এইচএসসি পদার্থবিজ্ঞান ২য় পত্র: ৩য় অধ্যায় 'চল তড়িৎ' কার্শফের সূত্র, হুইটস্টোন ব্রিজ, শান্ট ও সৃজনশীল বোর্ড সমাধান ২০২৬

HSC Physics 2nd Paper Chapter 3 Current Electricity Kirchhoff Law Wheatstone Bridge Board Solution 2026

উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান ২য় পত্রে এ প্লাস (A+) সুনিশ্চিত করার জন্য যে কয়েকটি অধ্যায় শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের সুযোগ তৈরি করে, তার শীর্ষে রয়েছে ৩য় অধ্যায় 'চল তড়িৎ' (Current Electricity)। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, দিনাজপুরসহ সকল শিক্ষা বোর্ডের বিগত ৫ থেকে ৭ বছরের প্রশ্নপত্র গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বোর্ড পরীক্ষার লিখিত 'ক' বিভাগ থেকে এই একটি একক অধ্যায় থেকেই অবধারিতভাবে অন্তত ১টি এবং অধিকাংশ বছর ২টি পূর্ণাঙ্গ সৃজনশীল প্রশ্ন (১০ থেকে ২০ নম্বর) সরাসরি কমন থাকে। তাছাড়া বহুনির্বাচনি (MCQ) অংশে ৪ থেকে ৬টি প্রশ্ন থাকে এই অধ্যায় থেকেই। ইঞ্জিনিয়ারিং (BUET, CKET) ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাতেও চল তড়িৎ অধ্যায়ের সার্কিট প্রবলেম সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রশ্নভাণ্ডার।

অধ্যায়টি শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় হওয়ার মূল কারণ—এখানে মুখস্থনির্ভর জটিল তত্ত্বের চেয়ে লজিক্যাল সার্কিট সমাধান এবং সুনির্দিষ্ট গাণিতিক সূত্রের প্রয়োগই মুখ্য। তবে পরীক্ষার হলে সামান্য সাইন কনভেনশন বা প্লাস-মাইনাস চিহ্নের ভুলে কার্শফের লুপ অ্যানালাইসিস ভুল হয়ে পুরো ৪ নম্বর হাতছাড়া হতে পারে। ২০২৬ সালের হালনাগাদ বোর্ড সিলেবাস ও প্রশ্ন প্যাটার্ন অনুসারে এই অধ্যায়ের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্ট, ওহমের সূত্র থেকে শুরু করে কার্শফের সূত্রাবলী, হুইটস্টোন ব্রিজ নীতি, শান্টের ক্ষমতা ও একটি স্ট্যান্ডার্ড বোর্ড সৃজনশীল প্রশ্নের পুঙ্খানুপুঙ্খ গাণিতিক ব্যাখ্যা নিচে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা হলো:

১. তড়িৎ প্রবাহ, অনুগমন বেগ ও রোধের উষ্ণতা সহগ

তড়িৎবিজ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি গড়ে ওঠে আধানের গতিশীলতার ওপর। পরিবাহীর যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে একক সময়ে যে পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয়, তাকে তড়িৎ প্রবাহ (Electric Current, $I$) বলে। অর্থাৎ $I = \frac{Q}{t}$।

অনুগমন বেগ (Drift Velocity) ও প্রবাহ ঘনত্ব (Current Density):

পরিবাহীতে বিদ্যুৎ প্রবাহের সময় মুক্ত ইলেকট্রনগুলো যে গড় সুষম বেগ নিয়ে উচ্চ বিভব প্রান্তের দিকে অগ্রসর হয়, তাকে অনুগমন বেগ ($v_d$) বলে।

  • অনুগমন বেগ ও প্রবাহের সম্পর্ক: I = n A e v_d
  • যেখানে, $n$ = একক আয়তনে মুক্ত ইলেকট্রন সংখ্যা, $A$ = প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল, $e$ = ইলেকট্রনের আধান ($1.6 \times 10^{-19}\,\text{C}$)।
  • প্রবাহ ঘনত্ব ($J$): পরিবাহীর একক প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কারেন্টকে প্রবাহ ঘনত্ব বলে। J = \frac{I}{A} = n e v_d = \sigma E (যেখানে $\sigma$ পরিবাহিতাঙ্ক এবং $E$ তড়িৎ প্রাবল্য)।

