মোটরসাইকেল ও গাড়ির মালিকানা বদল করার নিয়ম ২০২৬: বিআরটিএ পোর্টালে অনলাইন আবেদন, ফরম 'টি' ও 'টিও', স্ট্যাম্পে এফিডেভিট, সরকারি ফি, বায়োমেট্রিক ও ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (DRC) পাওয়ার সম্পূর্ণ গাইড (bsp.brta.gov.bd)

BRTA Vehicle Motorcycle Car Ownership Transfer Online Guidelines 2026

বাংলাদেশে ব্যবহৃত বা সেকেন্ড-হ্যান্ড মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস কিংবা বাণিজ্যিক পিকআপ ও ট্রাক কেনাবেচা একটি অত্যন্ত পরিচিত ও নিয়মিত ঘটনা। সাধ্যের মধ্যে পছন্দের বাহন পেতে কিংবা পুরোনো মডেল বদলে নতুন গাড়ি কিনতে প্রতিদিন দেশের প্রতিটি জেলায় হাজার হাজার গাড়ির হাতবদল হচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, গাড়ি কেনাবেচার পর সিংহভাগ ক্রেতা ও বিক্রেতা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর অফিশিয়াল রেকর্ডে আইনিভাবে মালিকানা বদল (Vehicle Ownership Transfer) সম্পন্ন করেন না। অনেকেই কেবল ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি দায়সারা নোটারি এফিডেভিট সম্পাদন করে কিংবা বিক্রেতার কাছ থেকে স্বাক্ষরযুক্ত খালি ফরম 'টি' ও 'টিও' হাতে নিয়ে বছরের পর বছর অন্যের নামে গাড়ি বা বাইক চালিয়ে যাচ্ছেন।

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এবং বিআরটিএ বিধিমালা অনুযায়ী, বৈধ মালিকানা পরিবর্তন ছাড়া অন্যের নামে নিবন্ধিত গাড়ি রাস্তায় চালানো সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ। এর ফলে বিক্রেতা এবং ক্রেতা উভয় পক্ষকেই যেকোনো মুহূর্তে মারাত্মক আইনি, আর্থিক ও ফৌজদারি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। বিক্রেতার নামে গাড়ি নিবন্ধিত থাকা অবস্থায় সেই গাড়ি দিয়ে যদি কোনো মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, কোনো অপরাধ সংঘটিত হয় কিংবা অবৈধ চোরাচালানে গাড়িটি জব্দ হয়—তবে প্রথম আসামি হিসেবে পুলিশ পূর্বের মূল মালিককেই আটক করবে। অপরদিকে ক্রেতার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পর গাড়ির ট্যাক্স টোকেন নবায়ন, বার্ষিক ফিটনেস পরীক্ষা, রুট পারমিট সংগ্রহ কিংবা হারিয়ে যাওয়া স্মার্ট ব্লুবুক রিইস্যু করা পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমনকি ট্রাফিক পুলিশের বিশেষ অভিযানে গাড়িটি তাৎক্ষণিকভাবে ডাম্পিংয়ে পাঠানো হতে পারে।

অতীতে বিআরটিএ অফিসে গিয়ে মালিকানা পরিবর্তন করা ছিল এক দুঃস্বপ্নের মতো জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। কিন্তু ২০২৬ সালে বাংলাদেশ সরকার ও বিআরটিএ তাদের সেবা ডিজিটালাইজেশনের আওতায় মালিকানা বদল প্রক্রিয়াকে শতভাগ স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক এবং দ্রুতগতির করেছে। এখন বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল bsp.brta.gov.bd-এর মাধ্যমে ঘরে বসেই অনলাইনে প্রাথমিক আবেদন দাখিল করা যায়, ডিজিটাল চালানে সরকারি ফি পরিশোধ করা যায় এবং নির্দিষ্ট তারিখে বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে স্বল্পতম সময়ে নতুন চিপযুক্ত ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (DRC Smart Card) সংগ্রহ করা যায়। একজন সিনিয়র ডিজিটাল নাগরিক সেবা গবেষক ও মোটরযান আইন বিশ্লেষক হিসেবে আজ আমি ২০২৬ সালের হালনাগাদ বিআরটিএ বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের চেকলিস্ট, সিসিভিত্তিক সরকারি ফি তালিকা, ধাপে ধাপে অনলাইন আবেদন, বায়োমেট্রিক যাচাই এবং দালালের প্রতারণা ছাড়া সফলভাবে স্মার্ট ব্লুবুক পাওয়ার সম্পূর্ণ প্র্যাকটিক্যাল গাইড তুলে ধরছি:

১. মালিকানা পরিবর্তন না করে গাড়ি চালানোর ৫টি মারাত্মক আইনি ও ফৌজদারি ঝুঁকি

গাড়ি কেনাবেচার পর নাম পরিবর্তন না করে শুধু এফিডেভিট বা স্ট্যাম্প চুক্তির ওপর নির্ভর করে বসে থাকার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা অধিকাংশ চালক উপলব্ধি করতে পারেন না। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এবং পেনাল কোডের বিধান অনুযায়ী নিচের ঝুঁকিগুলো যেকোনো সময় ঘটতে পারে:

