama / Visa / PR) | বাধ্যতামূলক | মূল কার্ড + ফটোকপি | মধ্যপ্রাচ্যের আকামা (Iqama), ইউরোপ-আমেরিকার রেসিডেন্স পারমিট (PR), গ্রিন কার্ড বা ওয়ার্ক পারমিট ভিসার রঙিন কপি। |
| ০৫ | বাংলাদেশে পৈতৃক স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণপত্র | বাধ্যতামূলক | জমির দলিল / খতিয়ানের কপি | বাংলাদেশে নিজ গ্রাম বা শহরের পৈতৃক ভিটার জমির খতিয়ান (CS/SA/RS/BS), নামজারি দাখিলা অথবা বিদ্যুৎ বিল/হোল্ডিং ট্যাক্স রসিদের কপি। |
| ০৬ | স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলর নাগরিকত্ব সনদ | বাধ্যতামূলক | মূল সনদের স্ক্যান কপি | স্থায়ী ঠিকানার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত 'প্রবাসী নাগরিকত্ব ও চারিত্রিক প্রত্যয়নপত্র'। |
| ০৭ | দ্বৈত নাগরিকত্ব সনদপত্র (Dual Nationality Certificate) | প্রযোজ্য ক্ষেত্রে | স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মূল সনদ | যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার নাগরিকত্ব গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জননিরাপত্তা বিভাগ কর্তৃক ইস্যুকৃত দ্বৈত নাগরিকত্ব সনদ বাধ্যতামূলক। |
৪. সরকারি ফি তালিকা ও ডেলিভারি সময়সীমা ২০২৬ (Official Fee & Timeline)
নির্বাচন কমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রবাসীদের এনআইডি রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
| সেবার খাত ও কার্যক্রম | সরকারি ফি | নিষ্পত্তির গড় সময় | মন্তব্য ও আইনি নিয়ম |
|---|---|---|---|
| অনলাইন নতুন প্রবাসী ভোটার আবেদন (ফরম-২) | সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (০/- টাকা) | তাৎক্ষণিক | services.nidw পোর্টালে কোনো ফি লাগে না |
| বাংলাদেশ দূতাবাসে বায়োমেট্রিক ও ছবি গ্রহণ | সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (০/- টাকা) | অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুযায়ী | মিশনে কোনো কনস্যুলার ফি দিতে হয় না |
| বাংলাদেশে পৈতৃক ঠিকানায় পুলিশ ও ইসি তদন্ত | সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (০/- টাকা) | ১৫ থেকে ২১ কার্যদিবস | উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও এসবি তদন্ত |
| অনলাইন ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড (PDF) ডাউনলোড | সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (০/- টাকা) | অনুমোদন পাওয়া মাত্রই | কিউআর কোডযুক্ত রঙিন ডিজিটাল কার্ড |
| সর্বমোট সরকারি খরচ | ০/- টাকা (শতভাগ ফ্রি) | ৩০ থেকে ৪৫ কার্যদিবস | কোনো দালালি বা অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া নিষিদ্ধ |
৫. ধাপে ধাপে services.nidw.gov.bd পোর্টালে প্রবাস থেকে অনলাইন আবেদন পদ্ধতি
প্রবাসে বসে ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনের মাধ্যমে মাত্র ১৫ মিনিটে আবেদন দাখিল করার সম্পূর্ণ কার্যপ্রণালী:
ধাপ ১: পোর্টালে প্রবেশ ও প্রবাসী ক্যাটাগরি নির্বাচন
- ব্রাউজারে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল লিংকে প্রবেশ করুন: https://services.nidw.gov.bd/nid-pub/
- হোমপেজে 'নতুন ভোটার হিসেবে আবেদন' অপশনে ক্লিক করুন।
- আবেদনকারীর ধরন হিসেবে 'প্রবাসী ভোটার' (Expatriate Voter) নির্বাচন করুন।
ধাপ ২: বর্তমান প্রবাসের দেশ ও দূতাবাস মিশন নির্বাচন
- ড্রপডাউন মেনু থেকে আপনার বর্তমান বসবাসের দেশ (যেমন: সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া ইত্যাদি) সিলেক্ট করুন।
- সংশ্লিষ্ট দেশের নিকটস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট অফিস নির্বাচন করুন (যেমন: বাংলাদেশ দূতাবাস রিয়াদ, বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেদ্দা, বাংলাদেশ দূতাবাস আবুধাবি, বা বাংলাদেশ কনস্যুলেট দুবাই)।
ধাপ ৩: ব্যক্তিগত ও পিতা-মাতার তথ্য পূরণ
- আপনার নাম বাংলায় এবং ইংরেজিতে পাসপোর্টের হুবহু অনুযায়ী টাইপ করুন।
- পিতার নাম, মাতার নাম এবং তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্মতারিখ নির্ভুলভাবে ইনপুট দিন।
- আপনার বৈবাহিক অবস্থা, ধর্ম এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্বাচন করুন।
ধাপ ৪: বাংলাদেশে পৈতৃক স্থায়ী ঠিকানা নির্বাচন
- বাংলাদেশে আপনার স্থায়ী ঠিকানা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্বাচন করুন: বিভাগ > জেলা > উপজেলা / থানা > ইউনিয়ন পরিষদ / পৌরসভা > ওয়ার্ড নম্বর > গ্রাম ও ডাকঘর।
- মনে রাখবেন—এই ঠিকানাতেই নির্বাচন কর্মকর্তা সরেজমিন তদন্ত করতে যাবেন। তাই এখানে কোনো ভুল তথ্য দেওয়া যাবে না।
ধাপ ৫: পাসপোর্ট ও আকামা তথ্য এন্ট্রি এবং ফাইল আপলোড
- আপনার বাংলাদেশি পাসপোর্ট নম্বর, ইস্যুর স্থান ও মেয়াদ ইনপুট দিন। প্রবাসের আকামা/ভিসা নম্বর লিখুন।
- পাসপোর্ট, জন্ম নিবন্ধন, পিতা-মাতার এনআইডি ও স্থায়ী ঠিকানার দলিলের স্পষ্ট স্ক্যান কপি (PDF বা JPG, সাইজ সর্বোচ্চ ১ মেগাবাইট) আপলোড করুন।
ধাপ ৬: চূড়ান্ত সাবমিশন ও ফরম-২ প্রিন্ট
- সব তথ্য যাচাই করে ফাইনাল সাবমিট করুন।
- সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি 'ফরম-২' (Voter Form-2) এবং অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লিপ জেনারেট করবে। এটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট নিয়ে নিন। এতে আপনার একটি ইউনিক ট্র্যাকিং আইডি ও দূতাবাসে যাওয়ার তারিখ উল্লেখ থাকবে।
৬. দূতাবাসে বায়োমেট্রিক প্রদান ও বাংলাদেশে পৈতৃক ঠিকানায় তদন্তের নিয়ম
অনলাইন ফর্ম পূরণের পর কার্ড ইস্যু হওয়ার মধ্যবর্তী ধাপসমূহ যেভাবে সম্পন্ন হয়:
- দূতাবাসে সশরীরে বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট: নির্ধারিত তারিখে প্রিন্টকৃত ফরম-২, মূল পাসপোর্ট, আকামা/ভিসা এবং জন্ম নিবন্ধনের মূল কপিসহ সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটের এনআইডি বুথে উপস্থিত হোন। সেখানে নির্বাচন কমিশনের স্পেশাল অপারেটর আপনার ডিজিটাল ছবি তুলবেন, ১০ আঙুলের ছাপ নেবেন এবং চোখের আইরিশ স্ক্যান করবেন।
