ই-পাসপোর্ট আবেদন ও পুলিশ ভেরিফিকেশন ২০২৬: নতুন ফি, জরুরি পাসপোর্ট পাওয়ার উপায় ও ভুল সংশোধনের নিয়মাবলী

Bangladesh E-Passport Online Application Police Verification Fee Correction Guide 2026

উচ্চশিক্ষা, চাকুরিসূত্রে প্রবাস গমন, ওমরাহ-হজ পালন, জরুরি চিকিৎসা কিংবা নিছক বিদেশ ভ্রমণের জন্য পাসপোর্ট হলো প্রতিটি নাগরিকের সবচেয়ে মৌলিক আন্তর্জাতিক নাগরিকত্ব ও পরিচয়পত্র। বাংলাদেশে সনাতন ম্যানুয়াল ও এমআরপি (Machine Readable Passport - MRP) যুগ পেরিয়ে সম্পূর্ণ অত্যাধুনিক বায়োমেট্রিক ও চিপযুক্ত ই-পাসপোর্ট (e-Passport) ব্যবস্থা এখন শতভাগ কার্যকর। বর্তমান ই-পাসপোর্টের কভারে থাকা বিশেষ ইলেকট্রনিক চিপে নাগরিকের ১০ আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিশ স্ক্যান, ডিজিটাল রঙিন ছবি এবং নিরাপত্তা এনক্রিপশন সংরক্ষিত থাকে, ফলে যেকোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থাপিত অত্যাধুনিক ই-গেট (e-Gate) দিয়ে মাত্র ১৫ থেকে ২০ সেকেন্ডেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা যায়। সরকারের বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থার কারণে এখন কোনো দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী বা এজেন্টের কাছে না গিয়ে ঘরে বসে নিজের স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ দিয়ে অনলাইনে ফরম পূরণ করে নির্ভুলভাবে পাসপোর্ট নেওয়া সম্ভব। তবুও আবেদন ফর্মে তথ্য পূরণের অসাবধানতা, এনআইডি ও সার্টিফিকেটের নামের ছোটখাটো অমিল, কিংবা পুলিশ ভেরিফিকেশনে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে না পারার কারণে অনেকের পাসপোর্ট মাসের পর মাস ঝুলে থাকে। ২০২৬ সালের হালনাগাদ সরকারি ফি, সাধারণ বনাম এক্সপ্রেস ডেলিভারির সময়সীমা, পুলিশ ভেরিফিকেশনের সহজ সমাধান এবং কোনো প্রকার জটিলতা ছাড়া জরুরি পাসপোর্ট পাওয়ার চূড়ান্ত গাইড নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ই-পাসপোর্টের হালনাগাদ সরকারি ফি তালিকা ২০২৬ (ভ্যাট সহ)

ই-পাসপোর্টের সরকারি ফি নির্ধারিত হয় মূলত তিনটি প্যারামিটারের ওপর ভিত্তি করে—পাসপোর্টের পৃষ্ঠাসংখ্যা (৪৮ পৃষ্ঠা নাকি ৬৪ পৃষ্ঠা), মেয়াদকাল (৫ বছর নাকি ১০ বছর) এবং ডেলিভারির গতির ক্যাটাগরি (রেগুলার, এক্সপ্রেস নাকি সুপার এক্সপ্রেস)। সরকারের নির্ধারিত সকল ফি-তে ১৫% ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকে। নিচে পূর্ণাঙ্গ ফি তালিকা দেওয়া হলো:

পাসপোর্টের ধরন ও পৃষ্ঠা মেয়াদকাল নিয়মিত ডেলিভারি (Regular - ১৫-২১ কার্যদিবস) জরুরি ডেলিভারি (Express - ৭-১০ কার্যদিবস) অতীব জরুরি (Super Express - ২ কার্যদিবস)
৪৮ পৃষ্ঠা (বুকলেট) ৫ বছর মেয়াদি ৪,০২৫/- টাকা ৬,৩২৫/- টাকা ৮,৬২৫/- টাকা
৪৮ পৃষ্ঠা (বুকলেট) ১০ বছর মেয়াদি ৫,৭৫০/- টাকা ৮,০৫০/- টাকা ১০,৩৫০/- টাকা
৬৪ পৃষ্ঠা (ঘন ঘন ভ্রমণকারীদের জন্য) ৫ বছর মেয়াদি ৬,৩২৫/- টাকা ৮,৬২৫/- টাকা ১২,০৭৫/- টাকা
৬৪ পৃষ্ঠা (ঘন ঘন ভ্রমণকারীদের জন্য) ১০ বছর মেয়াদি ৮,০৫০/- টাকা ১০,৩৫০/- টাকা ১৩,৮০০/- টাকা
ফি পরিশোধের সহজ মাধ্যম: সোনালী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া অথবা অনলাইনে সরকারি 'একপে' (A-Challan / Ekpay) গেটওয়ের মাধ্যমে বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায় অথবা যেকোনো ভিসা বা মাস্টারকার্ড দিয়ে মুহূর্তেই কোনো ঝামেলা ছাড়া ফি পরিশোধ করে মূল চালান রসিদ সরাসরি ডাউনলোড ও প্রিন্ট করা যায়।

