বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম সফল ডিজিটাল উদ্যোগ হলো বায়োমেট্রিক ই-পাসপোর্ট (e-Passport) ব্যবস্থা। বর্তমানে কোনো প্রকার দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর সহায়তা ছাড়াই ঘরে বসে নিজের স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে আবেদন ফরম পূরণ করে সরাসরি পাসপোর্ট অফিসে বায়োমেট্রিক দেওয়া সম্ভব। তবে আবেদন ফরম পূরণের সময় নামের বানানে অমিল, পেশা নির্বাচন, সঠিক ফি পরিশোধ এবং বিশেষ করে পুলিশ ভেরিফিকেশন (Police Verification) পর্যায়ে অনেকেই জটিলতার সম্মুখীন হন। ২০২৬ সালের হালনাগাদ পাসপোর্ট বিধিমালা অনুযায়ী আবেদন ফরম পূরণ, এ-চালান/বিকাশে ফি জমার নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ভেরিফিকেশন ঝামেলাহীনভাবে সম্পন্ন করার সম্পূর্ণ সঠিক উপায় নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. ই-পাসপোর্ট আবেদনের ধাপসমূহ (স্টেপ-বাই-স্টেপ)
- অফিশিয়াল পোর্টালে একাউন্ট তৈরি: প্রথমে
www.epassport.gov.bdওয়েবসাইটে প্রবেশ করে আপনার সক্রিয় ইমেইল অ্যাড্রেস দিয়ে একটি ইউজার অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন এবং ইমেইলে আসা অ্যাক্টিভেশন লিংকে ক্লিক করে অ্যাকাউন্ট সচল করুন। - বর্তমান ঠিকানার পাসপোর্ট অফিস নির্বাচন: আপনার বর্তমান ঠিকানা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস (RPO) নির্বাচন করুন। মনে রাখবেন, বায়োমেট্রিক দিতে আপনাকে এই নির্দিষ্ট অফিসেই যেতে হবে।
- ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ: আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা অনলাইন জন্মনিবন্ধন (BRC) অনুযায়ী নিজের নাম, পিতা-মাতার নাম, বৈবাহিক অবস্থা ও জন্মতারিখ হুবহু ইংরেজি বড় অক্ষরে টাইপ করুন।
- পাসপোর্টের পৃষ্ঠা ও মেয়াদ নির্বাচন: আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী ৪৮ পৃষ্ঠা বা ৬৪ পৃষ্ঠা এবং ৫ বছর বা ১০ বছর মেয়াদের অপশন নির্বাচন করুন।
- অ্যাপয়েন্টমেন্ট গ্রহণ: আবেদন সাবমিট করার পর বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ) প্রদানের জন্য আপনার সুবিধাজনক তারিখের শিডিউল বুক করুন।
২. ২০২৬ সালের হালনাগাদ ই-পাসপোর্ট ফি তালিকা (ভ্যাটসহ)
বাংলাদেশে সাধারণ নাগরিক এবং জরুরি পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি কাঠামো:
| পাসপোর্টের ধরণ ও মেয়াদ | সাধারণ ডেলিভারি (১৫ কর্মদিবস) | জরুরি ডেলিভারি (৭ কর্মদিবস) | অতি জরুরি (২ কর্মদিবস) |
|---|---|---|---|
| ৪৮ পৃষ্ঠা - ৫ বছর মেয়াদ | ৪,০২৫ টাকা | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা |
| ৪৮ পৃষ্ঠা - ১০ বছর মেয়াদ | ৫,৭৫০ টাকা | ৮,০৫০ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা |
| ৬৪ পৃষ্ঠা - ৫ বছর মেয়াদ | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা | ১২,০৭৫ টাকা |
| ৬৪ পৃষ্ঠা - ১০ বছর মেয়াদ | ৮,০৫০ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা | ১৩,৮০০ টাকা |
নোট: সকল ফি ১৫% ভ্যাটসহ চূড়ান্ত হিসাব করা। সোনালী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক অথবা সরাসরি এ-চালান (A-Challan) ও বিকাশ/নগদের মাধ্যমে অনলাইনে ফি প্রদান করা যায়।
৩. পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- অনলাইনে পূরণকৃত আবেদন ফরমের রঙিন বা স্পষ্ট প্রিন্ট কপি (Application Summary with Barcode)।