রোধের উষ্ণতা সহগ (Temperature Coefficient of Resistance, $\alpha$): $0^\circ\text{C}$ তাপমাত্রার $1\,\Omega$ রোধের কোনো পরিবাহীর তাপমাত্রা প্রতি $1^\circ\text{C}$ বা $1\,\text{K}$ বৃদ্ধির জন্য যে পরিমাণ রোধ বৃদ্ধি পায়, তাকে ঐ উপাদানের রোধের উষ্ণতা সহগ বলে।

সমীকরণ: \alpha = \frac{R_\theta - R_0}{R_0 \cdot \theta} (একক: $^{\circ}\text{C}^{-1}$ বা $\text{K}^{-1}$)। ধাতব পরিবাহীর তাপমাত্রা বাড়ালে রোধ বাড়ে (ধনাত্মক $\alpha$), কিন্তু অর্ধপরিবাহীর (যেমন সিলিকন, জার্মেনিয়াম) তাপমাত্রা বাড়ালে রোধ কমে (ঋণাত্মক $\alpha$)।

২. কার্শফের সূত্রাবলী (Kirchhoff's Laws): চার্জ ও শক্তির সংরক্ষণশীলতা

জটিল বৈদ্যুতিক বর্তনী যেখানে ওহমের সূত্র সরাসরি প্রয়োগ করে সহজে সমাধান করা যায় না, সেখানে কার্শফের দুটি সূত্র বর্তনীর প্রাণভোমরা হিসেবে কাজ করে:

সূত্র বিবৃতি গাণিতিক রূপ সংরক্ষণশীলতা নীতি
১ম সূত্র (KCL - জংশন উপপাদ্য) তড়িৎ বর্তনীর যেকোনো সংযোগ বিন্দুতে (Junction) মিলিত প্রবাহমাত্রাসমূহের বীজগাণিতিক যোগফল শূন্য। সংযোগ বিন্দুমুখী প্রবাহকে ধনাত্মক (+) এবং বহির্মুখী প্রবাহকে ঋণাত্মক (-) ধরা হয়। \sum I = 0
(প্রবেশকারী কারেন্ট = নির্গমনকারী কারেন্ট)
চার্জের সংরক্ষণশীলতা নীতি (Conservation of Charge)
২য় সূত্র (KVL - লুপ উপপাদ্য) যেকোনো আবদ্ধ বর্তনী বা লুপের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন অংশের রোধ এবং তাদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কারেন্টের গুণফলের বীজগাণিতিক যোগফল ঐ লুপের অন্তর্ভুক্ত মোট তড়িৎচালক শক্তির সমান। \sum E = \sum IR
বা \sum \Delta V = 0
শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি (Conservation of Energy)

লুপ অ্যানালাইসিসের নির্ভুল চিহ্নরীতি (Sign Convention Shortcut):

  1. লুপে যেকোনো একমুখী কাল্পনিক ঘূর্ণন (ঘড়ির কাঁটার দিকে বা বিপরীত দিকে) ধরে নাও।
  2. রোধের ক্ষেত্রে ($IR$): লুপের নির্দেশিত দিক আর কারেন্টের প্রবাহের দিক একই হলে $IR$ ড্রপকে -IR (বা সমীকরণের অপর পাশে +IR) ধরবে। আর লুপের দিক কারেন্টের বিপরীত হলে +IR হবে।
  3. ব্যাটারির ক্ষেত্রে ($E$): লুপের যাত্রাপথে ব্যাটারির নেগেটিভ (-) প্রান্ত থেকে পজিটিভ (+) প্রান্তে প্রবেশ করলে বিভব বৃদ্ধি পায়, তাই +E; আর পজিটিভ থেকে নেগেটিভে গেলে বিভব হ্রাস পায়, তাই -E।

৩. হুইটস্টোন ব্রিজ নীতি (Wheatstone Bridge Principle)

ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার চার্লস হুইটস্টোন চারটি রোধকে পরপর শ্রেণীবদ্ধভাবে যুক্ত করে যে চতুর্ভুজাকার বদ্ধ বর্তনী তৈরি করেন, তার একটি কর্ণে গ্যালভানোমিটার এবং অপর কর্ণে বিদ্যুৎ উৎস বা কোষ যুক্ত করলে তাকে হুইটস্টোন ব্রিজ বলে।

ব্রিজের চারটি বাহুর রোধকে যথাক্রমে $P$ (১ম বাহু), $Q$ (২য় বাহু), $R$ (৩য় বাহু) এবং $S$ (৪র্থ বাহু) দ্বারা চিহ্নিত করা হয়।

