অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করার নিয়ম ২০২৬: পেশাদার ও অপেশাদার লাইসেন্স রিনিউ, ডোপ টেস্ট, মেডিকেল ও বিএসপি আবেদন গাইড

BRTA Driving License Renewal Online BSP Application Guide Bangladesh 2026

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া রাস্তায় যেকোনো ধরনের মোটরযান (মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, অটোরিকশা, বাস বা ভারী ট্রাক) চালানো সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ যদি উত্তীর্ণ হয়ে যায়, তবে ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃক যানবাহন জব্দ, বিপুল অংকের মামলা ও জরিমানা এমনকি আইনি জটিলতার মুখে পড়ার ঝুঁকি থাকে। পূর্বে বিআরটিএ (BRTA) অফিসে ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন বা রিনিউ করতে গিয়ে সাধারণ চালকদের দিনভর দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, ফাইলিং সংক্রান্ত চরম বিড়ম্বনা এবং মধ্যস্বত্বভোগী দালালের খপ্পরে পড়ে অতিরিক্ত ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত গচ্চা দিতে হতো।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) তাদের পুরো সেবা ব্যবস্থা নাগরিকবান্ধব ও সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক করেছে। এখন ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নের জন্য কোনো গ্রাহককে সশরীরে বিআরটিএ সার্কেল অফিসে ছুটোছুটি বা লাইন ধরতে হয় না। বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল (BRTA Service Portal - BSP)-এর মাধ্যমে আপনি নিজের স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করে ঘরে বসেই মেডিকেল সার্টিফিকেট আপলোড, ফি পরিশোধ এবং নবায়নের আবেদন সম্পন্ন করতে পারেন। আবেদন অনুমোদিত হওয়ামাত্র তাৎক্ষণিকভাবে অনলাইন কিউআর কোডযুক্ত ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স (e-Driving License) ডাউনলোড করে প্রিন্ট নিয়ে বৈধভাবে গাড়ি চালানো যায় এবং পরবর্তীতে প্রিন্ট হওয়া মূল প্লাস্টিক চিপযুক্ত স্মার্ট কার্ড ডাকযোগে (Postal Delivery) সরাসরি আপনার বর্তমান ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া হয়। একজন সিনিয়র ডিজিটাল নাগরিক সেবা ও বিআরটিএ আইন বিশ্লেষক হিসেবে আজ আমি ২০২৬ সালের হালনাগাদ নিয়ম অনুযায়ী অপেশাদার ও পেশাদার লাইসেন্স নবায়নের সরকারি ফি, ডোপ টেস্টের নিয়ম, মেডিকেল সনদ এবং ধাপে ধাপে অনলাইন আবেদনের পুঙ্খানুপুঙ্খ মাস্টার ব্লুপ্রিন্ট তুলে ধরছি:

১. অপেশাদার বনাম পেশাদার লাইসেন্স নবায়নের মৌলিক পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্য

বিআরটিএ মোটরযান বিধিমালা অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন মূলত দুটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে পরিচালিত হয় এবং উভয়ের শর্ত, মেয়াদ ও আইনি নীতিমালায় সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে:

তুলনার বিষয়াবলী অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স (Non-Professional) পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স (Professional)
নবায়নকৃত লাইসেন্সের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ (দশ) বছর মেয়াদের জন্য নবায়ন করা হয়। সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বছর মেয়াদের জন্য নবায়ন করা হয়।
ডোপ টেস্ট (Dope Test) প্রযোজ্য নয় (অপেশাদারদের ডোপ টেস্ট করতে হয় না)। ১০০% বাধ্যতামূলক (সরকারি হাসপাতাল বা সিভিল সার্জন অনুমোদিত ল্যাব হতে সনদ)।
বায়োমেট্রিক ও ছবি প্রদান পূর্বে চিপযুক্ত স্মার্ট কার্ড থাকলে নতুন করে বায়োমেট্রিক লাগে না; সম্পূর্ণ ঘরে বসেই হয়। শারীরিক ফিটনেস যাচাই বা দীর্ঘমেয়াদে হালনাগাদের জন্য বিশেষ ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিক লাগতে পারে।
আবেদনের উপযুক্ত সময়কাল মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ থেকে ৩০ দিন পূর্বে বা মেয়াদোত্তীর্ণের পর যেকোনো সময়। মেয়াদ শেষ হওয়ার কমপক্ষে ৩০ দিন পূর্বে আবেদন করা আইনত উত্তম।
যানবাহন ব্যবহারের পরিধি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও ব্যক্তিগত জিপ চালনার জন্য। ভাড়ায় চালিত ট্যাক্সি, বাস, ট্রাক, পিকআপ, কমার্শিয়াল কাভার্ড ভ্যান ইত্যাদি চালনার জন্য।

২. ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নে প্রয়োজনীয় নথিপত্রের পূর্ণাঙ্গ চেকলিস্ট

বিএসপি পোর্টালে অনলাইন আবেদন শুরু করার পূর্বেই নিচের ৫টি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের স্পষ্ট স্ক্যান কপি বা মোবাইল দিয়ে তোলা পরিষ্কার ছবি (JPG/PNG বা PDF ফরম্যাটে, প্রতি ফাইলের সাইজ অনধিক ১ মেগাবাইট বা ১০২৪ কিলোবাইট) প্রস্তুত করে রাখুন:

ক্রম প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের নাম বিস্তারিত বিবরণ ও গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলী
১ বিদ্যমান ড্রাইভিং লাইসেন্স আপনার বর্তমান স্মার্ট কার্ড, মেমোরি চিপযুক্ত কার্ড বা পেপার লাইসেন্সের উভয় পিঠের স্পষ্ট ও সম্পূর্ণ রঙিন ছবি।
২ মেডিকেল সার্টিফিকেট (Medical Fitness Form) বিআরটিএ নির্ধারিত নির্দিষ্ট মেডিকেল ফরমে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) নিবন্ধিত রেজিস্টার্ড এমবিবিএস ডাক্তারের সিল, স্বাক্ষর ও বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নম্বরযুক্ত মূল প্রত্যয়নপত্র।
৩ জাতীয় পরিচয়পত্র (NID Card) আবেদনকারীর মূল স্মার্ট এনআইডি কার্ডের উভয় পিঠের স্পষ্ট রঙিন কপি। (এনআইডি না থাকলে অনলাইন জন্মসনদ ও পাসপোর্ট কপি)।
৪ পেশাদারদের জন্য ডোপ টেস্ট রিপোর্ট সরকারি কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল বা জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় হতে মাদকাসক্ত নন মর্মে প্রদত্ত মূল ডোপ টেস্ট নেগেটিভ সনদ (শুধুমাত্র পেশাদার চালকদের জন্য)।
৫ আবেদনকারীর পাসপোর্ট সাইজ ছবি ও ঠিকানা প্রমাণ সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের ল্যাব প্রিন্ট পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং স্থায়ী বা বর্তমান ঠিকানা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিলের কপি।

৩. সরকারি ফি তালিকা ও মেয়াদোত্তীর্ণ বিলম্ব জরিমানার হিসাব ২০২৬

বিআরটিএ কর্তৃক নির্ধারিত ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন ফি সম্পূর্ণ সুনির্দিষ্ট এবং সরকারি কোষাগারে সরাসরি ট্রেজারি বা ডিজিটাল গেটওয়ের মাধ্যমে জমা হয়। ২০২৬ সালের হালনাগাদ সরকারি ফি কাঠামো নিম্নরূপ:

লাইসেন্সের ক্যাটাগরি মূল সরকারি ফি (টাকা) ১৫% সরকারি ভ্যাট (টাকা) সর্বমোট নবায়ন ফি (টাকা) মেয়াদোত্তীর্ণ হলে বাৎসরিক বিলম্ব জরিমানা
অপেশাদার লাইসেন্স (১০ বছর মেয়াদী) ৪,১৮০/- ৬২৭/- ৪,৮০৭/- টাকা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রতি বছর ৫১৮/- টাকা হারে অতিরিক্ত জরিমানা যুক্ত হবে।
পেশাদার লাইসেন্স (৫ বছর মেয়াদী) ২,৪২০/- ৩৬৩/- ২,৭৮৩/- টাকা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রতি বছর ৫১৮/- টাকা হারে অতিরিক্ত জরিমানা যুক্ত হবে।
ডাকযোগে স্মার্ট কার্ড হোম ডেলিভারি ফি — — ৬০/- থেকে ১২০/- টাকা (দূরত্ব অনুযায়ী) সরাসরি বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে কার্ড গ্রাহকের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

* লক্ষ্য করুন: আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ যদি ১ বছর ১ দিনও পার হয়ে যায়, তবে সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ ১ বছরের বিলম্ব জরিমানা (৫১৮ টাকা) যোগ হবে। ২ বছর পার হলে ১,০৩৬ টাকা এবং ৩ বছর পার হলে ১,৫৫৪ টাকা জরিমানা মূল ফির সাথে যুক্ত হবে।

