উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য পদার্থবিজ্ঞান ১ম পত্রে নিশ্চিত এ প্লাস (A+) পাওয়ার সবচেয়ে সহজ ও লজিক্যাল অধ্যায়গুলোর অন্যতম হলো ৬ষ্ঠ অধ্যায় 'মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ' (Gravitation and Gravity)। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, দিনাজপুরসহ দেশের সকল শিক্ষা বোর্ডের বিগত পাঁচ বছরের প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বোর্ড পরীক্ষার লিখিত 'ক' বিভাগ থেকে এই একটি অধ্যায় থেকেই প্রতি বছর ১০০% নিশ্চিত অন্তত ১টি এবং কোনো কোনো বছর ২টি পূর্ণাঙ্গ সৃজনশীল প্রশ্ন (১০ থেকে ২০ নম্বর) আসে। এছাড়া বহুনির্বাচনি (MCQ) অংশে কমপক্ষে ৪ থেকে ৫টি সরাসরি প্রশ্ন থাকে এই অধ্যায় থেকে।
এই অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এখানে সূত্রের বৈচিত্র্য খুব সীমিত কিন্তু সুনির্দিষ্ট। মহাকর্ষীয় প্রাবল্য ও বিভব, ভূপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা ও গভীরতায় অভিকর্ষজ ত্বরণ $g$-এর পরিবর্তন, মুক্তিবেগ (Escape Velocity) এবং কৃত্রিম উপগ্রহের প্রদক্ষিণ বেগ ও আবর্তনকালের গাণিতিক সম্পর্কগুলো পরিষ্কার থাকলে পরীক্ষায় ফুল মার্কস তোলা অত্যন্ত সহজ। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী উপগ্রহের উচ্চতা গণনায় পৃথিবীর ব্যাসার্ধ $R$ যোগ-বিয়োগের সময় কিংবা মুক্তিবেগের সূত্রে ভর গ্রহের নাকি নিক্ষিপ্ত বস্তুর—তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে নম্বর হারায়। একজন সিনিয়র মেন্টর হিসেবে আজ আমি ২০২৬ সালের হালনাগাদ বোর্ড সিলেবাস অনুযায়ী এই অধ্যায়ের প্রতিটি মৌলিক থিওরি, শর্টকাট ডিসিশন রুল এবং একটি ১০০% বোর্ড স্ট্যান্ডার্ড পূর্ণাঙ্গ সৃজনশীল প্রশ্নের সমাধান ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দিচ্ছি:
১. নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র ও মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র প্রাবল্য ও বিভব
১৬৮৭ সালে স্যার আইজ্যাক নিউটন তাঁর অমর গ্রন্থ 'ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা'-তে মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুকণার মধ্যকার পারস্পরিক আকর্ষণ বল সংক্রান্ত বিখ্যাত মহাকর্ষ সূত্র প্রকাশ করেন:
$F = G \cdot \frac{m_1 \cdot m_2}{r^2}$
এখানে $G$ হলো সর্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক (Universal Gravitational Constant)। এসআই এককে এর সর্বসম্মত মান হলো $G = 6.673 \ imes 10^{-11}\ ext{ N}\cdot\ ext{m}^2/\ ext{kg}^2$। এর মাত্রা সমীকরণ হলো $[M^{-1} L^3 T^{-2}]$।
মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র প্রাবল্য ($E$):
মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে একক ভরের একটি বস্তুকণা স্থাপন করলে তা যে আকর্ষণ বল অনুভব করে, তাকে ঐ বিন্দুর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র প্রাবল্য (Gravitational Field Intensity) বলে। এটি একটি ভেক্টর রাশি।