সাম্যাবস্থার শর্ত (Null Condition):

যখন গ্যালভানোমিটারের দুই প্রান্তের বিভব সমান হয় ($V_B = V_D$), তখন গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে কোনো কারেন্ট প্রবাহিত হয় না ($I_g = 0$)। একে ব্রিজের সাম্যাবস্থা বা নিস্পন্দ অবস্থা বলে।

\frac{P}{Q} = \frac{R}{S}

বোর্ড সৃজনশীল স্পেশাল ট্রিক: পরীক্ষায় প্রায়ই উদ্দীপকে $P, Q, R, S$ দেওয়া থাকে এবং দেখা যায় $\frac{P}{Q} \neq \frac{R}{S}$। প্রশ্ন করা হয়: "৪র্থ বাহুতে কত রোধ কীভাবে যুক্ত করলে ব্রিজটি সাম্যাবস্থায় আসবে?"

  • প্রথমে সাম্যাবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় আদর্শ রোধ $S'$ বের করবে: S' = \frac{Q}{P} \cdot R
  • যদি বর্তমান রোধ $S < S'$ হয়, তবে রোধ বাড়াতে হবে। আর রোধ বাড়াতে হলে শ্রেণীতে অতিরিক্ত রোধ যুক্ত করতে হয়: R_{\text{extra}} = S' - S।
  • যদি বর্তমান রোধ $S > S'$ হয়, তবে রোধ কমাতে হবে। আর রোধ কমাতে হলে সমান্তরালে অতিরিক্ত রোধ ($r_p$) যুক্ত করতে হয়: \frac{1}{S'} = \frac{1}{S} + \frac{1}{r_p} \implies r_p = \frac{S \cdot S'}{S - S'}।

৪. শান্ট (Shunt) ও গ্যালভানোমিটারের পাল্লা বৃদ্ধি

গ্যালভানোমিটার একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল যন্ত্র। এর মধ্য দিয়ে বেশি পরিমাণ কারেন্ট প্রবাহিত হলে অতিরিক্ত তাপে এর কয়েল পুড়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। গ্যালভানোমিটারকে উচ্চ প্রবাহ থেকে রক্ষা করতে এর সাথে সমান্তরালে যে ক্ষুদ্র মানের রোধ যুক্ত করা হয়, তাকে শান্ট (Shunt) বলে।

শান্টের সূত্রাবলী ও প্রবাহ বন্টন:

  • মূল প্রবাহ $I$, গ্যালভানোমিটার রোধ $G$ এবং শান্ট রোধ $S$ হলে:
  • গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে প্রবাহ: I_g = \frac{S}{G + S} \cdot I
  • শান্টের মধ্য দিয়ে প্রবাহ: I_s = \frac{G}{G + S} \cdot I
  • শান্টের গুণক বা ক্ষমতা ($n$): মূল প্রবাহ গ্যালভানোমিটার প্রবাহের যত গুণ ($n = \frac{I}{I_g}$), তাকে শান্টের ক্ষমতা বলে। n = 1 + \frac{G}{S} \implies S = \frac{G}{n - 1}।
  • অ্যামিটারের পাল্লা $n$ গুণ বৃদ্ধি করতে: সমান্তরালে শান্ট S = \frac{R_A}{n - 1} যুক্ত করতে হয়।
  • ভোল্টমিটারের পাল্লা $n$ গুণ বৃদ্ধি করতে: শ্রেণীতে উচ্চমানের রোধ R = (n - 1) R_V যুক্ত করতে হয়।

৫. কোষের সমবায় ও অভ্যন্তরীণ রোধের বিশ্লেষণ

তড়িৎ কোষের ভেতরে অ্যাসিড বা রাসায়নিক উপাদানের মধ্য দিয়ে কারেন্ট চলাচলের সময় যে বাধার সৃষ্টি হয়, তাকে কোষের অভ্যন্তরীণ রোধ (Internal Resistance, $r$) বলে। এর ফলে বর্তনীতে কিছু বিভব নষ্ট হয়, যাকে হারানো বিভব বা নষ্ট ভোল্ট (Lost Volt, $v = Ir$) বলে। প্রান্তীয় বিভবান্তর V = E - Ir।