৪. পেশাদার চালকদের জন্য ডোপ টেস্টের পূর্ণাঙ্গ নিয়ম ও অনুমোদিত ল্যাব

সড়ক দুর্ঘটনা রোধ এবং চালকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে সরকার পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করেছে:

  • কোথায় ডোপ টেস্ট করাবেন: ঢাকা বিভাগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ডোপ টেস্ট করা হয়। ঢাকার বাইরে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতাল বা সিভিল সার্জন কার্যালয় নির্ধারিত ল্যাবে এই টেস্ট করা যায়।
  • টেস্টের সরকারি ফি: সরকারি হাসপাতালে ডোপ টেস্টের নির্ধারিত ফি সাধারণত ৯০০ টাকা।
  • কী কী মাদক পরীক্ষা করা হয়: ইউরিন বা মূত্র পরীক্ষার মাধ্যমে অপিয়েটস (হেরোইন, মরফিন), ক্যানাবিনয়েডস (গাঁজা, মারিজুয়ানা), অ্যাম্ফিটামিন (ইয়াবা), বেনজোডায়াজেপাইন এবং অ্যালকোহল সেবনের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়।
  • রিপোর্টের মেয়াদ: ডোপ টেস্টের রিপোর্ট ইস্যু হওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অনলাইনে বিএসপিতে সাবমিট করতে হবে; অন্যথায় রিপোর্ট মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাবে।

৫. ঘরে বসে বিএসপি (BSP) পোর্টালে অনলাইন আবেদনের ধাপে ধাপে গাইড

কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের সহায়তা ছাড়াই নিজের স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ দিয়ে মাত্র ১৫ মিনিটে নবায়নের আবেদন করার অফিশিয়াল প্রক্রিয়া:

বিএসপি পোর্টালে ধাপে ধাপে আবেদন প্রণালী:

  1. ধাপ ১ (বিএসপি পোর্টালে রেজিস্ট্রেশন ও লগইন):
    যেকোনো ব্রাউজার ওপেন করে বিআরটিএর অফিসিয়াল সিটিজেন সার্ভিস পোর্টাল https://bsp.brta.gov.bd-এ প্রবেশ করুন। পূর্বে অ্যাকাউন্ট না থাকলে আপনার স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ ও সক্রিয় মোবাইল নম্বর দিয়ে তাৎক্ষণিক ওটিপি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন। এরপর ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে ড্যাশবোর্ডে লগইন করুন।
  2. ধাপ ২ (বিদ্যমান লাইসেন্স প্রোফাইলে সংযুক্ত করা):
    ড্যাশবোর্ডের বাম পাশের মেনু থেকে 'ড্রাইভিং লাইসেন্স' ট্যাবে ক্লিক করুন। এরপর 'ড্রাইভিং লাইসেন্স যুক্ত করুন' বাটনে ক্লিক করে আপনার বর্তমান ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর ও জন্মতারিখ ইনপুট দিন। বিআরটিএ সার্ভার আপনার রেকর্ড খুঁজে বের করলে স্ক্রিনে আপনার ছবিসহ পূর্ববর্তী লাইসেন্সের তথ্য দেখাবে। 'সংযুক্ত করুন' বাটনে চাপ দিয়ে এটি আপনার প্রোফাইলের সাথে স্থায়ীভাবে লিংক করে নিন।
  3. ধাপ ৩ (নবায়নের আবেদন বা Apply for Renewal নির্বাচন):
    লাইসেন্সটি প্রোফাইলে যুক্ত হওয়ার পর ডানপাশে 'নবায়নের আবেদন' (Apply for Renewal) বাটন দেখতে পাবেন। সেখানে ক্লিক করলে একটি বিস্তারিত আবেদন ফরম ওপেন হবে। আপনার বর্তমান মোবাইল নম্বর, পেশা, রক্তের গ্রুপ এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্য দিন। আপনি যদি বর্তমান ঠিকানা পরিবর্তন করতে চান, তবে নতুন ঠিকানা টাইপ করুন এবং ঠিকানার প্রমাণপত্র যুক্ত করুন।
  4. ধাপ ৪ (মেডিকেল ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস আপলোড):
    বিএসপি থেকে ডাউনলোডকৃত নির্দিষ্ট মেডিকেল ফরমে ডাক্তারের সিল ও স্বাক্ষর সংবলিত স্ক্যান কপি নির্দিষ্ট আপলোড বক্সে দিন। আপনি যদি পেশাদার লাইসেন্সধারী হন, তবে সরকারি ল্যাবের ডোপ টেস্ট সনদের কপি আপলোড করুন। সব ফাইল যেন সোজা এবং পরিষ্কার পড়া যায় তা নিশ্চিত করুন।
  5. ধাপ ৫ (অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়েতে ফি পরিশোধ):
    সকল তথ্য ও কাগজপত্র রিভিউ করে 'সাবমিট' বাটনে চাপ দিন। সাথে সাথে সিস্টেমে মোট নবায়ন ফি, ১৫% ভ্যাট এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিলম্ব জরিমানাসহ একটি সরকারি ই-চালান প্রস্তুত হবে। আপনি সরাসরি বিকাশ (bKash), নগদ (Nagad), রকেট, উপায়, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড বা ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে ফি পরিশোধ করতে পারবেন। পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ামাত্র সিস্টেম থেকে একটি ডিজিটাল পেমেন্ট স্লিপ (e-Receipt) ডাউনলোড করে প্রিন্ট বা সেভ করে রাখুন।
  6. ধাপ ৬ (অনলাইন ই-লাইসেন্স ডাউনলোড ও ট্র্যাকিং):
    ফি পরিশোধের পর আপনার আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ সার্কেল সহকারী পরিচালকের টেবিলে চলে যাবে। কর্মকর্তা আপনার কাগজপত্র অনলাইনে যাচাই করে সাধারণত ১ থেকে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে অনুমোদন প্রদান করেন। অনুমোদন পাওয়া মাত্রই আপনার বিএসপি ড্যাশবোর্ডে 'ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স' (e-Driving License) প্রস্তুত হয়ে যাবে। এটি সাথে সাথে ডাউনলোড করে রঙিন প্রিন্ট বা লেমিনেট করে নিলেই আপনি সম্পূর্ণ বৈধভাবে রাস্তায় গাড়ি চালাতে পারবেন।