২. অনলাইনে ই-পাসপোর্ট ফরম পূরণের সহজ ও নির্ভুল ধাপসমূহ

দালালের খপ্পরে না পড়ে নিজে নিজে আবেদন করার জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো নিখুঁতভাবে অনুসরণ করুন:

  1. পাসপোর্ট পোর্টাল নির্বাচন: বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট epassport.gov.bd-এ প্রবেশ করুন।
  2. ইউজার রেজিস্ট্রেশন: আপনার সচল ব্যক্তিগত ইমেইল এবং নিজস্ব মোবাইল নম্বর দিয়ে "Apply Online"-এ ক্লিক করুন। অ্যাক্টিভেশন লিংকে ক্লিক করে অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করে নিন।
  3. বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা নির্ধারণ: মনে রাখবেন, আপনি বর্তমান যে ঠিকানায় সশরীরে অবস্থান করছেন এবং যেখানে পুলিশ ভেরিফিকেশন করাতে চান, সেটি বর্তমান ঠিকানা হিসেবে নির্বাচন করুন। বর্তমান ঠিকানার পুলিশ স্টেশন অনুসারেই আপনার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস (RPO) সিস্টেম দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হবে। স্থায়ী ঠিকানার সাথে বর্তমান ঠিকানা ভিন্ন হলেও কোনো আইনি সমস্যা নেই।
  4. ব্যক্তিগত তথ্যের শতভাগ সামঞ্জস্য: প্রার্থীর নাম, পিতার নাম, মাতার নাম এবং জন্মতারিখ ১০০% আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা অনলাইন ডিজিটাল ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন সনদ (BRC) অনুযায়ী টাইপ করুন। বাংলায় বা ইংরেজিতে একটি অক্ষরের অমিলও যেন না থাকে।
  5. পেশা ও বৈবাহিক অবস্থা: শিক্ষার্থী, বেসরকারি চাকুরিজীবী বা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে প্রমাণক ডকুমেন্টস সাথে রাখতে হবে। সরকারি চাকুরিজীবী হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানের স্বাক্ষরিত মূল অনাপত্তি সনদ (NOC) অথবা সরকারি আদেশ (GO) স্ক্যান কপি অনলাইনে আপলোড ও হার্ডকপি সঙ্গে নিতে হবে। বিবাহিত হলে স্পাউসের নাম ও এনআইডি নম্বর বাধ্যতামূলক।
  6. পৃষ্ঠা ও ডেলিভারি সিলেক্ট ও পেমেন্ট: আপনার চাহিদা অনুযায়ী ৪৮ বা ৬৪ পৃষ্ঠা এবং ৫ বা ১০ বছর মেয়াদ নির্বাচন করুন। এরপর অনলাইন পেমেন্ট সম্পন্ন করে Application Summary এবং Payment Slip / Challan ডাউনলোড করে প্রিন্ট নিন।
  7. অ্যাপয়েন্টমেন্ট গ্রহণ: আবেদন সাবমিটের পর আপনার সুবিধাজনক কার্যদিবসে পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার জন্য বায়োমেট্রিক অ্যাপয়েন্টমেন্ট তারিখ নির্বাচন করুন।

৩. পুলিশ ভেরিফিকেশন (Police Verification) প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস চেকলিস্ট

নতুন পাসপোর্টের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন একটি অতীব সংবেদনশীল পর্ব। আবেদনপত্র পাসপোর্ট অফিসে জমা দেওয়ার ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে আপনার বর্তমান ঠিকানার দায়িত্বপ্রাপ্ত এসবি (Special Branch) বা জেলার ডিএসবি (District Special Branch) কর্মকর্তা আপনাকে ফোন করবেন। ভেরিফিকেশনের দিন নিচের কাগজপত্রগুলোর মূল কপি প্রদর্শন এবং এক সেট সত্যায়িত ফটোকপি প্রদান করতে হবে:

ক্রমিক প্রয়োজনীয় দলিলের বিবরণ কার জন্য প্রযোজ্য
প্রার্থীর মূল জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ (১৭ ডিজিট) সকল প্রার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক
পৌরসভার মেয়র, কাউন্সিলর বা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত মূল নাগরিকত্ব সনদ সকল প্রার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক
বর্তমান ঠিকানার সপক্ষে গ্যাস, পানি বা বিদ্যুৎ বিলের কপি অথবা বাড়িভাড়ার চুক্তিনামা ঠিকানার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য
পিতা ও মাতার মূল জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) স্পষ্ট ফটোকপি সকল প্রার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক
সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট অথবা বর্তমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ড ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক
অফিসের পরিচয়পত্র ও পে-স্লিপ / ট্রেড লাইসেন্স ও টিন সার্টিফিকেট চাকুরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের জন্য
বিবাহিতদের ক্ষেত্রে মুসলিম নিকাহনামা / ম্যারেজ সার্টিফিকেট বিবাহিত প্রার্থীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য
পুলিশ ভেরিফিকেশন দ্রুত করানোর বাস্তব টিপস: পুলিশ অফিসারের সাথে কথা বলার সময় ভদ্র ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ বজায় রাখুন। ঠিকানা নিয়ে কোনো সন্দেহ তৈরি হলে বাড়িওয়ালার প্রত্যয়নপত্র বা প্রতিবেশীর পরিচিতি কাজে দেয়। আপনার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধের মামলা বা ওয়ারেন্ট না থাকলে পুলিশ কর্মকর্তা দ্রুত ইতিবাচক (Positive) প্রতিবেদন সদর এসবি হয়ে পাসপোর্ট সার্ভারে পাঠিয়ে দেন।