কোষের সমবায় প্রবাহমাত্রা সমীকরণ কখন সর্বোচ্চ কারেন্ট পাওয়া যায়?
শ্রেণী সমবায় (Series) ($n$ টি কোষ) I = \frac{nE}{R + nr} যখন বহিঃরোধ অভ্যন্তরীণ রোধের তুলনায় অনেক বড় ($R \gg nr$)। তখন $I \approx \frac{nE}{R}$।
সমান্তরাল সমবায় (Parallel) ($m$ টি কোষ) I = \frac{E}{R + \frac{r}{m}} = \frac{mE}{mR + r} যখন অভ্যন্তরীণ রোধ বহিঃরোধের তুলনায় অনেক বড় ($r \gg mR$)। তখন $I \approx \frac{mE}{r}$।
মিশ্র সমবায় (Mixed) ($m$ সারিতে প্রতিটিতে $n$ টি কোষ) I = \frac{mnE}{mR + nr} যখন বহিঃরোধ মোট অভ্যন্তরীণ রোধের সমান হয়, অর্থাৎ R = \frac{nr}{m}।

৬. পূর্ণাঙ্গ বোর্ড স্ট্যান্ডার্ড সৃজনশীল প্রশ্ন ও নির্ভুল গাণিতিক সমাধান

নিচে ঢাকা বোর্ড ও শীর্ষ কলেজের টেস্ট পরীক্ষার আলোকে একটি আদর্শ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সৃজনশীল প্রশ্ন সমাধানসহ দেওয়া হলো:

[উদ্দীপক]:

একটি হুইটস্টোন ব্রিজের চার বাহুতে যথাক্রমে $P = 6\,\Omega$, $Q = 12\,\Omega$, $R = 8\,\Omega$ এবং $S = 20\,\Omega$ রোধ যুক্ত আছে। ব্রিজের সাথে $12\,\text{V}$ তড়িৎ চালক শক্তি ও $1\,\Omega$ অভ্যন্তরীণ রোধের একটি বিদ্যুৎ উৎস যুক্ত করা হলো। ব্রিজের অপর কর্ণে $50\,\Omega$ রোধের একটি গ্যালভানোমিটার এবং একটি চাবি $K$ যুক্ত আছে।

(ক) অনুগমন বেগ কাকে বলে? [১]

(খ) "কার্শফের দ্বিতীয় সূত্রটি শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি সমর্থন করে"—ব্যাখ্যা কর। [২]

(গ) উদ্দীপকের বর্তনীতে গ্যালভানোমিটারের চাবি $K$ খোলা অবস্থায় ব্যাটারি থেকে মোট কত তড়িৎ প্রবাহিত হবে তা নির্ণয় কর। [৩]

(ঘ) উদ্দীপকের ব্রিজের ৪র্থ বাহুতে কত মানের রোধ কীভাবে সংযুক্ত করলে ব্রিজটি সাম্যাবস্থায় আসবে এবং তখন গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে কোনো বিদ্যুৎ প্রবাহিত হবে কি না? গাণিতিক বিশ্লেষণপূর্বক মতামত দাও। [৪]

সৃজনশীল প্রশ্নের সম্পূর্ণ আদর্শ উত্তর:

(ক) জ্ঞানমূলক উত্তর:
পরিবাহীর দুই প্রান্তে বিভব পার্থক্য প্রয়োগ করা হলে এর মধ্যকার মুক্ত ইলেকট্রনসমূহ উচ্চ বিভব প্রান্তের দিকে যে গড় বেগ নিয়ে প্রবাহিত হয়, তাকে অনুগমন বেগ বলে।

(খ) অনুধাবনমূলক উত্তর:
কার্শফের দ্বিতীয় সূত্র বা ভোল্টেজ সূত্র (KVL) অনুসারে, একটি আবদ্ধ বর্তনীতে কোনো বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করে সম্পূর্ণ লুপটি একবার ঘুরে আবার পূর্বের বিন্দুতে ফিরে আসলে মোট বিভব পরিবর্তনের বীজগাণিতিক যোগফল শূন্য হয় ($\sum \Delta V = 0$)।
বিভব পরিবর্তনের অর্থ হলো একক ধনাত্মক আধানকে বর্তনীতে স্থানান্তরের কৃতকাজ। যেহেতু তড়িৎ ক্ষেত্র একটি সংরক্ষণশীল বলক্ষেত্র, তাই কোনো আবদ্ধ পথে একটি আধানকে পূর্ণ আবর্তন করিয়ে পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে মোট কৃতকাজ শূন্য হয়। এখানে ব্যাটারি যে পরিমাণ রাসায়নিক শক্তি আধানকে সরবরাহ করে, রোধের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় ঠিক সেই পরিমাণ শক্তিই তাপে রূপান্তরিত হয়। কোনো অতিরিক্ত শক্তি সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না। সুতরাং, কার্শফের দ্বিতীয় সূত্রটি সরাসরি শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতিকে সমর্থন করে।