গাড়ি বিক্রির পর নাম বদল না করলে বিক্রেতার যে ৫টি চরম ক্ষতি হয়:

  1. ফৌজদারি মামলার প্রধান আসামি হওয়া: আপনার বিক্রি করা গাড়ি দিয়ে যদি কোনো পথচারীকে চাপা দেওয়া হয় বা প্রাণহানি ঘটে, তবে থানা পুলিশ ও আদালত বিআরটিএ সার্ভারের রেকর্ড দেখে গাড়ির নিবন্ধিত মালিকের বিরুদ্ধেই মামলা নথিভুক্ত করবে এবং পরোয়ানা জারি করবে।
  2. সন্ত্রাসী বা মাদক সংক্রান্ত অপরাধের দায়: অনেক সময় অপরাধীরা অন্যের নামে থাকা গাড়ি কিনে অপরাধ বা অবৈধ মাদক পরিবহনে ব্যবহার করে গাড়ি ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। গাড়ি জব্দ হলে বিআরটিএ-তে যার নাম থাকবে, তাকেই পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়।
  3. বকেয়া ট্যাক্স ও জরিমানার দায়: ক্রেতা যদি নিয়মিত ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেস নবায়ন না করে, তবে বছর বছর জমতে থাকা বকেয়া রাজস্ব ও শতভাগ জরিমানা সরকারি হিসাবে পূর্বের মালিকের নামের বিপরীতেই দায়বদ্ধ থাকে।
  4. নতুন গাড়ি রেজিস্ট্রেশনে বাধা: আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রে পূর্বে নিবন্ধিত কোনো গাড়ির বিরুদ্ধে অনিষ্পন্ন মামলা বা বকেয়া রাজস্ব থাকলে বিআরটিএ সিস্টেমে আপনার নামে পরবর্তীতে নতুন কোনো গাড়ি বা মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন আটকে যাবে।
  5. আদালতের নোটিশ ও মানসিক হয়রানি: সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ যখন মোটরযান ট্রাইব্যুনালে ক্ষতিপূরণের দাবি জানায়, তখন ক্ষতিপূরণের নোটিশ ও দেনার বোঝা মূল মালিকের ঘাড়ে এসে পড়ে।

গাড়ি কেনার পর নাম পরিবর্তন না করলে ক্রেতার যে ৫টি সমস্যা হয়:

  1. কাগজপত্র নবায়নে জটিলতা: বিআরটিএ অনলাইন সিস্টেমে ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেস নবায়নের ক্ষেত্রে মালিকের এনআইডি ও ওটিপি ভেরিফিকেশন চালু রয়েছে। বিক্রেতাকে ছাড়া ক্রেতা নিজে এটি নবায়ন করতে গিয়ে ব্যর্থ হন।
  2. গাড়ি চুরি বা হারিয়ে গেলে মামলা না করতে পারা: গাড়ি চুরি হলে থানায় জিডি বা এফআইআর করতে মূল মালিকের এনআইডি ও প্রমাণপত্র লাগে। ক্রেতা প্রকৃত মালিক হিসেবে আইনি প্রমাণ দেখাতে না পারায় বীমা দাবি বা আইনি প্রতিকার পান না।
  3. বিক্রেতার মৃত্যুর পর মালিকানা সংকট: বিক্রেতা যদি কোনো কারণে মারা যান, তবে তার আইনি ওয়ারিশদের ছাড়া মালিকানা বদল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ওয়ারিশরা গাড়ি ফেরত দাবি করলে ক্রেতা আইনি সংকটে পড়েন।
  4. পুনরায় বিক্রির সময় মূল্য ধস: পরবর্তীতে গাড়িটি অন্য কারো কাছে বিক্রি করতে গেলে মালিকানা না থাকার কারণে গাড়ির প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়।
  5. ট্রাফিক চেকপোস্টে গাড়ি আটক ও ডাম্পিং: হাইওয়ে ও শহরের ট্রাফিক চেকপোস্টে ডিজিটাল পজ (POS) মেশিনে গাড়ির মালিকানা যাচাইয়ের সময় বড় ধরনের গরমিল পেলে গাড়ি আটক বা ভারী জরিমানা ধার্য করা হয়।

২. অফিশিয়াল সরকারি সেবা পোর্টাল ও প্রয়োজনীয় লিংক

মালিকানা পরিবর্তনের আবেদন, ফি প্রদান ও ট্র্যাকিংয়ের জন্য সরকার নির্ধারিত একমাত্র অফিশিয়াল পোর্টালগুলো ব্যবহার করতে হবে:

  • বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল (BSP): https://bsp.brta.gov.bd (অনলাইন আবেদন, তথ্য এন্ট্রি, ফি হিসাব ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট গ্রহণের মূল ওয়েবসাইট)
  • বিআরটিএ অফিশিয়াল সিটিজেন পোর্টাল: https://brta.gov.bd (ফরম 'টি', 'টিও', নোটিশ ও সার্কুলার ডাউনলোডের লিংক)
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও সরকারি ই-চালান: https://echallan.gov.bd (ব্যাংক চালান যাচাইয়ের সরকারি ওয়েবসাইট)
  • জাতীয় হেল্পলাইন ও সহায়তা: বিআরটিএ তথ্য ও অভিযোগ কেন্দ্র কল সেন্টার নম্বর 16107 অথবা 09610990998 (সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত)।

৩. প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের শতভাগ নির্ভরযোগ্য অফিশিয়াল চেকলিস্ট (Checklist Table)

বিআরটিএ সার্কেল অফিসে ফাইল দাখিলের সময় কোনো একটি কাগজ বাদ পড়লে ফাইল বাতিল বা দীর্ঘদিন পেন্ডিং হয়ে থাকে। তাই বিএসপিতে আবেদনের আগে নিচের টেবিল অনুযায়ী সকল কাগজপত্র প্রস্তুত করে নেওয়া আবশ্যক:

ক্রমিক কাগজপত্রের নাম ও বিবরণ কার জন্য প্রযোজ্য কপি ও সত্যায়ন নিয়ম জরুরি নির্দেশনা ও নিয়মাবলী
০১ ফরম 'টিও' (Form T.O): ক্রেতা কর্তৃক মালিকানা বদলের আবেদন ফরম ক্রেতা মূল কপি (১ সেট) ফরমের নির্ধারিত স্থানে ক্রেতার ১ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি আঠা দিয়ে লাগিয়ে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা দ্বারা সত্যায়িত করতে হবে এবং স্বাক্ষর দিতে হবে।
০২ ফরম 'টি' (Form 'T'): বিক্রেতা কর্তৃক হস্তান্তরের নোটিশ ফরম বিক্রেতা মূল কপি (১ সেট) মূল রেজিস্ট্রেশন ফাইলে বিক্রেতার যে স্বাক্ষর ছিল, ঠিক একই স্বাক্ষর ফরমের নিচে দিতে হবে। কোনো কাটাকাটি বা অস্পষ্টতা গ্রহণযোগ্য নয়।
০৩ বিক্রয় বিজ্ঞপ্তি (Sales Intimation Form) উভয় পক্ষ মূল কপি (১ সেট) যে মোটরযান নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ বরাবর গাড়িটি হস্তান্তরিত হচ্ছে, সেখানে প্রেরণের জন্য যৌথ স্বাক্ষরযুক্ত নোটিশ।
০৪ ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে এফিডেভিট / বিক্রয় চুক্তিপত্র উভয় পক্ষ মূল স্ট্যাম্প কপি নোটারি পাবলিক অথবা প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা সম্পাদিত হতে হবে। উভয় পক্ষের পাসপোর্ট সাইজ ছবি স্ট্যাম্পে সংযুক্ত করে নোটারি সিল ও স্বাক্ষর করাতে হবে।
০৫ মূল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (স্মার্ট ব্লুবুক / DRC Card) বিক্রেতা মূল কার্ড + ১ সেট ফটোকপি চিপযুক্ত স্মার্ট কার্ডটি মূল ফাইলে জমা দিতে হবে। পুরোনো কাগুজে ব্লুবুক হলে মূল বইটি অক্ষত অবস্থায় দাখিল করতে হবে।
০৬ হালনাগাদ ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট বিক্রেতা মূল কপি + ফটোকপি ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেসের মেয়াদ অবশ্যই আবেদনের দিন পর্যন্ত হালনাগাদ থাকতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ থাকলে আগে জরিমানা দিয়ে রিনিউ করতে হবে।
০৭ জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও পাসপোর্ট সাইজ রঙিন ছবি উভয় পক্ষ এনআইডি ফটোকপি ও ৩ কপি করে ছবি উভয় পক্ষের স্মার্ট এনআইডি কার্ডের স্পষ্ট ফটোকপি এবং ল্যাব প্রিন্ট পাসপোর্ট সাইজ ছবি (গেজেটেড কর্মকর্তা দ্বারা সত্যায়িত)।
০৮ ক্রেতার বর্তমান ঠিকানার প্রমাণপত্র (Utility Bill / Certificate) ক্রেতা ১ কপি ফটোকপি/মূল সিটি কর্পোরেশন কাউন্সিলর/পৌরসভা মেয়র/ইউপি চেয়ারম্যান প্রদত্ত নাগরিকত্ব সনদ অথবা ক্রেতার বর্তমান ঠিকানার বিদ্যুৎ/গ্যাস/পানি বিলের কপি।
০৯ ব্যাংক দায়মুক্তি সনদ (NOC for Loan Clearance) প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যাংকের মূল প্যাডে অনাপত্তিপত্র গাড়িতে যদি ব্যাংক ঋণ বা হায়ার পারচেজ (HP) দায়বদ্ধতা থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হেড অফিস/শাখা হতে ঋণ পরিশোধের মূল ছাড়পত্র ও এইচপি অবমুক্তির চিঠি সংযুক্ত করতে হবে।
১০ ই-টিন সার্টিফিকেট ও আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণক (PSR) প্রাইভেট কারের ক্ষেত্রে ১ কপি ফটোকপি আয়কর আইন অনুযায়ী ব্যক্তিগত প্রাইভেট কার, জিপ বা মাইক্রোবাসের মালিকানা গ্রহণের ক্ষেত্রে ক্রেতার হালনাগাদ ই-টিন ও রিটার্ন দাখিলের প্রাপ্তিস্বীকার পত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক (মোটরসাইকেলে প্রয়োজন নেই)।