- আবেদন ফি জমার অফিশিয়াল ব্যাংক চালান বা অনলাইন পেমেন্ট রসিদ।
- মূল জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং এর ফটোকপি (২০ বছরের নিচের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১৭ ডিজিটের ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন সনদ)।
- পেশাগত প্রমাণপত্র (চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে NOC/GO বা আইডি কার্ড, শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে স্টুডেন্ট আইডি কার্ড)।
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পূর্বের পাসপোর্ট (রি-ইস্যুর ক্ষেত্রে পুরোনো মূল পাসপোর্ট সাথে নেওয়া বাধ্যতামূলক)।
৪. পুলিশ ভেরিফিকেশন সহজ ও দ্রুত সম্পন্ন করার ট্রিকস
বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে আপনার আবেদনটি সংশ্লিষ্ট জেলা বিশেষ শাখা (DSB) বা সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চে (SB) পাঠানো হয়:
- এসবি তদন্ত কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ: পুলিশ ভেরিফিকেশন শুরু হলে আবেদনকারীর মোবাইলে তদন্তকারী অফিসারের নম্বরসহ এসএমএস আসে। এসএমএস পাওয়ার সাথে সাথেই তদন্ত কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করুন।
- প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত রাখুন: স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণের জন্য নাগরিক সনদপত্র (চেয়ারম্যান/কাউন্সিলর সনদ), বিদ্যুৎ/গ্যাস বিলের কপি, জমির খতিয়ান/পর্চা এবং পরিবারের সদস্যদের এনআইডি ফটোকপি একটি ফাইলে প্রস্তুত রাখুন।
- তথ্য গোপন না করা: স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায় কোনো ভুল তথ্য দেবেন না। তথ্যের স্বচ্ছতা থাকলে কোনো জটিলতা ছাড়াই ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স রিপোর্ট পাসপোর্ট অফিসে জমা হয়ে যায়।
৫. সাধারণ আবেদনকারীদের বহুল প্রচলিত ভুলসমূহ (Common Mistakes)
বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেকেই নিজের এনআইডির সাথে শিক্ষাগত সনদের সামান্য অমিল থাকলে তা গুরুত্ব দেন না। কিন্তু মনে রাখবেন, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ডাটাবেস সরাসরি নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সার্ভারের সাথে যুক্ত। আপনার এনআইডিতে যে বানান ও জন্মতারিখ রয়েছে, আবেদনে হুবহু তা না দিলে আবেদনটি সিস্টেমে রিজেক্ট হয়ে যায়। এছাড়া অনেকেই অফিশিয়াল ফি দেওয়ার পর চালানের মূল কপি না নিয়ে ট্রানজাকশন হিস্ট্রির স্ক্রিনশট নিয়ে যান, যা কাউন্টারে গ্রহণ করা হয় না। এ-চালানের অফিশিয়াল স্লিপটি প্রিন্ট করে সাথে রাখা অপরিহার্য।
ই-পাসপোর্ট নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: ১৮ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে কি ১০ বছরের পাসপোর্ট দেওয়া হয়?
উত্তর: না, সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছরের কম) এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ বছর মেয়াদের পাসপোর্ট প্রদান করা হয়।
প্রশ্ন: অনলাইনে পাসপোর্টের স্ট্যাটাস চেক করার উপায় কী?
উত্তর: পাসপোর্ট পোর্টালে গিয়ে Check Status অপশনে আপনার Online Registration ID (OID) অথবা Application ID এবং জন্মতারিখ দিলেই আপনার পাসপোর্টের বর্তমান অবস্থান (যেমন: Pending Biometrics, In Review, Police Clearance, Printed, Ready for Issuance) লাইভ দেখা যায়।
Post a Comment