৬. মেডিকেল সার্টিফিকেট ফরম পূরণ ও ডাক্তারের সত্যায়ন সংক্রান্ত নিয়মাবলী

বিআরটিএ ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে মেডিকেল সার্টিফিকেট অত্যন্ত সংবেদনশীল নথি। কোনো সাধারণ প্রেসক্রিপশনে ডাক্তারের হাতের লেখা বিআরটিএ গ্রহণ করে না:

  • বিএসপি পোর্টাল অথবা বিআরটিএর ওয়েবসাইট থেকে 'Medical Fitness Certificate Form for Driving License' নির্দিষ্ট ফরমটি ডাউনলোড করে এ-ফোর সাইজে প্রিন্ট করুন।
  • ফরমে আবেদনকারীর সাম্প্রতিক এক কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি আঠা দিয়ে সংযুক্ত করুন।
  • যেকোনো সরকারি হাসপাতাল অথবা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) নিবন্ধিত প্রাইভেট এমবিবিএস (MBBS) ডাক্তারের নিকট যান।
  • ডাক্তার আপনার দৃষ্টিশক্তি (Eye Sight - 6/6 বা চশমাসহ সক্ষমতা), বর্ণান্ধতা (Color Blindness), শ্রবণশক্তি, হৃদযন্ত্র ও রক্তচাপ পরীক্ষা করবেন।
  • ডাক্তার ফরমে আপনার শারীরিক সক্ষমতা ঠিক আছে মর্মে টিক চিহ্ন দেবেন এবং ছবির ওপর ও ফরমে নিজের BMDC রেজিস্ট্রেশন নম্বর সংবলিত অফিশিয়াল সিল ও স্বাক্ষর প্রদান করবেন।
  • ডাক্তারের সিল ও বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নম্বর অস্পষ্ট বা অনুপস্থিত থাকলে অনলাইন আবেদন সরাসরি বাতিল হয়ে যায়।

৭. পেমেন্ট আটকে গেলে বা মানি রিসিট না আসলে করণীয়

অনলাইনে বিকাশ বা কার্ড দিয়ে ফি কাটার পর অনেক সময় ইন্টারনেট বা সার্ভার ত্রুটির কারণে স্ক্রিনে 'Failed' দেখাতে পারে কিন্তু অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেয়। এমন পরিস্থিতিতে করণীয়:

  1. পুনরায় সাথে সাথে পেমেন্ট করবেন না: টাকা কেটে নিলে কখনোই তাৎক্ষণিকভাবে দ্বিতীয়বার পেমেন্ট করবেন না; এতে দ্বৈত টাকা কেটে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
  2. ট্রানজেকশন আইডি সংরক্ষণ করুন: বিকাশ বা ব্যাংকের এসএমএস থেকে ট্রানজেকশন আইডি (TrxID) লিখে রাখুন।
  3. বিএসপিতে ট্রানজেকশন ভেরিফাই করুন: বিএসপির ড্যাশবোর্ডে 'পেমেন্ট হিস্ট্রি' বা 'ফি সংক্রান্ত তথ্য' অপশনে গিয়ে 'Re-check' বা 'Verify Payment' বাটনে ক্লিক করে ট্রানজেকশন আইডি দিন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক রিসিট জেনারেট হয়ে যায়।
  4. ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা: ব্যাংক ও বিআরটিএ গেটওয়ের স্বয়ংক্রিয় রিকনসিলিয়েশনের জন্য সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রিসিট না আসলে বিআরটিএ হেল্পলাইন ১৬১০৭ (16107)-এ কল করে ট্রানজেকশন আইডি জানালেই তারা পেমেন্ট আপডেট করে দেয়।

৮. লাইসেন্স নবায়নে চালকদের ৭টি মারাত্মক ভুল ও প্রতিকার

  1. মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকা: মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রতি দিনের জন্য হিসাব না করে পূর্ণ বাৎসরিক ভিত্তিতে ৫১৮ টাকা করে জরিমানা ধরা হয়। তাই মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ২০-২৫ দিন আগেই আবেদন সম্পন্ন করা বুদ্ধিমানের কাজ।
  2. এনআইডির তথ্যের সাথে গরমিল: আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রে যে নাম ও জন্মতারিখ রয়েছে, বিএসপিতে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় হুবহু সেই তথ্য দিতে হবে। এনআইডি ও লাইসেন্সের তথ্যে অমিল থাকলে আবেদন আটকে যায়।
  3. ভুয়া সিল বা অসাধু উপায়ের আশ্রয় নেওয়া: কোনো পরীক্ষা ছাড়া কম্পিউটার দোকান থেকে ভুয়া ডাক্তারের সিল দিয়ে মেডিকেল আপলোড করলে বিআরটিএ এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজিএইচএস ডাটাবেজ ও বিএমডিসি দিয়ে অনলাইনে ক্রস-চেক করে; ভুয়া প্রমাণিত হলে লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল ও আইনগত মামলা হতে পারে।
  4. ডোপ টেস্টের সময়সীমা খেয়াল না রাখা: পেশাদার চালকদের ডোপ টেস্টের রিপোর্ট ইস্যু হওয়ার তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের বেশি পুরোনো হলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হয় না।
  5. ভুল সার্কেল অফিস নির্বাচন: আপনি যে বিআরটিএ সার্কেল অফিস থেকে পূর্বে লাইসেন্স নিয়েছিলেন, নবায়নের সময় সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটি ডিফল্ট দেখায়। আপনি যদি স্থায়ীভাবে অন্য জেলায় স্থানান্তরিত হয়ে থাকেন, তবে বিএসপিতে 'সার্কেল পরিবর্তন' অপশন সিলেক্ট করতে হবে।
  6. অস্পষ্ট ছবি আপলোড: মোবাইলের কম আলোতে তোলা অস্পষ্ট, বাঁকা বা ফ্ল্যাশ লাইট পড়া ছবি আপলোড করলে বিআরটিএ সহকারী পরিচালক আবেদন বাতিল করে দেন। সবসময় ডকুমেন্টের স্পষ্ট ফ্ল্যাট স্ক্যান কপি আপলোড করুন।
  7. স্মার্ট কার্ডের ডাক ট্র্যাকিং না করা: ই-লাইসেন্স পাওয়ার পর মূল প্লাস্টিক স্মার্ট কার্ড প্রিন্ট হয়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগে হস্তান্তর হলে একটি ট্র্যাকিং নম্বর (Postal Tracking ID) এসএমএসে আসে। এলাকার পোস্টম্যানের সাথে যোগাযোগ না রাখলে কার্ড ডাকঘরে পড়ে থেকে আবার বিআরটিএ হেডকোয়ার্টারে ফেরত চলে যায়।

৯. ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন সংক্রান্ত সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করার পর মূল কার্ড না আসা পর্যন্ত গাড়ি চালানো যাবে কি?