$E = \frac{F}{m} = \frac{G \cdot M}{r^2}$ (একক: $\ ext{N/kg}$ বা $\ ext{m/s}^2$)
মহাকর্ষীয় বিভব ($V$):
অসীম দূরত্ব থেকে একক ভরের কোনো বস্তুকে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে আনতে মহাকর্ষ বলের দ্বারা যে পরিমাণ কাজ সম্পন্ন হয়, তাকে ঐ বিন্দুর মহাকর্ষীয় বিভব (Gravitational Potential) বলে। এটি একটি স্কেলার রাশি।
$V = -\frac{G \cdot M}{r}$ (একক: $\ ext{J/kg}$)
কেন বিভবের মান ঋণাত্মক হয়? কারণ অসীম দূরত্বে মহাকর্ষ বলের প্রভাব শূন্য হওয়ায় সেখানে বিভবকে পরম শূন্য ($V_\infty = 0$) ধরা হয়। অসীম থেকে বস্তুটি যখন কোনো ভরের দিকে আসে, তখন আকর্ষণ বলের দ্বারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ সম্পন্ন হয়, অর্থাৎ শক্তি নির্গত হয়। ফলে যেকোনো সসীম দূরত্বে বিভবের মান ঋণাত্মক হতে বাধ্য।
২. অভিকর্ষজ ত্বরণ ($g$)-এর পরিবর্তন: উচ্চতা, গভীরতা ও আহ্নিক গতি
ভূপৃষ্ঠে আদর্শ অবস্থায় অভিকর্ষজ ত্বরণ $g = \frac{GM}{R^2} \approx 9.8\ ext{ m/s}^2$। তবে স্থানভেদে তিনটি প্রধান কারণে $g$-এর মানের সুস্পষ্ট পরিবর্তন ঘটে:
| পরিবর্তনের কারণ | গাণিতিক সূত্র | ফলাফল ও বিশেষ দ্রষ্টব্য |
|---|---|---|
| ১. ভূপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতার ($h$) ক্রিয়া | $g_h = g \left(\frac{R}{R+h}\right)^2$ যদি $h \ll R$ হয়: $g_h \approx g \left(1 - \frac{2h}{R}\right)$ |
ভূপৃষ্ঠ থেকে যতই উপরে ওঠা যায়, $g$-এর মান কমতে থাকে। এভারেস্ট চূড়ায় বা বিমানে $g$ তুলনামূলক কম। |
| ২. ভূ-অভ্যন্তরে গভীরতার ($d$) ক্রিয়া | $g_d = g \left(1 - \frac{d}{R}\right)$ | ভূপৃষ্ঠ থেকে যতই মাটির নিচে বা খনিতে নামা যায়, $g$-এর মান সরলরৈখিকভাবে কমতে থাকে। পৃথিবীর কেন্দ্রে ($d = R$) $g = 0$। |
| ৩. পৃথিবীর আহ্নিক গতি ও অক্ষাংশ ($\lambda$) | $g_\lambda = g - \omega^2 R \cos^2 \lambda$ | বিষুবীয় অঞ্চলে ($\lambda = 0^\circ$) কেন্দ্রাতিগ বল সর্বোচ্চ হওয়ায় $g$ সর্বনিম্ন ($9.78\ ext{ m/s}^2$)। মেরু অঞ্চলে ($\lambda = 90^\circ$) কেন্দ্রাতিগ বল শূন্য হওয়ায় $g$ সর্বোচ্চ ($9.83\ ext{ m/s}^2$)। |
সতর্কতা (Common Exam Trap):
উচ্চতার অংক করার সময় যদি উচ্চতা $h$ মাত্র কয়েক কিলোমিটার হয় (যেমন পাহাড়ের উচ্চতা $h = 5\ ext{ km}$), তবে সন্নিকট সূত্র $g_h = g(1 - \frac{2h}{R})$ ব্যবহার করা যায়। কিন্তু উপগ্রহের ক্ষেত্রে যেখানে উচ্চতা $h = ৫০০\ ext{ km}$ বা $১০০০\ ext{ km}$ বা তার বেশি, সেখানে অবশ্যই মূল সূত্র $g_h = \frac{GM}{(R+h)^2}$ বা $g_h = g (\frac{R}{R+h})^2$ ব্যবহার করতে হবে। অন্যথায় ফলাফলে মারাত্মক ভুল হবে।
৩. মুক্তিবেগ (Escape Velocity): প্রতিপাদন ও বাস্তবিক তাৎপর্য
যে সর্বনিম্ন বেগে কোনো বস্তুকে খাড়া উপরের দিকে নিক্ষেপ করলে তা পৃথিবীর মহাকর্ষীয় আকর্ষণ কাটিয়ে অসীমে চলে যায় এবং আর কখনোই পৃথিবীতে ফিরে আসে না, তাকে মুক্তিবেগ ($v_e$) বলে।