- দূতাবাস কনস্যুলার অনুমোদন: দূতাবাসের কর্মকর্তা আপনার মূল পাসপোর্ট দেখে সন্তুষ্ট হলে সিস্টেমে ফাইলটি 'Forward to EC HQ' অনুমোদন করে দেবেন।
- বাংলাদেশে পৈতৃক ঠিকানায় স্থানীয় তদন্ত: ফাইলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার স্থায়ী ঠিকানার উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে চলে যায়। উপজেলা কর্মকর্তা ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা পুলিশ স্পেশাল ব্রাঞ্চের (SB) মাধ্যমে তদন্ত করান যে আপনি সত্যিই ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং আপনার পিতা-মাতার তথ্য সঠিক কি না।
- তদন্ত রিপোর্ট ও কেন্দ্রীয় অনুমোদন: স্থানীয় তদন্তে ইতিবাচক রিপোর্ট পাওয়ার পর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তার প্যানেল থেকে অ্যাপ্রুভ করেন এবং ঢাকার নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে আপনার নামে নতুন ১০ ডিজিটের স্মার্ট এনআইডি নম্বর ইস্যু করা হয়।
৭. আবেদন বাতিল বা পেন্ডিং হওয়ার ৭টি মারাত্মক কারণ ও সতর্কতা (Common Mistakes)
প্রবাসীদের অনেক আবেদন মাসের পর মাস নির্বাচন অফিসে ঝুলে থাকে কিছু অসাবধানতার কারণে। নিচের ভুলগুলো সম্পর্কে আগে থেকেই সতর্ক থাকুন:
- ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন ১৭ ডিজিটের না হওয়া: হাতে লেখা পুরোনো জন্ম নিবন্ধন বা ১৬ ডিজিটের নম্বর দিলে আবেদন সাথে সাথে বাতিল হয়। জন্ম নিবন্ধন অবশ্যই ১৭ ডিজিটের ইংরেজি ও বাংলা অনলাইন ভেরিফাইড হতে হবে।
- পাসপোর্টের তথ্যের সাথে জন্মতারিখ বা নামের অমিল: পাসপোর্টে যে নাম ও জন্মতারিখ রয়েছে, আবেদনে তার থেকে ভিন্ন তথ্য দিলে দূতাবাস বা নির্বাচন কমিশন ফাইল সরাসরি রিজেক্ট করে দেয়। পাসপোর্টের সাথে হুবহু মিল রাখা আবশ্যক।
- দেশে থাকা পরিবারকে তদন্তের বিষয়ে অবহিত না রাখা: আপনি প্রবাসে আবেদন করেছেন কিন্তু দেশে আপনার গ্রামের বাড়ির আত্মীয়-স্বজনকে জানাননি। নির্বাচন কর্মকর্তা বা পুলিশ গ্রামে গিয়ে যদি পরিবারের কাউকে না পান বা প্রতিবেশীরা অজ্ঞতা প্রকাশ করে, তবে ফাইল 'অবাঞ্ছিত/ভুয়া' হিসেবে বাতিল হয়ে যায়।
- দ্বৈত নাগরিকদের দ্বৈত নাগরিকত্ব সনদ না দেওয়া: যাদের বিদেশের পাসপোর্ট রয়েছে কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বৈত নাগরিকত্ব সনদ নেননি, তাদের ক্ষেত্রে আবেদন আটকে যায়। আগে দ্বৈত সনদ নিতে হবে।
- পিতা-মাতার এনআইডি কপি সংযুক্ত না করা: পিতা-মাতার এনআইডি কার্ডের কপি ছাড়া কোনো প্রবাসীর আবেদন অনুমোদন পায় না। পিতা-মাতা মৃত হলে তাদের মৃত্যু সনদ ও ভাই-বোনের এনআইডি দিতে হবে।
- ঝাপসা বা মোবাইল দিয়ে বাঁকা করে তোলা ছবি আপলোড করা: পাসপোর্টের পাতা বা দলিলের অস্পষ্ট ছবি দিলে কর্মকর্তা ফাইল ওপেন না করেই বাতিল করে দেন। ফ্ল্যাট স্ক্যানার দিয়ে পরিষ্কার ২০০ ডিপিআই স্ক্যান কপি দিন।