৪. সরকারি ফি তালিকা ২০২৬: যানবাহনভিত্তিক সম্পূর্ণ পেমেন্ট ব্রেকডাউন (Fee Chart)

বিআরটিএ বিধিমালা এবং অর্থ আইন অনুযায়ী মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মূল ট্রান্সফার ফি, ১৫% সরকারি ভ্যাট, মোটরযান পরিদর্শকের ফিজিক্যাল ইন্সপেকশন ফি এবং নতুন ডিজিটাল চিপযুক্ত ব্লুবুক (DRC) ফি পরিশোধ করতে হয়। যানবাহন ক্যাটাগরিভেদে ২০২৬ সালের হালনাগাদ সরকারি ফি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

যানবাহনের ধরন ও সিসি (CC) সীমা মালিকানা বদল মূল ফি ডিআরসি স্মার্ট কার্ড ও ইন্সপেকশন ১৫% সরকারি ভ্যাট সর্বমোট পরিশোধযোগ্য সরকারি ফি
মোটরসাইকেল (১০০ সিসি বা তার নিচে) ২,৫০০/- টাকা ৫৫৫/- টাকা ৪৫৮/- টাকা ৩,৫১৩/- টাকা
মোটরসাইকেল (১০১ সিসি থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত) ৩,৫০০/- টাকা ৫৫৫/- টাকা ৬০৮/- টাকা ৪,৬৬৩/- টাকা
অটোরিকশা / থ্রি-হুইলার / সিএনজি ৩,০০০/- টাকা ৫৫৫/- টাকা ৫৩৩/- টাকা ৪,০৮৮/- টাকা
প্রাইভেট কার / জিপ (১৫০০ সিসি পর্যন্ত) ৬,০০০/- টাকা ৫৫৫/- টাকা ৯৮৩/- টাকা ৭,৫৩৮/- টাকা*
প্রাইভেট কার / জিপ (১৫০১ সিসি থেকে ২০০০ সিসি) ৮,০০০/- টাকা ৫৫৫/- টাকা ১,২৮৩/- টাকা ৯,৮৩৮/- টাকা*
প্রাইভেট কার / জিপ (২০০১ সিসির ঊর্ধ্বে) ১০,০০০/- টাকা ৫৫৫/- টাকা ১,৫৮৩/- টাকা ১২,১৩৮/- টাকা*
মাইক্রোবাস (Microbus) ৫,০০০/- টাকা ৫৫৫/- টাকা ৮৩৩/- টাকা ৬,৩৮৮/- টাকা
পিকআপ / ট্রাক / মাঝারি বাণিজ্যিক যান ৬,০০০/- টাকা ৫৫৫/- টাকা ৯৮৩/- টাকা ৭,৫৩৮/- টাকা

* বিশেষ আর্থিক সতর্কবার্তা (কার ও জিপের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর AIT): ব্যক্তিগত প্রাইভেট কার বা জিপের ক্ষেত্রে যদি অর্থবছরের অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (AIT / অগ্রিম কর) বকেয়া থাকে, তবে মালিকানা বদলের সময় সংশ্লিষ্ট সিসির ওপর ভিত্তি করে বার্ষিক এআইটি (১৫০০ সিসির জন্য ২৫,০০০ টাকা; ২০০০ সিসির জন্য ৫০,০০০ টাকা ইত্যাদি) স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফি ভাউচারে যুক্ত হতে পারে। তবে বিক্রেতা যদি চলতি অর্থবছরের ট্যাক্স টোকেন নবায়নের সময় অলরেডি এআইটি পরিশোধ করে থাকেন, তবে তা দ্বিতীয়বার ধার্য হবে না।

৫. ধাপে ধাপে বিএসপি পোর্টালে (bsp.brta.gov.bd) অনলাইন আবেদন পদ্ধতি

বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালের মাধ্যমে ডিজিটাল মালিকানা বদল আবেদন দাখিল করার সম্পূর্ণ কার্যপ্রণালী নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