হ্যাঁ, শতভাগ বৈধভাবে গাড়ি চালানো যাবে। অনলাইন আবেদন অনুমোদিত হলে বিএসপি থেকে যে কিউআর কোড সম্বলিত ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স (e-Driving License) ডাউনলোড করা যায়, তা সরকারের সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী মূল স্মার্ট কার্ডের মতোই সমান আইনি ক্ষমতাসম্পন্ন। ট্রাফিক পুলিশ বা সার্জেন্ট কিউআর কোড স্ক্যান করে তাৎক্ষণিকভাবে এর সত্যতা যাচাই করতে পারেন।

২. অনেক বছর আগে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া লাইসেন্স কি এখনো নবায়ন করা সম্ভব?

হ্যাঁ, সম্ভব। আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ যদি ২ বছর, ৫ বছর এমনকি ১০ বছর আগেও শেষ হয়ে থাকে, তবুও বিআরটিএ বিধিমালা অনুযায়ী আপনি বাৎসরিক বিলম্ব জরিমানা (প্রতি বছর ৫১৮ টাকা হারে) পরিশোধ করে লাইসেন্সটি নবায়ন করতে পারবেন। তবে অনেক বেশি সময় পার হয়ে গেলে বিআরটিএ সার্কেল কর্তৃপক্ষ আপনাকে পুনরায় শারীরিক ও ব্যবহারিক রোড টেস্টে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে।

৩. অপেশাদার লাইসেন্স নবায়নে কি নতুন করে বায়োমেট্রিক ও ছবি দিতে বিআরটিএ যেতে হবে?

আপনি যদি ইতোপূর্বে বিআরটিএর চিপযুক্ত স্মার্ট কার্ড ব্যবহারকারী হয়ে থাকেন, তবে অপেশাদার লাইসেন্স নবায়নে নতুন করে কোনো বায়োমেট্রিক বা ছবি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সার্ভারে সংরক্ষিত পূর্বের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ছবির ভিত্তিতেই নতুন কার্ড প্রিন্ট হয়ে ডাকযোগে চলে আসবে। তবে যাদের এখনো পুরোনো কাগজের বা লেমিনেটেড লাইসেন্স রয়েছে, তাদের একবার বায়োমেট্রিক দিতে সার্কেল অফিসে যেতে হবে।

৪. পেশাদার থেকে অপেশাদার অথবা অপেশাদার থেকে পেশাদার লাইসেন্সে রূপান্তর করা যায় কি?

হ্যাঁ, নবায়নের সময় ক্যাটাগরি পরিবর্তনের আবেদন করা যায়। অপেশাদার লাইসেন্সকে পেশাদারে রূপান্তর করতে হলে অতিরিক্ত ডোপ টেস্ট ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় পাস করতে হয়। অপরদিকে পেশাদার লাইসেন্সকে অপেশাদারে রূপান্তর করতে কোনো ডোপ টেস্ট লাগে না, শুধু অতিরিক্ত ফি সমন্বয় করলেই ১০ বছর মেয়াদের অপেশাদার লাইসেন্স পাওয়া যায়।

৫. প্রবাসে থাকা অবস্থায় কি দেশীয় ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করা যায়?

হ্যাঁ, বিদেশে অবস্থানরত অনিবাসী বাংলাদেশিরা বিএসপি পোর্টালে লগইন করে অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করতে পারেন। সেক্ষেত্রে যে দেশে অবস্থান করছেন সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস অনুমোদিত চিকিৎসকের মেডিকেল সার্টিফিকেট এবং কর্মস্থলের ভিসার কপি সংযুক্ত করতে হবে। অনুমোদনের পর ই-লাইসেন্স সাথে সাথে পাওয়া যাবে এবং দেশের স্থায়ী ঠিকানায় ডাকযোগে কার্ড ডেলিভারি হবে।


লেখক ও গবেষক পরিচিতি:

বায়েজীদ জামান — ডিজিটাল নাগরিক সেবা ও ক্যারিয়ার পরামর্শক। korkho.blogspot.com-এর মূল লক্ষ্য সাধারণ নাগরিকদের জন্য জটিল সরকারি ও ডিজিটাল সেবাকে সহজবোধ্য করা এবং দালালমুক্ত ডিজিটাল সেবা নিশ্চিতে নির্ভরযোগ্য সমাধান পৌঁছে দেওয়া।

Post a Comment

Previous Post Next Post