(গ) প্রয়োগমূলক উত্তর:
উদ্দীপক অনুসারে, গ্যালভানোমিটারের চাবি $K$ খোলা থাকলে গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে কোনো কারেন্ট প্রবাহিত হবে না।
ফলে ১ম ও ২য় বাহু ($P$ ও $Q$) পরস্পরের সাথে শ্রেণী সমবায়ে এবং ৩য় ও ৪র্থ বাহু ($R$ ও $S$) পরস্পরের সাথে শ্রেণী সমবায়ে থাকবে। অতঃপর এই দুই শাখা পরস্পরের সাথে সমান্তরালে যুক্ত থাকবে।

১ম শাখার তুল্য রোধ: R_1 = P + Q = 6\,\Omega + 12\,\Omega = 18\,\Omega
২য় শাখার তুল্য রোধ: R_2 = R + S = 8\,\Omega + 20\,\Omega = 28\,\Omega

বর্তনীটির মোট বহিঃতুল্য রোধ ($R_p$):
\frac{1}{R_p} = \frac{1}{R_1} + \frac{1}{R_2} = \frac{1}{18} + \frac{1}{28} = \frac{14 + 9}{252} = \frac{23}{252}
\implies R_p = \frac{252}{23} \approx 10.957\,\Omega

কোষের অভ্যন্তরীণ রোধ $r = 1\,\Omega$ এবং তড়িৎ চালক শক্তি $E = 12\,\text{V}$।
সুতরাং, ব্যাটারি থেকে সরবরাহকৃত মোট তড়িৎ প্রবাহ ($I$):
I = \frac{E}{R_p + r} = \frac{12}{10.957 + 1} = \frac{12}{11.957} \approx 1.004\,\text{A}

উত্তর: চাবি খোলা অবস্থায় ব্যাটারি থেকে মোট প্রায় ১.০০৪ অ্যাম্পিয়ার (1.004 A) তড়িৎ প্রবাহিত হবে।

(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক উত্তর:
হুইটস্টোন ব্রিজের সাম্যাবস্থার শর্তানুসারে:
\frac{P}{Q} = \frac{R}{S'}

এখানে প্রদত্ত মানসমূহ:
$P = 6\,\Omega$
$Q = 12\,\Omega$
$R = 8\,\Omega$
$S = 20\,\Omega$ (বর্তমান রোধ)

ব্রিজটি সাম্যাবস্থায় পৌঁছাতে ৪র্থ বাহুর প্রয়োজনীয় আদর্শ রোধ ($S'$):
S' = \frac{Q}{P} \cdot R = \frac{12}{6} \times 8 = 2 \times 8 = 16\,\Omega

দেখা যাচ্ছে, ৪র্থ বাহুতে বর্তমানে রয়েছে $S = 20\,\Omega$, কিন্তু সাম্যাবস্থার জন্য দরকার $S' = 16\,\Omega$।
যেহেতু প্রয়োজনীয় রোধ বর্তমান রোধের চেয়ে কম ($S' < S$), তাই ৪র্থ বাহুর সাথে সমান্তরালে একটি অতিরিক্ত রোধ $r_p$ সংযুক্ত করতে হবে।

সমান্তরাল সমবায়ের সূত্রানুসারে:
\frac{1}{S'} = \frac{1}{S} + \frac{1}{r_p}
\implies \frac{1}{r_p} = \frac{1}{S'} - \frac{1}{S} = \frac{1}{16} - \frac{1}{20} = \frac{5 - 4}{80} = \frac{1}{80}
\implies r_p = 80\,\Omega

গ্যালভানোমিটারের প্রবাহ বিশ্লেষণ:
যখন ৪র্থ বাহুর সাথে $80\,\Omega$ রোধ সমান্তরালে যুক্ত করা হবে, তখন ৪র্থ বাহুর তুল্য রোধ হবে $16\,\Omega$।
ফলে বাহুগুলোর অনুপাত হবে: \frac{P}{Q} = \frac{6}{12} = \frac{1}{2} এবং \frac{R}{S'} = \frac{8}{16} = \frac{1}{2}।
যেহেতু $\frac{P}{Q} = \frac{R}{S'}$, তাই ব্রিজের $B$ ও $D$ বিন্দুর বিভব সমান হবে ($V_B = V_D$ বা $V_B - V_D = 0$)।
বিভব পার্থক্য শূন্য হওয়ায় গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে কোনো তড়িৎ প্রবাহিত হবে না ($I_g = 0$) এবং গ্যালভানোমিটার কোনো বিক্ষেপ প্রদর্শন করবে না।