গাণিতিক প্রতিপাদন:
ভূপৃষ্ঠ থেকে একটি $m$ ভরের বস্তুকে অসীমে পাঠাতে মহাকর্ষ বলের বিরুদ্ধে মোট কৃতকাজ হলো মহাকর্ষীয় বিভব শক্তির সমান:
$W = \int_R^\infty \frac{G \cdot M \cdot m}{r^2} dr = G M m \left[ -\frac{1}{r} \right]_R^\infty = \frac{G \cdot M \cdot m}{R}$
এই পরিমাণ কাজ সম্পন্ন করতে নিক্ষিপ্ত বস্তুকে সমপরিমাণ প্রাথমিক গতিশক্তি দিতে হবে:
$\frac{1}{2} m v_e^2 = \frac{G \cdot M \cdot m}{R} \implies v_e^2 = \frac{2GM}{R}$
$v_e = \sqrt{\frac{2GM}{R}} = \sqrt{2gR}$
মুক্তিবেগের ৫টি অতি-গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য:
- বস্তুর ভরের ওপর নির্ভর করে না: সূত্রে নিক্ষিপ্ত বস্তুর ভর $m$ অনুপস্থিত। অর্থাৎ একটি সুই নিক্ষেপ করতে যে মুক্তিবেগ লাগবে, একটি বিশ টনের রকেট পাঠাতেও ঠিক একই মুক্তিবেগ লাগবে।
- নিক্ষেপণ কোণের ওপর নির্ভর করে না: বস্তুকে খাড়া $90^\circ$ কোণে ছোড়া হোক বা $30^\circ$ কোণে ছোড়া হোক, যদি কোনো বাধা না থাকে তবে মুক্তিবেগের মান একই থাকবে।
- পৃথিবীতে মুক্তিবেগের মান: $v_e = \sqrt{2 \ imes 9.8 \ imes 6.4 \ imes 10^6} \approx 11,200\ ext{ m/s} = 11.2\ ext{ km/s}$।
- চাঁদে কেন বায়ুমণ্ডল নেই? চাঁদের ভর ও ব্যাসার্ধ কম হওয়ায় চাঁদের মুক্তিবেগ মাত্র $2.38\ ext{ km/s}$। চাঁদের পৃষ্ঠে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অণুগুলোর (যেমন অক্সিজেন, নাইট্রোজেন) মূল গড় বর্গবেগ ($v_{\ ext{rms}}$) চাঁদের মুক্তিবেগের চেয়ে বেশি। ফলে গ্যাসীয় অণুগুলো চাঁদ ছেড়ে মহাশূন্যে উড়ে চলে গেছে।
- কক্ষপথীয় বেগের সাথে সম্পর্ক: ভূপৃষ্ঠের খুব নিকট দিয়ে আবর্তনরত উপগ্রহের বেগ $v_o = \sqrt{gR}$। অতএব, $v_e = \sqrt{2} \cdot v_o \approx 1.414 \cdot v_o$ (অর্থাৎ কৃত্রিম উপগ্রহের বেগ মাত্র ৪১.৪% বাড়িয়ে দিলেই তা কক্ষপথ ছেড়ে মুক্তিবেগ নিয়ে মহাশূন্যে হারিয়ে যাবে)।
৪. কৃত্রিম উপগ্রহের প্রদক্ষিণ বেগ, উচ্চতা ও ভূ-স্থির উপগ্রহ
ভূপৃষ্ঠ থেকে $h$ উচ্চতায় $m$ ভরের একটি কৃত্রিম উপগ্রহ যখন বৃত্তাকার কক্ষপথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে, তখন কেন্দ্রমুখী বল মহাকর্ষ বলের দ্বারা যোগান পায়:
$\frac{m v^2}{R+h} = \frac{G M m}{(R+h)^2}$
১) উপগ্রহের রৈখিক বেগ (Orbital Velocity):
$v = \sqrt{\frac{GM}{R+h}}$
লক্ষ্য করুন: উচ্চতা $h$ যত বেশি হবে, উপগ্রহের প্রদক্ষিণ বেগ $v$ তত কমে যাবে।
২) উপগ্রহের আবর্তনকাল (Orbital Period):
উপগ্রহটি একবার পৃথিবীকে পূর্ণ আবর্তন করতে প্রয়োজনীয় সময়:
$T = \frac{2\pi (R+h)}{v} = \frac{2\pi (R+h)}{\sqrt{\frac{GM}{R+h}}} \implies$ $T^2 = \frac{4\pi^2}{GM} (R+h)^3$
এটি প্রমাণ করে যে কৃত্রিম উপগ্রহের আবর্তনকালের বর্গ কক্ষপথের ব্যাসার্ধের ঘনের সমানুপাতিক ($T^2 \propto r^3$), যা হুবহু কেপলারের ৩য় সূত্র।
৩) কক্ষপথের উচ্চতা ($h$) নির্ণয়ের সূত্র:
$h = \left( \frac{G M T^2}{4\pi^2} \right)^{1/3} - R$