- প্রবাসে কোনো দালাল বা এজেন্সিকে টাকা দেওয়া: অনেক দালাল প্রবাসীদের বলে ৩ দিনে এনআইডি এনে দেবে। মনে রাখবেন, নির্বাচন কমিশন কোনো বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে এই কাজ করে না। এটি শতভাগ সরকারি ও ফ্রি সার্ভিস। দালালকে টাকা দিলে ভুয়া কার্ড পেয়ে প্রতারিত হবেন।
৮. ডিজিটাল স্মার্ট এনআইডি কার্ড ডাউনলোড ও প্লাস্টিক কার্ড পাওয়ার নিয়ম
আবেদন চূড়ান্ত অনুমোদন হওয়ার পর আপনার স্মার্ট এনআইডি ব্যবহারের প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ:
- এসএমএস নোটিফিকেশন: আবেদন অনুমোদিত হলে আপনার নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে এসএমএস আসবে: "Your Expatriate NID application has been approved. Your NID Number is [XXXXXXXXXX]"।
- অনলাইন কপি ডাউনলোড: services.nidw.gov.bd পোর্টালে আপনার এনআইডি নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে রেজিস্টার করে NID Wallet অ্যাপ দিয়ে ফেস ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করুন। ড্যাশবোর্ড থেকে কিউআর কোড সংবলিত রঙিন ডিজিটাল এনআইডি পিডিএফ ডাউনলোড করে প্রিন্ট নিয়ে নিন।
- আইনি গ্রহণযোগ্যতা: এই কিউআর কোডযুক্ত রঙিন অনলাইন কপিটি মূল স্মার্ট কার্ডের সমতুল্য শতভাগ আইনগত মর্যাদা রাখে। এটি দিয়ে আপনি দেশে জমি রেজিস্ট্রি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা বা প্রবাস স্কিমে যুক্ত হওয়ার যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন।
- প্লাস্টিক চিপযুক্ত স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ: নির্বাচন কমিশন পরবর্তীতে কূটনৈতিক ডাকযোগে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে আপনার প্লাস্টিক স্মার্ট কার্ড পাঠিয়ে দিলে দূতাবাস থেকে সরাসরি সংগ্রহ করতে পারবেন অথবা পরবর্তীতে দেশে এলে আপনার উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকেও মূল কার্ডটি গ্রহণ করতে পারবেন।
৯. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (In-Depth FAQ)
প্রবাসী ভোটার এনআইডি নিবন্ধন সংক্রান্ত প্রবাসীদের সর্বাধিক জিজ্ঞাসিত ৬টি জটিল প্রশ্নের সুস্পষ্ট সমাধান:
প্রশ্ন ১: আমার কোনো বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেই, আমি কি প্রবাস থেকে এনআইডি করতে পারব?
উত্তর: প্রবাস থেকে দূতাবাস মারফত আবেদন করতে হলে বাংলাদেশি পাসপোর্ট (মেয়াদযুক্ত বা মেয়াদোত্তীর্ণ) থাকা বাধ্যতামূলক, কারণ পাসপোর্টই প্রবাসে আপনার নাগরিকত্বের একমাত্র আইনি প্রমাণ। যদি আপনার কোনো পাসপোর্ট না থাকে, তবে আপনাকে আগে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস থেকে নতুন পাসপোর্ট তৈরি করতে হবে অথবা স্বদেশে ছুটি নিয়ে এসে সরাসরি উপজেলা নির্বাচন অফিসে গিয়ে ভোটার হতে হবে।
প্রশ্ন ২: প্রবাসে জন্মগ্রহণকারী দ্বিতীয় প্রজন্মের সন্তানরা কীভাবে এনআইডি পাবে?