৪. এনআইডি বনাম পাসপোর্টের গরমিল: ভুল সংশোধনের সরকারি নিয়ম

অনেকেরই পুরোনো এমআরপি পাসপোর্ট বা সনাতন নথির সাথে জাতীয় পরিচয়পত্রের নামের বানান বা জন্মতারিখের গরমিল থাকে। সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিপত্র অনুযায়ী:

  • এনআইডি চূড়ান্ত ভিত্তি: পাসপোর্ট সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্রকে (NID) চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে। আপনার এনআইডিতে যে তথ্য রয়েছে, পাসপোর্ট অফিস অবিকল সেই তথ্য দিয়েই পাসপোর্ট প্রিন্ট করতে বাধ্য।
  • রি-ইস্যু বা সংশোধনের নিয়ম: যাদের পুরোনো পাসপোর্টে ভুল রয়েছে, তারা অনলাইনে "Re-issue / Correction" অপশনে আবেদন করবেন এবং এনআইডির সত্যায়িত কপি ও প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক সম্পাদিত অঙ্গীকারনামা (Affidavit) সংযুক্ত করে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে জমা দিলে কোনো বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই সঠিক তথ্যে পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়।
  • অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে: ১৮ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে অনলাইন ভেরিফায়েড জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং পিতা-মাতার এনআইডি অনুযায়ী তথ্য সমন্বয় করা হয়।

৫. পাসপোর্ট ডেলিভারি ট্র্যাকিং ও সংগ্রহের নিয়মাবলী

পাসপোর্ট অফিসে বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলার পর আপনাকে একটি Delivery Slip দেওয়া হবে, যাতে একটি Application ID (যেমন: OID100XXXXXXXX) থাকবে। এই আইডি এবং জন্মতারিখ ব্যবহার করে epassport.gov.bd-এর "Check Status" পেজে গিয়ে নিচের স্ট্যাটাসগুলো দেখতে পাবেন:

  • Submitted / Pending Verification: আবেদন জমা হয়েছে এবং পুলিশ তদন্ত চলমান।
  • Pending Approval: পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর পাসপোর্ট উপ-পরিচালক কর্তৃক চূড়ান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়া।
  • In Printing: আপনার স্মার্ট ই-পাসপোর্টটি স্বয়ংক্রিয় মেশিনে মুদ্রিত হচ্ছে।
  • Passport is ready for issuance: আপনার পাসপোর্টটি অফিসে এসে পৌঁছেছে এবং ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত!

স্ট্যাটাস রেডি দেখালে মূল ডেলিভারি স্লিপ এবং নিজের মূল জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে সশরীরে উপস্থিত হয়ে বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলিয়ে নিজের পাসপোর্ট নিজেই সংগ্রহ করে নিন।

৬. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: পাসপোর্ট রিনিউ করতে কি আবার পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগবে?
উত্তর: না, পুরোনো পাসপোর্ট রিনিউ বা মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট নতুন করার ক্ষেত্রে স্থায়ী বা বর্তমান ঠিকানায় বড় পরিবর্তন না থাকলে সাধারণত কোনো নতুন পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন হয় না।

প্রশ্ন ২: সুপার এক্সপ্রেস (Super Express) ডেলিভারি পেতে কত দিন সময় লাগে?
উত্তর: সুপার এক্সপ্রেসের ক্ষেত্রে মাত্র ২ কার্যদিবসের মধ্যে পাসপোর্ট প্রিন্ট হয়ে যায়। তবে এর জন্য ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ে বিশেষ আবেদনের মাধ্যমে প্রসেস করাতে হয় এবং জরুরি চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন বা বিদেশ যাত্রার টিকিটের প্রমাণ দেখাতে হয়।

প্রশ্ন ৩: পাসপোর্ট কি অন্য কেউ গিয়ে তুলে আনতে পারবে?
উত্তর: না, ই-পাসপোর্ট ডেলিভারি নেওয়ার সময় প্রার্থীর লাইভ বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিং করতে হয়। তাই অসুস্থ বা বিশেষ অপারগতা ছাড়া প্রার্থীকেই সশরীরে উপস্থিত হতে হবে।

Post a Comment

Previous Post Next Post