ভূ-স্থির উপগ্রহ (Geostationary Satellite) ও পার্কিং কক্ষপথ:
যে কৃত্রিম উপগ্রহের আবর্তনকাল পৃথিবীর নিজ অক্ষের চারদিকের আহ্নিক গতির আবর্তনকালের সমান (অর্থাৎ $T = 24\ ext{ ঘণ্টা} = 86,400\ ext{ সেকেন্ড}$), তাকে পৃথিবী থেকে সর্বদা একটি নির্দিষ্ট স্থানের উপর স্থির বলে মনে হয়। একে ভূ-স্থির উপগ্রহ এবং এর বৃত্তাকার কক্ষপথকে ক্লার্কের কক্ষপথ বা পার্কিং কক্ষপথ বলে।
- ঘূর্ণনের দিক: পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে হয়।
- উচ্চতা: সূত্রে $T = 86400\ ext{ s}$ বসালে পার্কিং কক্ষপথের উচ্চতা পাওয়া যায় $h \approx 35,930\ ext{ km} \approx 3.6 \ imes 10^4\ ext{ km}$।
- ব্যবহার: টেলিভিশন সম্প্রচার, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, জিপিএস ও টেলিযোগাযোগ (যেমন: বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ একটি ভূ-স্থির যোগাযোগ উপগ্রহ)।
৫. পূর্ণাঙ্গ বোর্ড স্ট্যান্ডার্ড সৃজনশীল প্রশ্ন ও নির্ভুল সমাধান ২০২৬
উদ্দীপক:
একটি কৃত্রিম উপগ্রহের ভর $m = 600\ ext{ kg}$। উপগ্রহটি ভূপৃষ্ঠ থেকে $h = 650\ ext{ km}$ খাড়া উপরে বৃত্তাকার কক্ষপথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে।
দেওয়া আছে: পৃথিবীর ভর $M = 6.0 \ imes 10^{24}\ ext{ kg}$, পৃথিবীর ব্যাসার্ধ $R = 6.4 \ imes 10^6\ ext{ m}$, মহাকর্ষীয় ধ্রুবক $G = 6.673 \ imes 10^{-11}\ ext{ N}\cdot\ ext{m}^2/\ ext{kg}^2$ এবং ভূপৃষ্ঠে $g = 9.8\ ext{ m/s}^2$।
প্রশ্নসমূহ:
(ক) মুক্তিবেগ কাকে বলে? [১]
(খ) অসীম দূরত্বে মহাকর্ষীয় বিভব শূন্য কিন্তু কোনো সসীম দূরত্বে ঋণাত্মক হয় কেন? [২]
(গ) উদ্দীপকের কৃত্রিম উপগ্রহটির প্রদক্ষিণ বেগ ($v$) ও একবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে প্রয়োজনীয় আবর্তনকাল ($T$) নির্ণয় কর। [৩]
(ঘ) উপগ্রহটিকে কি বর্তমান কক্ষপথে রেখে ভূ-স্থির উপগ্রহ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব? গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে মতামত ব্যক্ত কর। [৪]
(ক) উত্তর:
সর্বনিম্ন যে বেগে কোনো বস্তুকে খাড়া উপরের দিকে নিক্ষেপ করলে তা গ্রহের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বল কাটিয়ে মহাশূন্যে চলে যায় এবং আর কখনোই ফিরে আসে না, তাকে ঐ গ্রহের মুক্তিবেগ (Escape Velocity) বলে।
(খ) উত্তর:
মহাকর্ষীয় বিভবের সংজ্ঞা অনুযায়ী, অসীম দূরত্ব থেকে একক ভরের কোনো বস্তুকে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে নিয়ে আসতে যে পরিমাণ কাজ সম্পন্ন হয়, তা-ই হলো ঐ বিন্দুর বিভব ($V$) বা বিভব শক্তি।