উত্তর: প্রবাসে জন্ম নেওয়া সন্তানরা ১৮ বছর পূর্ণ হলে তারাও আবেদন করতে পারবে। তাদের ক্ষেত্রে দূতাবাস থেকে ইস্যুকৃত বাংলাদেশি পাসপোর্ট, জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং পিতা-মাতার বাংলাদেশি স্মার্ট এনআইডি কার্ড দাখিল করতে হবে।
প্রশ্ন ৩: অনলাইন থেকে ডাউনলোড করা রঙিন এনআইডি দিয়ে কি দেশে জমি রেজিস্ট্রি করা যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, শতভাগ করা যাবে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এনআইডি পোর্টাল থেকে ডাউনলোডকৃত কিউআর কোড সংবলিত ডিজিটাল এনআইডি কার্ড সরকারি-বেসরকারি সকল কাজে প্লাস্টিক স্মার্ট কার্ডের সমতুল্য শতভাগ গ্রহণযোগ্য। সাব-রেজিস্ট্রাররা কিউআর কোড স্ক্যান করে এনআইডির সত্যতা নিশ্চিত করেন।
প্রশ্ন ৪: দেশে পুলিশ ভেরিফিকেশনে কোনো সমস্যা হলে প্রবাস থেকে কীভাবে সমাধান করব?
উত্তর: অনলাইনে আবেদন দাখিলের পর আপনার অ্যাপ্লিকেশন ট্র্যাকিং নম্বরটি দেশে থাকা আপনার পিতা, ভাই বা নিকটাত্মীয়কে দিয়ে রাখুন। স্থানীয় উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বা পুলিশ যখন গ্রামে তদন্তে যাবেন, তখন পরিবারের সদস্যরা যেন মূল জমির দলিল ও ওয়ারিশান সনদ নিয়ে উপস্থিত হয়ে সহযোগিতা করেন। কোনো কাগজ ঘাটতি থাকলে তারা স্থানীয় নির্বাচন অফিসে সরাসরি জমা দিতে পারবেন।
প্রশ্ন ৫: প্রবাসীদের এনআইডি কার্ড করতে কত দিন সময় লাগে?
উত্তর: দূতাবাসে বায়োমেট্রিক দেওয়ার পর দেশে স্থানীয় তদন্ত প্রতিবেদন পাঠাতে সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ দিন সময় লাগে। সার্বিক কার্যক্রম শেষে সাধারণত ৩০ থেকে ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে অনলাইনে কার্ড তৈরি হয়ে যায়।
প্রশ্ন ৬: প্রবাসীদের এনআইডি করতে কি কোনো সরকারি ফি দিতে হয়?
উত্তর: না, একদমই না। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নতুন ভোটার নিবন্ধন ও স্মার্ট এনআইডি কার্ড প্রদান সম্পূর্ণ ফ্রি ও বিনামূল্যে। দূতাবাস বা অন্য কোথাও কোনো ধরনের ফি বা চার্জ প্রযোজ্য নয়।
লেখক ও গবেষক: বায়েজীদ জামান
ডিজিটাল নাগরিক সেবা, এনআইডি আইন ও প্রবাসী অধিকার গবেষক। korkho.blogspot.com-এর মূল লক্ষ্য ও আদর্শ হলো বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে অবস্থানরত সাধারণ প্রবাসী ও দেশের নাগরিকদের জন্য জটিল সরকারি, প্রশাসনিক ও এনআইডি সেবাসমূহকে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের সহায়তা ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, সহজবোধ্য ও কার্যকরভাবে ঘরে বসে পাওয়ার নির্ভরযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করা।
তথ্যসূত্র ও আইনি দায়মুক্তি: এই নির্দেশিকা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (BEC) এনআইডি উইং, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কনস্যুলার শাখা এবং services.nidw.gov.bd-এর সর্বশেষ অফিশিয়াল পরিপত্রের আলোকে সংকলিত। সরকারি নীতিমালা ও মিশন তালিকা যেকোনো সময় সরকার কর্তৃক পরিমার্জিত হতে পারে।
Post a Comment