এসএসসি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য রসায়নের সবচেয়ে মৌলিক এবং প্রতি বছর বোর্ড পরীক্ষায় বাধ্যতামূলক প্রশ্ন আসা একটি অন্যতম অধ্যায় হলো ৪র্থ অধ্যায় 'পর্যায় সারণি' (Periodic Table)। রসায়নের প্রতিটি মৌলের বৈশিষ্ট্য, রাসায়নিক বন্ধন এবং বিভিন্ন যৌগের আচরণ বুঝতে হলে পর্যায় সারণির স্পষ্ট ধারণা থাকা অপরিহার্য। বোর্ড পরীক্ষার সৃজনশীল প্রশ্নে উদ্দীপকে কাল্পনিক প্রতীক (যেমন: X, Y, Z) দিয়ে মৌল চিহ্নিত করতে বলা হয় এবং সেগুলোর পর্যায় ও গ্রুপ নির্ণয়, পারমাণবিক আকারের ক্রম এবং আয়নিকরণ শক্তির ব্যতিক্রম ব্যাখ্যা করতে বলা হয়। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য এই অধ্যায়ের শীর্ষ বোর্ড প্রশ্নগুলোর নির্ভুল সমাধান এবং পূর্ণ নম্বর পাওয়ার টেকনিক নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ইলেকট্রন বিন্যাস থেকে পর্যায় ও গ্রুপ নির্ণয়ের তিনটি সার্বজনীন নিয়ম
কোনো মৌলের ইলেকট্রন বিন্যাসই হলো পর্যায় সারণিতে তার প্রকৃত অবস্থান জানার মূল চাবিকাঠি:
- পর্যায় নির্ণয়: কোনো মৌলের ইলেকট্রন বিন্যাসের সবচেয়ে বাইরের প্রধান শক্তিস্তরের নম্বরটিই (সর্বোচ্চ কোয়ান্টাম সংখ্যা $n$) হলো ঐ মৌলের পর্যায় নম্বর।
উদাহরণ: সোডিয়াম ($_{11} ext{Na} = 1s^2 2s^2 2p^6 3s^1$)-এর সর্বোচ্চ শক্তিস্তর ৩, তাই Na ৩য় পর্যায়ের মৌল। - গ্রুপ নির্ণয় (নিয়ম ১): যদি মৌলের সর্ববহিস্থ শক্তিস্তরে কেবল s-অরবিটাল থাকে, তবে s-অরবিটালের মোট ইলেকট্রন সংখ্যাই হবে তার গ্রুপ নম্বর।
উদাহরণ: ম্যাগনেসিয়াম ($_{12} ext{Mg} = 1s^2 2s^2 2p^6 3s^2$)-এর বহিস্থ $3s$-এ ২টি ইলেকট্রন রয়েছে, তাই Mg-এর গ্রুপ নম্বর ২। - গ্রুপ নির্ণয় (নিয়ম ২): যদি মৌলের সর্ববহিস্থ শক্তিস্তরে s এবং p উভয় অরবিটাল থাকে, তবে বহিস্থ s ও p অরবিটালের মোট ইলেকট্রন সংখ্যার সাথে ১০ যোগ করে গ্রুপ নম্বর নির্ধারণ করতে হয়।
উদাহরণ: ক্লোরিন ($_{17} ext{Cl} = 1s^2 2s^2 2p^6 3s^2 3p^5$)-এর বহিস্থ স্তরে ইলেকট্রন সংখ্যা $2 + 5 = 7$। সুতরাং এর গ্রুপ নম্বর $7 + 10 = 17$। - গ্রুপ নির্ণয় (নিয়ম ৩): যদি মৌলের সর্ববহিস্থ s-অরবিটালের ঠিক পূর্ববর্তী ভেতরের স্তরে d-অরবিটাল থাকে, তবে বহিস্থ s-অরবিটাল এবং ভেতরের d-অরবিটালের মোট ইলেকট্রন সংখ্যার যোগফলই হবে গ্রুপ নম্বর।
উদাহরণ: আয়রন ($_{26} ext{Fe} = 1s^2 2s^2 2p^6 3s^2 3p^6 3d^6 4s^2$)-এর বহিস্থ $4s$-এ ২টি এবং ভেতরের $3d$-তে ৬টি ইলেকট্রন আছে। সুতরাং Fe-এর গ্রুপ নম্বর $6 + 2 = 8$।
২. পর্যায়বৃত্ত ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন: পারমাণবিক আকার ও আয়নিকরণ শক্তি
বোর্ড পরীক্ষায় 'গ' ও 'ঘ' অংশে নিয়মিত আসা দুটি মৌলিক ধর্ম:
- পারমাণবিক ব্যাসার্ধ (আকার): একই পর্যায়ে বাম থেকে ডানে গেলে প্রোটন সংখ্যা ও ইলেকট্রন সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু নতুন কোনো শক্তিস্তর যুক্ত হয় না। ফলে নিউক্লিয়াসের আকর্ষণ বৃদ্ধির কারণে পরমাণুর আকার হ্রাস পায়। অপরদিকে একই গ্রুপে উপর থেকে নিচে নামলে প্রতি ধাপে নতুন শক্তিস্তর যুক্ত হওয়ায় পরমাণুর আকার বৃদ্ধি পায়।