অসীম দূরত্বে দুটি বস্তুর মধ্যকার মহাকর্ষ বল কার্যকর থাকে না ($F = \frac{GMm}{\infty^2} = 0$), তাই সেখানে মহাকর্ষীয় বিভবকে শূন্য বা রেফারেন্স লেভেল ($V_\infty = 0$) ধরা হয়। অসীম থেকে বস্তুটি যখন মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কোনো সসীম দূরত্বের বিন্দুর দিকে আসে, তখন তাকে বাইরে থেকে বল প্রয়োগ করে টানতে হয় না; বরং কেন্দ্রের আকর্ষণ বলের প্রভাবেই বস্তুটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ সম্পাদন করে শক্তি নির্গমন করে। শক্তি নির্গত হওয়ার কারণে বিভব হ্রাস পেয়ে শূন্য থেকে কম, অর্থাৎ ঋণাত্মক মান ধারণ করে ($V = -\frac{GM}{r}$)।
(গ) উত্তর:
উপগ্রহটির রৈখিক বেগ ($v$) ও আবর্তনকাল ($T$) গণনা:
দেওয়া আছে,
পৃথিবীর ভর, $M = 6.0 \ imes 10^{24}\ ext{ kg}$
পৃথিবীর ব্যাসার্ধ, $R = 6.4 \ imes 10^6\ ext{ m}$
ভূপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা, $h = 650\ ext{ km} = 650 \ imes 10^3\ ext{ m} = 6.5 \ imes 10^5\ ext{ m}$
কক্ষপথের ব্যাসার্ধ, $r = R + h = (6.4 \ imes 10^6) + (6.5 \ imes 10^5) = 7.05 \ imes 10^6\ ext{ m}$
মহাকর্ষীয় ধ্রুবক, $G = 6.673 \ imes 10^{-11}\ ext{ N}\cdot\ ext{m}^2/\ ext{kg}^2$
১. প্রদক্ষিণ বেগ ($v$) নির্ণয়:
$v = \sqrt{\frac{GM}{R+h}} = \sqrt{\frac{6.673 \ imes 10^{-11} \ imes 6.0 \ imes 10^{24}}{7.05 \ imes 10^6}}$
$= \sqrt{\frac{4.0038 \ imes 10^{14}}{7.05 \ imes 10^6}} = \sqrt{56,791,489.36}$
$v \approx 7535.95\ ext{ m/s} = 7.536\ ext{ km/s}$
২. আবর্তনকাল ($T$) নির্ণয়:
$T = \frac{2\pi (R+h)}{v} = \frac{2 \ imes 3.1416 \ imes 7.05 \ imes 10^6}{7535.95}$
$= \frac{44,296,560}{7535.95} \approx 5878.03\ ext{ সেকেন্ড}$
মিনিটে রূপান্তর করলে: $T = \frac{5878.03}{60} \approx 97.97\ ext{ মিনিট} \approx 1.63\ ext{ ঘণ্টা}$।
উত্তর: উপগ্রহটির প্রদক্ষিণ বেগ $7.536\ ext{ km/s}$ এবং আবর্তনকাল $5878.03\ ext{ সেকেন্ড}$ (বা প্রায় ৯৭.৯৭ মিনিট)।
(ঘ) উত্তর:
উপগ্রহটিকে ভূ-স্থির উপগ্রহ হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ:
কোনো কৃত্রিম উপগ্রহকে পৃথিবী থেকে স্থির দেখতে হলে (ভূ-স্থির উপগ্রহ হতে হলে) তার নিজ কক্ষপথে আবর্তনকাল অবশ্যই পৃথিবীর নিজ অক্ষের আহ্নিক গতির আবর্তনকালের সমান হতে হবে। অর্থাৎ উপগ্রহটির আবর্তনকাল হতে হবে:
$T = 24\ ext{ ঘণ্টা} = 24 \ imes 3600\ ext{ সেকেন্ড} = 86,400\ ext{ সেকেন্ড}$।
কেপলারের ৩য় সূত্র অনুসারে উপগ্রহের আবর্তনকাল ও কক্ষপথের উচ্চতার সম্পর্ক:
$T^2 = \frac{4\pi^2}{GM} (R + h')^3$
বা, $(R + h')^3 = \frac{G M T^2}{4\pi^2}$
বা, $R + h' = \left( \frac{G M T^2}{4\pi^2} \right)^{1/3}$
বা, $h' = \left( \frac{G M T^2}{4\pi^2} \right)^{1/3} - R$
ভূ-স্থির উপগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় মান বসিয়ে পাই:
$h' = \left( \frac{6.673 \ imes 10^{-11} \ imes 6.0 \ imes 10^{24} \ imes (86400)^2}{4 \ imes (3.1416)^2} \right)^{1/3} - 6.4 \ imes 10^6$
$= \left( \frac{4.0038 \ imes 10^{14} \ imes 7.46496 \ imes 10^9}{39.4784} \right)^{1/3} - 6.4 \ imes 10^6$
$= \left( \frac{2.98882 \ imes 10^{24}}{39.4784} \right)^{1/3} - 6.4 \ imes 10^6$
