আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, বিদেশে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা পবিত্র ওমরাহ পালনের জন্য প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল পরিচয়পত্র হলো ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট বা ই-পাসপোর্ট (e-Passport)। আধুনিক নিরাপত্তা চিপ ও বায়োমেট্রিক ডেটা সংবলিত বাংলাদেশের ই-পাসপোর্ট বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য ডকুমেন্ট। তবে পাসপোর্ট আবেদনের প্রক্রিয়ায় অনেকেই অনলাইন আবেদন ফরম পূরণ, জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) সাথে তথ্যের অমিল, এ-চালান (A-Challan) বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ফি পরিশোধ এবং বিশেষ করে এসবি (Special Branch) পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ও বিড়ম্বনায় পড়েন। দালালের খপ্পরে না পড়ে কীভাবে ঘরে বসে নিজের স্মার্টফোন বা কম্পিউটার দিয়ে নির্ভুলভাবে ই-পাসপোর্টের আবেদন করবেন এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন দ্রুত নিষ্পত্তি করবেন—তার একটি বিশদ প্র্যাকটিক্যাল গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ই-পাসপোর্টের সরকারি ফি কাঠামো ও পৃষ্ঠার ধরন (২০২৬)
বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৮ পৃষ্ঠা এবং ৬৪ পৃষ্ঠার ই-পাসপোর্ট ৫ বছর ও ১০ বছর মেয়াদের জন্য ইস্যু করা হয়। সরকারি ফি এর সাথে ১৫% ভ্যাট (VAT) যুক্ত থাকে:
| পাসপোর্টের ধরন ও পৃষ্ঠা | মেয়াদ | সাধারণ ডেলিভারি (১৫ কর্মদিবস) | জরুরি বা এক্সপ্রেস (৭ কর্মদিবস) | সুপার এক্সপ্রেস (২ কর্মদিবস) |
|---|---|---|---|---|
| ৪৮ পৃষ্ঠা | ৫ বছর | ৪,০২৫ টাকা | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা |
| ৪৮ পৃষ্ঠা | ১০ বছর | ৫,৭৫০ টাকা | ৮,০৫০ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা |
| ৬৪ পৃষ্ঠা | ৫ বছর | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা | ১২,০৭৫ টাকা |
| ৬৪ পৃষ্ঠা | ১০ বছর | ৮,০৫০ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা | ১৩,৮০০ টাকা |
নোট: ১৮ বছরের কম এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও চেহারার পরিবর্তনের কারণে সাধারণত ৫ বছর মেয়াদী ৪৮ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট প্রদান করা হয়।
২. অনলাইনে ধাপে ধাপে আবেদন ফরম পূরণের সঠিক নিয়ম
- প্রথমে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অফিশিয়াল পোর্টাল
epassport.gov.bd-এ প্রবেশ করুন। - 'Apply Online for e-Passport'-এ ক্লিক করে আপনার বর্তমান ঠিকানা অনুযায়ী জেলা ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ থানা (Police Station) নির্বাচন করুন। সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার জন্য নির্ধারিত আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস (RPO) নির্ধারণ করবে।
- একটি সক্রিয় ইমেইল অ্যাড্রেস ও মোবাইল নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন এবং ইমেইলে আসা অ্যাক্টিভেশন লিংকে ক্লিক করে অ্যাকাউন্ট ভেরিফাই করুন।
- ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ: আপনার নাম, পিতা-মাতার নাম, পেশা এবং বৈবাহিক অবস্থা হুবহু আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) সাথে মিলিয়ে ইংরেজি ক্যাপিটাল অক্ষরে টাইপ করুন। ২০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী নাগরিকদের জন্য এনআইডি বাধ্যতামূলক; ১৮ বছরের কম হলে অনলাইন ১৭ ডিজিটের জন্মনিবন্ধন সনদ (BRC) ব্যবহার করতে হবে।