সিদ্ধান্ত: ৪র্থ বাহুর সাথে $80\,\Omega$ রোধ সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত করলে ব্রিজটি সাম্যাবস্থায় পৌঁছাবে এবং গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে কোনো বিদ্যুৎ প্রবাহিত হবে না।

৭. চল তড়িৎ অধ্যায়ের সাধারণ ৫টি প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: একটি আদর্শ অ্যামিটার ও একটি আদর্শ ভোল্টমিটারের রোধ কত হওয়া উচিত?

উত্তর: একটি আদর্শ অ্যামিটারের অভ্যন্তরীণ রোধ হওয়া উচিত শূন্য ($0\,\Omega$), যাতে এটি বর্তনীতে যুক্ত করলে মূল প্রবাহে কোনো পরিবর্তন না আসে। অন্যদিকে একটি আদর্শ ভোল্টমিটারের অভ্যন্তরীণ রোধ হওয়া উচিত অসীম ($\infty$), যাতে এটি বর্তনীর শাখা থেকে কোনো বিদ্যুৎ গ্রহণ না করে সঠিক বিভব পার্থক্য পরিমাপ করতে পারে।

প্রশ্ন ২: কোষের তড়িৎ চালক শক্তি (EMF) এবং বিভব পার্থক্যের (V) মধ্যে মূল পার্থক্য কী?

উত্তর: কোষের তড়িৎ চালক শক্তি ($E$) হলো খোলা বর্তনীতে (যখন কোনো কারেন্ট প্রবাহিত হয় না) কোষের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য। আর বিভব পার্থক্য ($V$) হলো বদ্ধ বর্তনীতে বিদ্যুৎ প্রবাহ চলাকালীন দুই প্রান্তের বিভব। সবসময় $E > V$ হয়, কারণ কোষের অভ্যন্তরীণ রোধের কারণে কিছুটা বিভব অপচয় ঘটে ($E = V + Ir$)।

প্রশ্ন ৩: হুইটস্টোন ব্রিজের সাম্যাবস্থায় ব্যাটারি ও গ্যালভানোমিটারের অবস্থান অদলবদল করলে কী ঘটবে?

উত্তর: হুইটস্টোন ব্রিজের সাম্যাবস্থায় কোষ ও গ্যালভানোমিটারের স্থান বিনিময় করলে ব্রিজের সাম্যাবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। অর্থাৎ ব্রিজটি তখনও নিস্পন্দ অবস্থায় থাকবে এবং গ্যালভানোমিটারের বিক্ষেপ শূন্য হবে। একে কনজুগেট বা অনুবন্ধী বাহু বলা হয়।

প্রশ্ন ৪: পরিবাহীর তাপমাত্রা বাড়ালে রোধ বাড়ে কেন?

উত্তর: তাপমাত্রা বৃদ্ধি করলে পরিবাহীর অভ্যন্তরে থাকা পরমাণু ও ধনাত্মক আয়নগুলির কম্পন বৃদ্ধি পায়। ফলে মুক্ত ইলেকট্রনগুলো চলার সময় আয়নগুলির সাথে অধিক ঘন ঘন সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই সংঘর্ষের মাত্রা বৃদ্ধির কারণেই পরিবাহীর রোধ বৃদ্ধি পায়।

প্রশ্ন ৫: কার্শফের সূত্রে কারেন্টের দিক ভুল ধরলে কি পুরো অংক কাটা যাবে?

উত্তর: না, একদমই না। তুমি প্রাথমিক সমীকরণে কারেন্টের যে কোনো দিক ধরে নিতে পারো। যদি গণনা শেষে কারেন্টের মান ধনাত্মক (+) আসে, তবে তোমার ধরে নেওয়া দিক সঠিক ছিল। আর যদি মান ঋণাত্মক (-) আসে, তবে বুঝতে হবে কারেন্ট বাস্তবে তার বিপরীত দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। উত্তরের মান একই থাকবে, শুধু বিপরীত দিক উল্লেখ করে দিলেই পূর্ণ নম্বর পাওয়া যাবে।

Post a Comment

Previous Post Next Post