$= (7.57077 \ imes 10^{22})^{1/3} - 6.4 \ imes 10^6$
$= 4.2304 \ imes 10^7 - 6.4 \ imes 10^6$
$= 3.5904 \ imes 10^7\ ext{ m} = 35,904\ ext{ km}$
গাণিতিক যুক্তি ও সিদ্ধান্ত:
গাণিতিক হিসাব থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, একটি উপগ্রহকে ভূ-স্থির হতে হলে তাকে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় $35,904\ ext{ km}$ (বা প্রায় $3.6 \ imes 10^4\ ext{ km}$) উচ্চতায় স্থাপন করতে হয়।
কিন্তু উদ্দীপকে উল্লিখিত উপগ্রহটির বর্তমান উচ্চতা মাত্র $h = 650\ ext{ km}$, যার আবর্তনকাল মাত্র ৯৭.৯৭ মিনিট। এই অবস্থায় এটি পৃথিবীর আহ্নিক গতির চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে আবর্তন করবে এবং পৃথিবী থেকে একে কখনোই নির্দিষ্ট কোনো স্থানের উপর স্থির দেখা যাবে না।
চূড়ান্ত মন্তব্য: অতএব, উপগ্রহটিকে বর্তমান কক্ষপথে ($650\ ext{ km}$ উচ্চতায়) রেখে ভূ-স্থির উপগ্রহ হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একে ভূ-স্থির উপগ্রহ করতে হলে এর উচ্চতা বৃদ্ধি করে প্রায় ৩৫,৯০৪ কিলোমিটারের পার্কিং কক্ষপথে উন্নীত করতে হবে।
৬. পরীক্ষার খাতায় বেশি নম্বর নিশ্চিত করার ৭টি বিশেষ টিপস
- কিলোমিটারকে মিটারে রূপান্তর: প্রশ্নে ব্যাসার্ধ $R$ এবং উচ্চতা $h$ সাধারণত কিলোমিটারে ($ ext{km}$) দেওয়া থাকে। অংক শুরুর আগেই $10^3$ দিয়ে গুণ করে মিটারে ($ ext{m}$) রূপান্তর করে নেবেন।
- আবর্তনকাল সেকেন্ডে হিসাব: সময় ২৪ ঘণ্টা বা মিনিটে দেওয়া থাকলে সবসময় সেকেন্ডে রূপান্তর করে সূত্রে বসাবেন ($1\ ext{ hr} = 3600\ ext{ s}$)।
- $g$ এবং $G$-এর পার্থক্য: $g$ হলো অভিকর্ষজ ত্বরণ (ভেক্টর, স্থানভেদে পরিবর্তনশীল), আর $G$ হলো সর্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক (স্কেলার, সর্বত্র ধ্রুবক)। এদের একক ও সংজ্ঞায় কখনোই তালগোল পাকাবেন না।
- সন্নিকট সূত্রের সঠিক ব্যবহার: উচ্চতা যদি ব্যাসার্ধের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হয় ($h > 100\ ext{ km}$), তবে কখনোই $g_h = g(1 - 2h/R)$ ব্যবহার করবেন না; সবসময় মূল সূত্র $g_h = g (\frac{R}{R+h})^2$ ব্যবহার করবেন।
- মুক্তিবেগের ভর বিভ্রান্তি: মনে রাখবেন, মুক্তিবেগ $v_e = \sqrt{\frac{2GM}{R}}$-এ $M$ হলো গ্রহের ভর, নিক্ষিপ্ত বস্তুর ভর নয়।
- ক্যালকুলেটরের ব্র্যাকেট সতর্কতা: সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটরে ঘাত যেমন $(...)^{1/3}$ করার সময় পুরো ভিতরের মানটিকে বন্ধনীর ভেতরে রেখে টু-দ্য-পাওয়ার $(1/3)$ চাপবেন।
- একক লিখতে ভুলবেন না: বেগের একক $\ ext{m/s}$ বা $\ ext{km/s}$, উচ্চতার একক $\ ext{m}$ বা $\ ext{km}$, এবং আবর্তনকালের একক সেকেন্ড বা ঘণ্টা স্পষ্টভাবে লিখবেন।
৭. মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ সংক্রান্ত সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. কৃত্রিম উপগ্রহের ভেতরে নভোচারীরা ওজনহীনতা অনুভব করেন কেন?