- পাসপোর্টের পৃষ্ঠা (৪৮ বা ৬৪) ও ডেলিভারির ধরন (Regular/Express) নির্বাচন করে ফাইনাল সাবমিট করুন। সাবমিটের পর একটি ৩ পৃষ্ঠার Application Summary পিডিএফ ফাইল ডাউনলোড করে প্রিন্ট করুন।
৩. এ-চালান (A-Challan) বা ব্যাংকে ফি পরিশোধের পদ্ধতি
অনলাইন ফর্ম পূরণ শেষে আপনি সরাসরি সরকারি ekpay গেটওয়ে দিয়ে বিকাশ, নগদ, রকেট বা ভিসা/মাস্টারকার্ডের মাধ্যমে চালানের টাকা পরিশোধ করতে পারেন। অথবা সোনালী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক বা ট্রাস্ট ব্যাংকের শাখায় গিয়ে অটোমেটেড চালান সিস্টেম (A-Challan)-এর মাধ্যমে সরাসরি ফি জমা দিতে পারেন। পেমেন্ট সম্পন্ন হলে চালানের মূল কপিটি পাসপোর্ট অফিসে জমা দেওয়ার জন্য সংরক্ষণ করতে হবে।
৪. পুলিশ ভেরিফিকেশন দ্রুত সম্পন্ন করার কৌশল
আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ, আইরিশ স্ক্যান ও ছবি) দেওয়ার ২-৩ দিনের মধ্যে ফাইলটি জেলা বা মেট্রোপলিটনের স্পেশাল ব্রাঞ্চে (SB/DSB) পাঠানো হয়। ভেরিফিকেশন অফিসার আপনাকে কল দিলে নিচের কাগজপত্রগুলো মূল ও ফটোকপিসহ রেডি রাখবেন:
- আবেদনকারীর মূল এনআইডি কার্ড এবং অনলাইন আবেদন সামারি ও ডেলিভারি স্লিপের ফটোকপি।
- স্থায়ী ঠিকানার চেয়ারম্যান/কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত হালনাগাদ নাগরিকত্ব সনদ (Citizenship Certificate)।
- স্থায়ী ঠিকানার বিদ্যুৎ বিল/গ্যাস বিলের কপি অথবা পিতা-মাতার জমির খতিয়ান বা দলিলের ফটোকপি।
- পিতা ও মাতার মূল এনআইডি কার্ডের স্পষ্ট ফটোকপি।
- শিক্ষার্থী হলে কলেজের আইডি কার্ড বা প্রশংসাপত্র; চাকরিজীবী হলে অফিসিয়াল আইডি কার্ডের কপি।
পরামর্শ: পুলিশ অফিসারকে সত্য তথ্য দিন এবং ঠিকানায় আপনার উপস্থিতির প্রমাণ উপস্থাপন করুন। পুলিশ রিপোর্ট সাধারণত ৩ থেকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে হেডকোয়ার্টারে অনলাইনে সাবমিট হয়ে যায়।
৫. আবেদনকারীরা যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল করেন (Common Mistakes)
বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেকেই পাসপোর্টের আবেদনে স্থায়ী ঠিকানার জায়গায় নিজের গ্রামের বাড়ির ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডের স্পেলিং এনআইডির সাথে গরমিল করে ফেলেন। মনে রাখবেন, পাসপোর্টের সার্ভার সরাসরি নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সার্ভারের সাথে যুক্ত। আপনার এনআইডিতে যদি নাম 'MD.' থাকে আর পাসপোর্টে যদি 'MOHAMMAD' লেখেন, তবে ম্যাচিং ফেইল করে ফাইল পেন্ডিংয়ে পড়ে থাকবে। এছাড়া বৈবাহিক অবস্থা বিবাহিত কিন্তু কাবিননামা বা স্ত্রীর এনআইডি না থাকলে পুলিশ ভেরিফিকেশনে জটিলতা তৈরি হয়। ডেলিভারি ট্র্যাকিংয়ে যদি 'Pending for SB Police Clearance' অনেকদিন আটকে থাকে, তবে স্থানীয় এসবি অফিসে যোগাযোগ করে ফাইল পুশ করাতে হবে।
ই-পাসপোর্ট নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: পাসপোর্ট ডেলিভারি স্ট্যাটাস কীভাবে ট্র্যাক করব?
উত্তর: epassport.gov.bd/authorization/application-status-এ গিয়ে আপনার ডেলিভারি স্লিপের Application ID (যেমন: OID/BARCODE) এবং জন্মতারিখ লিখে সার্চ করলেই রিয়েল-টাইম স্ট্যাটাস জানা যাবে।
প্রশ্ন: পুরনো এমআরপি (MRP) রিনিউ করে ই-পাসপোর্ট করার নিয়ম কী?
উত্তর: অনলাইনে 'Re-issue' অপশন সিলেক্ট করে পুরনো এমআরপি পাসপোর্টের নম্বর ও মেয়াদপূর্তির তারিখ দিতে হবে। রিনিউয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রয়োজন হয় না, সরাসরি দ্রুত পাসপোর্ট প্রিন্ট হয়ে যায়।
Post a Comment