ধাপ ১: বিএসপি (BSP) প্রোফাইলে রেজিস্ট্রেশন ও লগইন

  • প্রথমে যেকোনো ব্রাউজার দিয়ে বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালের অফিসিয়াল লিংকে প্রবেশ করুন: https://bsp.brta.gov.bd
  • আপনার পূর্বে বিএসপি একাউন্ট না থাকলে 'নিবন্ধন' বাটনে ক্লিক করে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ এবং ব্যক্তিগত সচল মোবাইল নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করুন।
  • মোবাইলে আসা ওটিপি (OTP) কোড ও পাসওয়ার্ড সেট করে অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের পৃথক বিএসপি প্রোফাইল থাকা সুবিধাজনক।

ধাপ ২: যানবাহন মালিকানা বদল মেনু নির্বাচন ও তথ্য যাচাই

  • ড্যাশবোর্ডের বাম পাশের মেনু থেকে 'যানবাহন' (Vehicle) অপশনে ক্লিক করে 'মালিকানা বদল আবেদন' (Ownership Transfer Application) নির্বাচন করুন।
  • গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর (যেমন: ঢাকা মেট্রো-ল ১২-৩৪৫৬) এবং গাড়ির ব্লুবুকে উল্লিখিত চেসিস নম্বরের শেষ ৪ বা ৫টি ডিজিট ইনপুট দিয়ে 'অনুসন্ধান' বাটনে ক্লিক করুন।
  • সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির ইঞ্জিন নম্বর, মেকার নাম, বর্তমান ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেসের মেয়াদ স্ক্রিনে প্রদর্শন করবে। সব তথ্য সঠিক থাকলে 'এগিয়ে যান' বাটনে ক্লিক করুন।

ধাপ ৩: ক্রেতা ও বিক্রেতার তথ্যাবলী ও ডিজিটাল ফরম পূরণ

  • বিক্রেতার বিবরণ: বিক্রেতার নাম, পিতা/স্বামীর নাম, মোবাইল নম্বর এবং এনআইডি নম্বর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে অথবা ফরম অনুযায়ী ভেরিফাই করতে হবে।
  • ক্রেতার বিবরণ: নতুন ক্রেতার নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ, পিতার নাম, মাতার নাম, স্থায়ী ঠিকানা এবং বর্তমান যোগাযোগের ঠিকানা যথাযথভাবে টাইপ করুন।
  • স্থানান্তর কারণ: ড্রপডাউন মেনু হতে 'স্বাভাবিক বিক্রয়' (Sale) নির্বাচন করুন (উত্তরাধিকার হলে 'উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত' সিলেক্ট করবেন)।

ধাপ ৪: প্রয়োজনীয় স্ক্যান কপি আপলোড

  • ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে নোটারি এফিডেভিটের স্পষ্ট স্ক্যান কপি (PDF বা JPG, সাইজ সর্বোচ্চ ১ মেগাবাইট)।
  • ক্রেতা ও বিক্রেতার স্বাক্ষরিত ফরম 'টি' ও ফরম 'টিও'-এর স্ক্যান কপি।
  • উভয় পক্ষের জাতীয় পরিচয়পত্রের রঙিন স্ক্যান কপি।
  • মূল ব্লুবুক ও হালনাগাদ ট্যাক্স টোকেনের কপি আপলোড করে আবেদনটি চূড়ান্ত সাবমিট করুন।

ধাপ ৫: সরকারি ফি অনলাইনে পরিশোধ (ই-পেমেন্ট)

  • আবেদন দাখিলের পর সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ট্র্যাকিং নম্বর সহ ফি অ্যাসেসমেন্ট ভাউচার জেনারেট করবে।
  • 'ফি জমা দিন' (Pay Now) বাটনে ক্লিক করে বিএসপি ইন্টিগ্রেটেড পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে বিকাশ (bKash), নগদ (Nagad), রকেট (Rocket), উপায় (Upay) অথবা সোনালী ব্যাংক ই-পেমেন্ট / ভিসা-মাস্টারকার্ডের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করুন।
  • পেমেন্ট সফল হলে বিআরটিএ-র ডিজিটাল ইলেকট্রনিক মানি রিসিপ্ট (e-MR) জেনারেট হবে। প্রাপ্তিস্বীকার পত্র ও পেমেন্ট রিসিটটি ২ কপি রঙিন প্রিন্ট করে সংরক্ষণ করুন।

৬. বিআরটিএ সার্কেল অফিসে ফিজিক্যাল ইন্সপেকশন ও বায়োমেট্রিক দেওয়ার নিয়ম

অনলাইনে ফি জমা দেওয়ার পর আবেদনটি সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ সার্কেল অফিসে প্রক্রিয়াকরণ শুরু হয়। মালিকানা বদল চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পরবর্তী অপরিহার্য ধাপ হলো সার্কেল অফিসে সশরীরে উপস্থিত হওয়া:

সার্কেল অফিসের ৩টি প্রধান কার্যক্রম:

  1. যানবাহনের ফিজিক্যাল ইন্সপেকশন (Physical Inspection): ক্রেতাকে মূল গাড়ি বা মোটরসাইকেলটি সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ সার্কেল অফিসের ইন্সপেকশন ইয়ার্ডে নিয়ে যেতে হবে। বিআরটিএ মোটরযান পরিদর্শক (Motor Vehicle Inspector - MVI) গাড়ির চেসিস নম্বর ও ইঞ্জিন নম্বর ফিজিক্যালি খোদাই করা অংশের ওপর পেন্সিল দিয়ে ট্রেসিং কাগজ ঘষে প্রিন্ট নেবেন এবং মূল ফাইলে সাঁটাবেন। কোনো কাটাকাটি বা পরিবর্তন থাকলে গাড়িটি অনুমোদন পাবে না।
  2. ক্রেতা ও বিক্রেতার বায়োমেট্রিক উপস্থিতি: ভুয়া বা চুরি হওয়া গাড়ি বিক্রয় রোধে বিআরটিএ বিধিমালা অনুযায়ী ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়কেই সশরীরে বিআরটিএ সার্কেল অফিসে উপস্থিত হতে হবে। মোটরযান পরিদর্শক বা সহকারী পরিচালক (প্রকৌশল)-এর সামনে উভয়ের এনআইডি ডাটাবেজের সাথে লাইভ ফিঙ্গারপ্রিন্ট (আঙুলের ছাপ) ও ডিজিটাল ছবি মিলিয়ে দেখা হয়।
  3. ফাইল জমা ও প্রাপ্তিস্বীকার স্লিপ গ্রহণ: মূল স্মার্ট ব্লুবুক, এফিডেভিট, ফরম টি ও টিও, এনআইডি কপি এবং ই-মানি রিসিট একসাথে ফাইলে বেঁধে সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দিলে ফাইলটি রিসিভ করা হবে এবং ক্রেতাকে একটি সিলযুক্ত 'অস্থায়ী ডেলিভারি স্লিপ' (Temporary Registration Slip / Acknowledgement) প্রদান করা হবে। এই স্লিপ দিয়ে চিপযুক্ত স্মার্ট ব্লুবুক ডেলিভারি না পাওয়া পর্যন্ত আইনসম্মতভাবে রাস্তায় গাড়ি চালানো যাবে।

⚠️ বিশেষ পরিস্থিতি (বিক্রেতা প্রবাসী বা উপস্থিত হতে অক্ষম হলে): বিক্রেতা যদি স্থায়ীভাবে বিদেশে অবস্থান করেন, তবে তিনি বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (Power of Attorney) সম্পাদন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সত্যায়িত করে পাঠালে তার পক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি বায়োমেট্রিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন। বিক্রেতা শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ হলে চিকিৎসকের সনদসহ বিআরটিএ উপ-পরিচালক বরাবর বিশেষ আবেদন করতে হয়।

৭. সাধারণ ভুলসমূহ ও আবেদন বাতিল/বিলম্বের ৭টি কারণ (Common Mistakes & Warnings)

মালিকানা বদলের আবেদন জমা দেওয়ার পর বহু মানুষের ফাইল মাসের পর মাস আটকে থাকে ছোটখাটো কিছু অসাবধানতার কারণে। আবেদন দাখিলের আগে এই ভুলগুলো অবশ্যই এড়িয়ে চলুন:

  1. মূল ফাইলে বিক্রেতার স্বাক্ষরের সাথে অমিল (Signature Mismatch): গাড়িটি যখন প্রথম রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল, তখন বিক্রেতা যে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন, বর্তমান ফরম 'টি' এবং এফিডেভিটের স্বাক্ষরের সাথে তা হুবহু মিলতে হবে। স্বাক্ষর না মিললে সহকারী পরিচালক ফাইল অনুমোদন করেন না এবং সরাসরি জালিয়াতির সন্দেহে আটকে দেন।
  2. ইঞ্জিন বা চেসিস নম্বরে অস্পষ্টতা বা ওভাররাইটিং: পুরোনো বাইক বা গাড়ির ইঞ্জিন নম্বর অনেক সময় মরিচা পড়ে মুছে যায় কিংবা মেরামতের সময় ইঞ্জিন পরিবর্তন করা হলেও বিআরটিএ রেকর্ডে তা হালনাগাদ করা থাকে না। এমন গরমিল থাকলে ইন্সপেক্টর ফাইলে লাল কালি দিয়ে রিজেক্ট করে দেন।
  3. ব্যাংক দায়বদ্ধতা (HP Loan) অবমুক্ত না করা: কিস্তিতে বা ব্যাংক ঋণে কেনা গাড়ির ব্লুবুকে 'H.P. with [Bank Name]' লেখা থাকে। ব্যাংক ঋণ সম্পূর্ণ শোধ হলেও যদি বিআরটিএ সার্ভার থেকে এইচপি কেটে ফেলা না হয়, তবে মালিকানা বদলের আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সফটওয়্যারে আটকে যায়।
  4. বকেয়া কর ও ট্রাফিক মামলার চালান পরিশোধ না করা: গাড়ির ওপর যদি ট্রাফিক পুলিশের কোনো অনিষ্পন্ন প্রসিকিউশন মামলা বা জরিমানা বাকি থাকে, অথবা ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদোত্তীর্ণ বকেয়া থাকে, তবে আগে তা পরিশোধ করে ক্লিয়ারেন্স না নিলে ফাইল রিসিভ করা হয় না।
  5. এনআইডি কার্ডের নামের বানান ও তথ্যের বৈসাদৃশ্য: ক্রেতা বা বিক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম বা পিতা-মাতার নামের বানানের সাথে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটের তথ্যে ভুল থাকলে সমস্যা দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে এফিডেভিটে বিষয়টি ব্যাখ্যামূলকভাবে উল্লেখ করতে হয়।
  6. দালালের ফাঁদে পড়ে ফাঁকা ফরমে স্বাক্ষর দেওয়া: বিআরটিএ প্রাঙ্গণে ঘোরাঘুরি করা দালালদের হাতে অনেকে স্বাক্ষরযুক্ত খালি ফরম দিয়ে আসেন। দালালরা অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর ভুয়া সিল দিয়ে ফাইল ফেলে রাখে, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করে।
  7. নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মেয়াদ বা নোটারি ভেরিফিকেশন না থাকা: সরকার নির্ধারিত ৩০০ টাকার কম মূল্যের স্ট্যাম্পে এফিডেভিট করলে কিংবা বৈধ লাইসেন্সধারী নোটারি পাবলিকের সিল-স্বাক্ষর ছাড়া চুক্তিপত্র জমা দিলে ফাইল সরাসরি বাতিল হয়।