কৃত্রিম উপগ্রহের অভ্যন্তরে অভিকর্ষ বল শূন্য হয় না; বরং উপগ্রহ এবং নভোচারী উভয়েই একই ত্বরণে ($g_h$) অনবরত পৃথিবীর দিকে মুক্তভাবে পড়তে থাকে। ফলে নভোচারীর পায়ের নিচে মেঝের কোনো প্রতিক্রিয়া বল (Reaction Force, $R = m(g-a) = m(g_h - g_h) = 0$) থাকে না। প্রতিক্রিয়া বলের অনুপস্থিতির কারণেই নভোচারীরা ওজনহীনতা বা ভাসমান অবস্থা অনুভব করেন।
২. পৃথিবীর ঘূর্ণন হঠাৎ থেমে গেলে বিষুবীয় অঞ্চলে বস্তুর ওজনের কী পরিবর্তন হবে?
আহ্নিক গতির সূত্রে $g_\lambda = g - \omega^2 R \cos^2 \lambda$। পৃথিবী ঘূর্ণন বন্ধ করলে কৌণিক বেগ $\omega = 0$ হয়ে যাবে। ফলে বিষুবীয় অঞ্চলে ($\lambda = 0^\circ$) কেন্দ্রাতিগ বলের কারণে যে পরিমাণ $g$ কমে গিয়েছিল তা আর কমবে না, অর্থাৎ $g_\lambda = g$ হবে। ফলে বিষুবীয় অঞ্চলে বস্তুর ওজন কিছুটা বৃদ্ধি পাবে। তবে মেরু অঞ্চলে ($\lambda = 90^\circ$) কোনো পরিবর্তন হবে না।
৩. পোলার উপগ্রহ (Polar Satellite) কী এবং এর কাজ কী?
যেসব কৃত্রিম উপগ্রহ তুলনামূলক কম উচ্চতায় (প্রায় ৫০০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার) পৃথিবীর উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু বরাবর লম্বালম্বি আবর্তন করে, তাদের পোলার উপগ্রহ বলে। এরা সাধারণত দেড় থেকে দুই ঘণ্টায় একবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে এবং রিমোট সেন্সিং, আবহাওয়ার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও সামরিক গোয়েন্দা নজরদারিতে ব্যবহৃত হয়।
৪. মহাকর্ষ বল ও তড়িৎ বলের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
মহাকর্ষ বল ভরের কারণে সৃষ্টি হয় এবং এটি সবসময় কেবল আকর্ষণধর্মী। অপরদিকে তড়িৎ বল চার্জের কারণে সৃষ্টি হয় এবং এটি আকর্ষণ বা বিকর্ষণ উভয়ধর্মী হতে পারে। এছাড়া তড়িৎ বল মহাকর্ষ বলের চেয়ে বহু কোটি গুণ বেশি শক্তিশালী।
৫. কোনো বস্তুকে পৃথিবীর কেন্দ্রে নিয়ে গেলে তার ভর ও ওজনের কী হবে?
বস্তুর ভর ($m$) হলো পদার্থের মৌলিক সত্ত্বা, তাই কেন্দ্রেও ভরের কোনো পরিবর্তন হবে না। কিন্তু পৃথিবীর কেন্দ্রে গভীরতা $d = R$ হওয়ায় অভিকর্ষজ ত্বরণ $g = 0$ হয়ে যায়। ফলে কেন্দ্রে বস্তুর ওজন $W = m \ imes 0 = 0$ বা শূন্য হবে।
Post a Comment