এসএসসি রসায়ন পরীক্ষায় পূর্ণাঙ্গ নম্বর পাওয়ার চাবিকাঠি হলো ৪র্থ অধ্যায় 'পর্যায় সারণি' (Periodic Table)। সৃজনশীল প্রশ্নের (খ) অংশে ২ নম্বরের যে অনুধাবনমূলক প্রশ্নগুলো আসে, সেগুলোতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী পর্যায়বৃত্ত ধর্মের মূল বৈজ্ঞানিক যুক্তি স্পষ্ট না করে শুধু ভাসা-ভাসা বর্ণনা লেখে। যেমন পারমাণবিক ব্যাসার্ধ, আয়নিকরণ শক্তি, তড়িৎ ঋণাত্বকতার পরিবর্তন এবং বিশেষ মৌলগুলোর অবস্থানের ব্যতিক্রম। বিগত বছরগুলোর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বোর্ডের সৃজনশীল প্রশ্ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৪-৫টি নির্দিষ্ট প্যাটার্নের প্রশ্নই প্রতি বছর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আসে। নিচে পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বর পাওয়ার মতো টু-দ্য-পয়েন্ট সমাধান তুলে ধরা হলো:
১. সোডিয়াম (Na) অপেক্ষা ম্যাগনেসিয়াম (Mg)-এর পারমাণবিক আকার ছোট কেন?
উত্তর: সোডিয়াম ($_{11}\text{Na}$) এবং ম্যাগনেসিয়াম ($_{12}\text{Mg}$) উভয়ই পর্যায় সারণির ৩য় পর্যায়ের মৌল। একই পর্যায়ের বাম থেকে যত ডানে যাওয়া যায়, মৌলসমূহের পারমাণবিক সংখ্যা (অর্থাৎ নিউক্লিয়াসে প্রোটন সংখ্যা) বৃদ্ধির সাথে সাথে বহিঃস্থ স্তরে ইলেকট্রন সংখ্যা ১টি করে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু প্রধান শক্তিস্তরের কোনো বৃদ্ধি ঘটে না। ম্যাগনেসিয়ামের নিউক্লিয়াসে ১২টি ধনাত্মক প্রোটন বহিঃস্থ স্তরের ইলেকট্রনগুলোকে সোডিয়ামের (১১টি প্রোটন) তুলনায় অধিক শক্তিশালী আকর্ষণ বলে নিজের দিকে টেনে রাখে। কার্যকর নিউক্লীয় চার্জ বৃদ্ধির কারণে ম্যাগনেসিয়ামের ইলেকট্রন মেঘ সংকুচিত হয়। ফলে একই পর্যায়ের মৌল হওয়া সত্ত্বেও সোডিয়ামের তুলনায় ম্যাগনেসিয়ামের পারমাণবিক আকার বা ব্যাসার্ধ ছোট হয়।
২. হিলিয়ামকে (He) গ্রুপ-২ এ না রেখে গ্রুপ-১৮ তে রাখা হয়েছে কেন?
উত্তর: হিলিয়ামের ইলেকট্রন বিন্যাস হলো $1s^2$। ইলেকট্রন বিন্যাস অনুযায়ী বহিঃস্থ স্তরে দুটি ইলেকট্রন থাকায় একে গ্রুপ-২ এর মৃৎক্ষার ধাতুগুলোর সাথে স্থান দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গ্রুপ-২ এর মৌলগুলো তীব্র সক্রিয় ও তড়িৎ ধনাত্মক ধাতু। অন্যদিকে হিলিয়ামের প্রথম ও একমাত্র শক্তিস্তরে সর্বোচ্চ ২টি ইলেকট্রন ধারণ ক্ষমতা থাকায় এর সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরটি ইলেকট্রন দ্বারা সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ। ফলে হিলিয়াম চরম রাসায়নিক নিষ্ক্রিয়তা প্রদর্শন করে এবং সাধারণ তাপমাত্রায় কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয় না। নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলোর ($Ne, Ar, Kr$) সাথে ধর্মের এই শতভাগ মিলের কারণে এবং পর্যায় সারণির ধর্মের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হিলিয়ামকে গ্রুপ-২ এ না রেখে গ্রুপ-১৮ এর নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলোর সাথে স্থান দেওয়া হয়েছে।
৩. ফ্লোরিনকে সবচেয়ে শক্তিশালী তড়িৎ ঋণাত্মক মৌল বলা হয় কেন?
উত্তর: সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ শেয়ারকৃত ইলেকট্রন যুগলকে নিজের দিকে আকর্ষণ করার আপেক্ষিক ক্ষমতাকে তড়িৎ ঋণাত্মকতা বলে। পর্যায় সারণির গ্রুপ-১৭ এর সবার উপরে অবস্থান করায় ফ্লোরিনের ($_{9}\text{F}$) পারমাণবিক আকার অত্যন্ত ছোট এবং এর বহিঃস্থ স্তরে ৭টি ইলেকট্রন থাকে। মাত্র একটি ইলেকট্রন গ্রহণ করলেই এটি স্থিতিশীল অষ্টক পূরণ করতে পারে। ক্ষুদ্র পারমাণবিক আকারের কারণে এর নিউক্লিয়াসের কার্যকর আকর্ষণ ক্ষমতা অন্য যেকোনো অধাতব মৌলের চেয়ে তীব্র। ফলে পাউলিং স্কেলে ফ্লোরিনের তড়িৎ ঋণাত্মকতার মান সর্বোচ্চ (৪.০) হয় এবং একে পর্যায় সারণির সবচেয়ে শক্তিশালী তড়িৎ ঋণাত্মক মৌল বলা হয়।
৪. পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পাওয়ার গোপন কৌশল
বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা অনুধাবনমূলক উত্তরে ইলেকট্রন বিন্যাস দেখাতে ভুলে যায়। মনে রাখবেন, প্রশ্ন যার সম্পর্কিতই হোক না কেন, উত্তরের শুরুতে সংশ্লিষ্ট মৌলের ইলেকট্রন বিন্যাসটি সুন্দর করে লিখে দিলে পরীক্ষক অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং নির্দ্বিধায় পূর্ণ ২ নম্বর প্রদান করেন।
পর্যায় সারণি নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: নোবেল গ্যাসগুলোর ইলেকট্রন আসক্তি প্রায় শূন্য হয় কেন?
উত্তর: নোবেল গ্যাসগুলোর বহিঃস্থ শক্তিস্তর ইলেকট্রন দ্বারা পূর্ণ (অষ্টক বা দ্বিত্ব) থাকে। ফলে এদের নতুন করে ইলেকট্রন গ্রহণের কোনো প্রাকৃতিক প্রবণতা থাকে না, তাই এদের ইলেকট্রন আসক্তির মান শূন্য বা ধনাত্মক হয়।
প্রশ্ন: অবস্থান্তর মৌল বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: যেসব d-ব্লক মৌলের অন্তত একটি স্থিতিশীল আয়নে আংশিক পূর্ণ d-অরবিটাল ($d^{1-9}$) বিদ্যমান থাকে, তাদের অবস্থান্তর মৌল বলা হয় (যেমন: Fe, Cu)।
Post a Comment