৮. আবেদন ট্র্যাকিং ও নতুন চিপযুক্ত স্মার্ট ব্লুবুক (DRC) সংগ্রহের ধাপ

বিআরটিএ সার্কেল অফিসে ফাইল জমা ও বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন স্মার্ট কার্ড সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিম্নরূপ:

  • অনলাইন ট্র্যাকিং: আপনার বিএসপি অ্যাকাউন্টে লগইন করে 'আবেদনের অবস্থা' (Application Status) চেক করুন। সেখানে 'Application Approved' এবং পরবর্তীতে 'Smart Card Printing Done' স্ট্যাটাস দেখতে পাবেন।
  • এসএমএস নোটিফিকেশন: কার্ডটি প্রিন্ট হওয়ার পর বিআরটিএ-র কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ থেকে আপনার নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে এসএমএস আসবে (যেমন: "Your DRC for vehicle Dhaka Metro-XX is ready for collection...")।
  • সশরীরে কার্ড সংগ্রহ: এসএমএস পাওয়ার পর আবেদনকারীকে তার মূল অস্থায়ী ডেলিভারি স্লিপ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে বিআরটিএ সার্কেল অফিসের স্মার্ট কার্ড বিতরণ শাখায় উপস্থিত হতে হবে।
  • বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট ভেরিফিকেশন দিয়ে ডেলিভারি: বিতরণ কাউন্টারে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ করানোর মাধ্যমে আপনাকে নতুন মালিক হিসেবে আপনার নাম ও ছবিযুক্ত ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (DRC Smart Card) হস্তান্তর করা হবে। সাধারণত ফাইল জমার পর ১৫ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এই কার্ড প্রিন্ট সম্পন্ন হয়।

৯. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (In-Depth FAQ)

মোটরযান মালিকানা স্থানান্তর সংক্রান্ত নাগরিকদের সবচেয়ে জটিল ও সাধারণ প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক সমাধান:

প্রশ্ন ১: মূল বিক্রেতা মারা গেলে বা তাকে খুঁজে না পাওয়া গেলে কীভাবে মালিকানা বদল করা যাবে?

উত্তর: যদি মূল নিবন্ধিত মালিক মারা যান, তবে তার বৈধ উত্তরাধিকারীদের (ওয়ারিশ) আদালত বা স্থানীয় সরকার কর্তৃক প্রদত্ত 'ওয়ারিশান সনদ' এবং সকল ওয়ারিশের অনাপত্তিপত্র (NOC) এফিডেভিট সংগ্রহ করতে হবে। সকল ওয়ারিশ উপস্থিত হয়ে বা তাদের পক্ষে ক্ষমতা অর্পণ করে গাড়ির মালিকানা ক্রেতার নামে হস্তান্তরের আবেদন করতে পারবেন। আর যদি বিক্রেতা নিখোঁজ হন বা কোনোভাবেই যোগাযোগ না করা যায়, তবে আদালতের সুনির্দিষ্ট ডিগ্রি বা আইনি ডিক্লারেশন ছাড়া বিআরটিএ সরাসরি একতরফা মালিকানা বদল করতে পারে না। এ কারণেই গাড়ি কেনার সময় বিক্রেতার উপস্থিতি নিশ্চিত করে সাথে সাথেই নাম বদল করে নেওয়া উচিত।

প্রশ্ন ২: আমি শুধু স্ট্যাম্প চুক্তি ও ওপেন টি/টিও (Open T/T.O) নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি, এতে কী কী ক্ষতি হতে পারে?

