বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবার, জ্যেষ্ঠ নাগরিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা এবং নারীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ, ঝুঁকিহীন এবং আকর্ষণীয় সরকারি বিনিয়োগ মাধ্যম হলো জাতীয় সঞ্চয়পত্র (National Savings Certificates)। শেয়ার বাজার বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ খাতের তুলনায় সরকারি গ্যারান্টি এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর নিশ্চিত মুনাফা পাওয়ার কারণে সঞ্চয়পত্রের চাহিদা সাধারণ মানুষের কাছে বরাবরের মতোই শীর্ষে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে স্ল্যাবভিত্তিক মুনাফার হার (Tier-based Profit Slabs), জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সাথে স্বয়ংক্রিয় টিআইএন (e-TIN) লিঙ্কিং এবং উৎসে কর কর্তনের (Tax Deducted at Source - TDS) নিয়মে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। ২০২৬ সালের হালনাগাদ সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোন সঞ্চয়পত্রে কত মুনাফা পাওয়া যাবে, ট্যাক্স কত কাটা হবে এবং কীভাবে আবেদন করবেন—তার একটি বিশদ গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো:
১. জনপ্রিয় সঞ্চয়পত্রসমূহের হালনাগাদ স্ল্যাবভিত্তিক মুনাফার হার ২০২৬
বর্তমানে মোট বিনিয়োগের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে তিনটি ধাপে বা স্ল্যাবে মুনাফা প্রদান করা হয় (১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সর্বোচ্চ এবং এর বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার কিছুটা কমে):
| সঞ্চয়পত্রের নাম ও মেয়াদ | প্রথম স্ল্যাব (১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত) | দ্বিতীয় স্ল্যাব (১৫ লাখ ১ টাকা থেকে ৩০ লাখ) | তৃতীয় স্ল্যাব (৩০ লাখ ১ টাকার বেশি) |
|---|---|---|---|
| পরিবার সঞ্চয়পত্র (৫ বছর মেয়াদী - মাসিক মুনাফা) | ১১.৫২% | ১০.৫০% | ৯.৫০% |
| ৫ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র | ১১.২৮% | ১০.২০% | ৯.২০% |
| ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র (৩ বছর মেয়াদী) | ১১.০৪% | ১০.০০% | ৯.০০% |
| পেনশনার সঞ্চয়পত্র (৫ বছর মেয়াদী - ৩ মাস অন্তর মুনাফা) | ১১.৭৬% | ১০.৭৫% | ৯.৭৫% |
নোট: পরিবার সঞ্চয়পত্র শুধুমাত্র ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশি নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী যেকোনো পুরুষ নাগরিক কিনতে পারবেন। পেনশনার সঞ্চয়পত্র অবসরপ্রাপ্ত সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সংরক্ষিত।
২. সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় উৎসে কর (TDS) কর্তনের নিয়ম
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) আয়কর আইন অনুযায়ী সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে ব্যাংক বা সঞ্চয় অফিস স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্যাক্স কেটে রেখে অবশিষ্ট টাকা গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেয়:
- ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে: মুনাফার ওপর মাত্র ৫% উৎসে কর কর্তন করা হয়।
- ৫ লাখ ১ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে: মোট মুনাফার ওপর ১০% উৎসে কর কর্তন করা হয়।
- উদাহরণ হিসাব: আপনি যদি পরিবার সঞ্চয়পত্রে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন, তবে প্রতি মাসে ১১.৫২% হারে মূল মুনাফা আসে প্রায় ৯,৬০০ টাকা। সেখান থেকে ১০% কর (৯৬০ টাকা) কর্তন করে প্রতি মাসে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে ৮,৬৪০ টাকা।
৩. সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের সর্বোচ্চ বিনিয়োগ সীমা (Investment Limit)
কালো টাকা প্রতিরোধ এবং প্রকৃত সঞ্চয়ীদের সুবিধা দিতে সরকার সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের একক ও যৌথ ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে:
- পরিবার সঞ্চয়পত্র: একক নামে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা পর্যন্ত কেনা যায় (যৌথ নামে কেনা যায় না)।
- ৫ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র: একক নামে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা এবং যৌথ নামে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত কেনা যায়।
- ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র: একক নামে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ এবং যৌথ নামে ৬০ লাখ টাকা।
- সম্মিলিত সীমা: একজন ব্যক্তি সব ধরণের সঞ্চয়পত্র মিলিয়ে একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা এবং যৌথ মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারেন।
৪. সঞ্চয়পত্র কিনতে কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন?
- আবেদনকারী এবং নমিনির প্রত্যেকের মূল জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) স্পষ্ট ফটোকপি।
- আবেদনকারীর ২ কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি এবং নমিনির ২ কপি ছবি (আবেদনকারী কর্তৃক সত্যায়িত)।
- আবেদনকারীর ই-টিআইএন (e-TIN) সার্টিফিকেট এবং সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (Proof of Submission of Return - PSR)। ২ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে রিটার্ন স্লিপ বাধ্যতামূলক।
- আবেদনকারীর নিজস্ব এমআইসিআর (MICR) চেক বইয়ের একটি পাতা বা ব্যাংকের চেকের কপি (যে অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসের মুনাফা ও মূল টাকা EFT-এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হবে)।
৫. বিনিয়োগকারীরা যেখানে সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন (Common Mistakes)
বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেকেই জরুরি প্রয়োজনে সঞ্চয়পত্রের ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই তা ব্যাংক থেকে ভাঙিয়ে ফেলেন। মনে রাখবেন, সঞ্চয়পত্র ১ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে ভাঙালে কোনো মুনাফাই পাওয়া যায় না, উপরন্তু পূর্বের দেওয়া মুনাফা মূল টাকা থেকে কেটে নেওয়া হয়। আবার ২য়, ৩য় বা ৪র্থ বছরে ভাঙালে পূর্ণ মুনাফার বদলে অনেক কম হারে (যেমন পরিবার সঞ্চয়পত্রে যথাক্রমে ৯.৫০%, ১০.০০%, ১০.৫০%) মুনাফা সমন্বয় করা হয়। তাই এমন টাকা সঞ্চয়পত্রে রাখা উচিত যা অন্তত আগামী ৩ থেকে ৫ বছর আপনার দৈনন্দিন খরচে কাজে লাগবে না।
জাতীয় সঞ্চয়পত্র নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: সঞ্চয়পত্র কোথা থেকে কেনা যায়?
উত্তর: বাংলাদেশ ব্যাংকের যেকোনো শাখা অফিস, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীন সঞ্চয় ব্যুরো অফিস, যেকোনো তফসিলি ব্যাংক (যেমন: সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, ব্র্যাক, সিটি ইত্যাদি) এবং প্রধান ডাকঘরগুলো থেকে সরাসরি সঞ্চয়পত্র কেনা যায়।
প্রশ্ন: প্রবাসীরা কি সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন?
উত্তর: হ্যাঁ, প্রবাসীদের জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষিত ৩টি ইউএস ডলার সঞ্চয়পত্র রয়েছে: ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড এবং ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড। এগুলো বৈধ পথে পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা যায়।
Post a Comment