- আয়নিকরণ শক্তির ব্যতিক্রম (হট টপিক): সাধারণ নিয়মে একই পর্যায়ে বাম থেকে ডানে আয়নিকরণ শক্তি বাড়ে। কিন্তু বেরিলিয়াম ($_{4} ext{Be}$) ও বোরন ($_{5} ext{B}$)-এর ক্ষেত্রে বেরিলিয়ামের আয়নিকরণ শক্তি বোরনের চেয়ে বেশি হয়। কারণ Be-এর সর্ববহিস্থ অরবিটাল পূর্ণ ($2s^2$), যা অতিরিক্ত স্থিতিশীল। ফলে এখান থেকে ইলেকট্রন সরাতে বেশি শক্তি লাগে। একইভাবে নাইট্রোজেন ($_{7} ext{N}$)-এর বহিস্থ p-অরবিটাল অর্ধপূর্ণ ($2p^3$) হওয়ায় তা অক্সিজেনের ($_{8} ext{O} = 2p^4$) চেয়ে বেশি স্থিতিশীল এবং নাইট্রোজেনের আয়নিকরণ শক্তি বেশি হয়।
৩. পর্যায় সারণির আলোচিত ত্রুটি ও ব্যতিক্রমসমূহ
অনুধাবনমূলক প্রশ্নে নিচের দুটি প্রশ্ন প্রায় নিশ্চিতভাবে আসে:
- হাইড্রোজেনের অবস্থান বিতর্কিত কেন: হাইড্রোজেনের বহিস্থ স্তরে ১টি ইলেকট্রন থাকায় এটি গ্রুপ-১ এর ক্ষার ধাতুর মতো আচরণ করে এবং ইলেকট্রন ত্যাগ করে ক্যাটায়ন ($H^+$) গঠন করে। আবার হ্যালোজেন মৌলগুলোর (গ্রুপ-১৭) মতো এটিও ১টি ইলেকট্রন গ্রহণ করে অ্যানায়ন ($H^-$) গঠন করতে পারে এবং এটিও দ্বি-পরমাণুক গ্যাস ($H_2$)। উভয় দলের সাথে মিল থাকায় হাইড্রোজেনের অবস্থান আজও বিতর্কিত।
- হিলিয়ামকে গ্রুপ-২ এ না রেখে ১৮ তে রাখার কারণ: হিলিয়ামের ইলেকট্রন বিন্যাস $1s^2$ হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী এটি গ্রুপ-২ (মৃৎক্ষার ধাতু)-এ যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হিলিয়াম একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস এবং এর সর্ববহিস্থ স্তর ইলেকট্রন দ্বারা সম্পূর্ণ পূর্ণ ও স্থিতিশীল। এটি রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় হওয়ায় অন্যান্য নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলোর সাথে গ্রুপ-১৮ তেই একে স্থান দেওয়া হয়েছে।
৪. পরীক্ষার খাতায় ছাত্রছাত্রীদের সাধারণ ভুল (Common Mistakes)
বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, s ও p ব্লকের মৌলের গ্রুপ বের করার সময় ১০ যোগ করতে অনেকেই ভুলে যায়। যেমন ফসফরাসের বহিস্থ স্তরে ৫টি ইলেকট্রন দেখে গ্রুপ ৫ লিখে ফেলে, যা সম্পূর্ণ ভুল (সঠিক উত্তর গ্রুপ ১৫)। এছাড়া আয়রন বা কপারের ক্ষেত্রে d-অরবিটালের ইলেকট্রন হিসাব না করে শুধু s-অরবিটালের সংখ্যা বসিয়ে দেয়।
পর্যায় সারণি নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: হ্যালোজেন এবং চ্যালকোজেন বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: পর্যায় সারণির গ্রুপ-১৭ এর মৌলগুলোকে (F, Cl, Br, I, At) হ্যালোজেন বা 'লবণ উৎপাদক' বলা হয়। আর গ্রুপ-১৬ এর মৌলগুলোকে (O, S, Se, Te, Po) চ্যালকোজেন বা 'আকরিক উৎপাদক' বলা হয়।
প্রশ্ন: মৃৎক্ষার ধাতুগুলোর যোজনী কত?
উত্তর: গ্রুপ-২ এর মৌলগুলোকে (Be, Mg, Ca, Sr, Ba, Ra) মৃৎক্ষার ধাতু বলা হয় এবং এদের সর্ববহিস্থ স্তরে ২টি ইলেকট্রন থাকায় এদের যোজনী সবসময় ২ হয়।
Post a Comment