জমি ক্রয়, পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্তি বা হেবা দলিলের পর জমির বৈধ মালিকানা নিজের নামে রেকর্ডভুক্ত করার জন্য নামজারি বা মিউটেশন (Mutation) করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ধাপ। আগে এসিল্যান্ড অফিস ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুরে দালালদের হাজার হাজার টাকা দিয়েও মাসের পর মাস কাজ হতো না। কিন্তু ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমি সেবায় এখন শতভাগ অনলাইনে ই-নামজারি সম্পন্ন করা যায়। ২০২৬ সালের হালনাগাদ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়া নিজ হাতে কীভাবে জমির নামজারি করবেন এবং এর নির্ধারিত সরকারি খরচ কত, তার একটি স্বচ্ছ গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো:
১. আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় দলিল ও কাগজপত্রের চেকলিস্ট
অনলাইনে বসার আগেই নিচের কাগজগুলোর স্পষ্ট স্ক্যান কপি বা ছবি (পিডিএফ বা জেপিজি ফরম্যাটে) রেডি রাখুন:
- মূল বিক্রয় দলিল (সাব-কবলা) বা বণ্টননামা দলিলের কপি।
- পৈতৃক সূত্রে পেলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ/ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক ওয়ারিশান সনদপত্র।
- পূর্ববর্তী খতিয়ানসমূহ (সিএস, এসএ, আরএস এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিএস বা সিটি জরিপ খতিয়ান)।
- অনলাইন দাখিলা বা সর্বশেষ বছরের ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধের রশিদ।
- আবেদনকারী ও দাতার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর ও সচল মোবাইল নম্বর।
২. ই-নামজারির নির্ধারিত সরকারি ফি (বিকাশ/রকেটে পেমেন্ট)
বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেকেই জানেন না যে নামজারির মোট সরকারি ফি মাত্র ১,১৭০ টাকা। দালালরা অহেতুক ১০-১৫ হাজার টাকা দাবি করে প্রতারণা করে। ফি-এর বিভাজন নিম্নরূপ:
- কোর্ট ফি: ২০ টাকা (আবেদনের সময় দিতে হয়)।
- নোটিশ জারি ফি: ৫০ টাকা (আবেদনের সময় দিতে হয়)।
- রেকর্ড সংশোধন বা খতিয়ান ফি: ১,০০০ টাকা (অনুমোদন হওয়ার পর)।
- ডিসিআর (DCR) ফি: ১০০ টাকা (অনুমোদন হওয়ার পর)।
এই সব ফি সরাসরি ভূমি সেবা পোর্টাল থেকে বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে অনলাইনে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া যায়।
৩. স্টেপ-বাই-স্টেপ অনলাইন আবেদনের নিয়ম
- প্রথমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল পোর্টাল
mutation.land.gov.bd-এ প্রবেশ করে 'নামজারি আবেদন' অপশনে ক্লিক করুন। - আপনার এনআইডি নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে ভেরিফাই করুন।
- জমির বিভাগ, জেলা, উপজেলা এবং সংশ্লিষ্ট মৌজা সিলেক্ট করুন।
- খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং হস্তান্তরিত জমির সঠিক পরিমাণ শতাংশে ইনপুট দিন।
- প্রয়োজনীয় দলিলের ফাইলগুলো নির্দিষ্ট বক্সে আপলোড করুন এবং প্রাথমিক ৭০ টাকা ফি পরিশোধ করে আবেদনটি সাবমিট করুন।
৪. ট্র্যাকিং, শুনানি ও খতিয়ান ডাউনলোড
আবেদন সাবমিট হওয়ার পর একটি ট্র্যাকিং নম্বর বা আবেদন আইডি দেওয়া হবে। প্রতিটি ধাপের আপডেট এসিল্যান্ড অফিস থেকে আপনার মোবাইলে এসএমএস-এর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক নির্ধারিত শুনানির দিনে মূল দলিলপত্র নিয়ে এসিল্যান্ড অফিসে হাজিরা দিতে হবে। শুনানি সন্তোষজনক হলে ডিসিআর ফি (১,১০০ টাকা) পরিশোধের লিংক আসবে। পেমেন্ট সম্পন্ন হলেই পোর্টাল থেকে কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল নামজারি খতিয়ান সরাসরি প্রিন্ট করে নেওয়া যাবে।
ই-মিউটেশন নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: অনলাইনে নামজারি হতে সাধারণত কতদিন সময় লাগে?
উত্তর: সরকারি সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী ২৮ কর্মদিবসের মধ্যে নামজারি সম্পন্ন হওয়ার কথা। তথ্য ও কাগজপত্রে কোনো গরমিল না থাকলে সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ দিনের মধ্যেই খতিয়ান পাওয়া যায়।
প্রশ্ন: আবেদন বাতিল বা রিজেক্ট হলে কী করণীয়?
উত্তর: আদেশে সহকারী কমিশনার যে কারণ উল্লেখ করেছেন (যেমন দলিলের অস্পষ্টতা বা খতিয়ানে নামের অমিল), তা সংশোধন করে ৩০ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর কাছে আপিল করতে পারেন অথবা পুনরায় নতুন করে আবেদন করা যায়।
Post a Comment