উত্তর: এটি একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ অভ্যাস। ওপেন টি/টিও-তে স্বাক্ষরের আইনি মেয়াদ চিরস্থায়ী নয়। দীর্ঘদিন পর যখন আপনি নাম পরিবর্তন করতে যাবেন, তখন দেখা যাবে বিক্রেতার এনআইডি ডাটাবেজের সাথে বিএসপি লিঙ্ক হচ্ছে না কিংবা বিক্রেতার বর্তমান স্বাক্ষরের সাথে পুরোনো স্বাক্ষর মিলছে না। তাছাড়া যেকোনো চেকপোস্টে ট্রাফিক পুলিশ গাড়িটির বৈধ মালিকানা না দেখে গাড়ি জব্দ করতে পারে এবং সড়ক পরিবহন আইনে ৫,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা মামলা দিতে পারে।

প্রশ্ন ৩: মালিকানা বদল করার পর গাড়ির নম্বর কি পরিবর্তন হয়ে যায়?

উত্তর: না, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর (যেমন: ঢাকা মেট্রো-হ ১২-৩৪৫৬) আজীবন অপরিবর্তিত থাকে। মালিকানা হস্তান্তরের মাধ্যমে কেবল বিআরটিএ-র কেন্দ্রীয় সার্ভারে এবং স্মার্ট চিপে গাড়ির মালিক হিসেবে পূর্বের ব্যক্তির নামের স্থলে আপনার নাম, ঠিকানা ও ছবি প্রতিস্থাপিত হয়।

প্রশ্ন ৪: এক সার্কেলের গাড়ি কি অন্য সার্কেলে মালিকানা বদল করা যায় (যেমন: চট্টগ্রাম মেট্রোর গাড়ি ঢাকায়)?

উত্তর: হ্যাঁ, এটিকে আন্তঃসার্কেল বা ইন্টার-সার্কেল ট্রান্সফার বলা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে মূল রেজিস্ট্রেশন যে সার্কেলে হয়েছে (যেমন: চট্টগ্রাম সার্কেল), আবেদনটি প্রথমে সেই মূল সার্কেলে নিষ্পত্তি করতে হবে অথবা মূল সার্কেল থেকে ছাড়পত্র (NOC / Clearance) সংগ্রহ করে ক্রেতার স্থানীয় সার্কেল অফিসে ফাইল রেকর্ড ট্রান্সফার করতে হবে। বিএসপি পোর্টালে অনলাইন আবেদনের মাধ্যমে এখন এই আন্তঃসার্কেল রেকর্ড আদান-প্রদান অনেক সহজ হয়ে গেছে।

প্রশ্ন ৫: গাড়িটি কোনো কোম্পানি বা লিমিটেড প্রতিষ্ঠানের নামে থাকলে কী কী অতিরিক্ত কাগজপত্র লাগে?

উত্তর: গাড়ির মালিক যদি কোনো কোম্পানি, ব্যাংক বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হয়, তবে তাদের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সভা কর্তৃক গৃহীত আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবপত্র (Board Resolution), গাড়ি বিক্রির ক্ষমতা অর্পণপত্র (Letter of Authorization), কোম্পানির মেমোরেন্ডাম ও আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন (MOA/AOA), কোম্পানির নিজস্ব প্যাডে ইনভয়েস/মানি রিসিট এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধির এনআইডি ও ছবি দাখিল করতে হবে।

প্রশ্ন ৬: বিএসপিতে ফি দেওয়ার পর কত দিনের মধ্যে বিআরটিএ অফিসে ফাইল জমা দিতে হবে?

উত্তর: বিএসপিতে ফি পরিশোধের পর ইলেকট্রনিক মানি রিসিট (e-MR) জেনারেট হওয়ার পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে গাড়ি ইন্সপেকশন করিয়ে মূল ফাইল সার্কেল অফিসে দাখিল করা বাধ্যতামূলক। অতিরিক্ত দেরি করলে পেমেন্ট ভাউচারের মেয়াদ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে এবং পুনরায় যাচাইয়ের প্রয়োজন পড়তে পারে।


লেখক ও গবেষক: বায়েজীদ জামান

ডিজিটাল নাগরিক সেবা, ভূমি ও মোটরযান আইন বিশেষজ্ঞ। korkho.blogspot.com-এর মূল লক্ষ্য ও আদর্শ হলো বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের জন্য জটিল সরকারি, প্রশাসনিক ও ডিজিটাল সেবাসমূহকে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের সহায়তা ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, সহজবোধ্য ও কার্যকরভাবে ঘরে বসে পাওয়ার নির্ভরযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করা।

তথ্যসূত্র ও আইনি দায়মুক্তি: এই নিবন্ধের তথ্যাবলী বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) আইন ২০১৮, মোটরযান বিধিমালা এবং bsp.brta.gov.bd-এর অফিসিয়াল নির্দেশিকা অনুযায়ী যাচাইকৃত। সরকারি বিধিমালা ও ফি যেকোনো সময় বিআরটিএ কর্তৃক সংশোধিত হতে পারে।

Post a Comment

Previous Post Next Post