ই-পাসপোর্ট অনলাইন আবেদন ও পুলিশ ভেরিফিকেশন গাইড ২০২৬: নতুন পাসপোর্ট, রিনিউ ও ফি জমা দেওয়ার নিয়ম

Bangladesh e-Passport Online Application Police Verification Fee Structure Guide 2026

উচ্চশিক্ষা, চাকরি, চিকিৎসা কিংবা ভ্রমণের জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো একটি বৈধ আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট। বাংলাদেশ সরকারের ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর কর্তৃক প্রবর্তিত আধুনিক চিপযুক্ত ই-পাসপোর্ট (e-Passport) সেবা সম্পূর্ণ ডিজিটাল হওয়ার কারণে এখন আর পাসপোর্টের জন্য কোনো দালালের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের স্মার্টফোন বা কম্পিউটার থেকে ঘরে বসেই সরকারি পোর্টালে তথ্য পূরণ করে, অনলাইনে ফি জমা দিয়ে সরাসরি পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ ও ছবি) দিয়ে আসা যায়। তবে আবেদন ফর্মে সামান্য বানান ভুল, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার অমিল কিংবা পুলিশ ভেরিফিকেশনে (Police Verification) প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতির কারণে অনেকের পাসপোর্ট মাসের পর মাস আটকে থাকে। ২০২৬ সালের হালনাগাদ সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী নতুন ই-পাসপোর্ট আবেদন, রি-ইস্যু বা রিনিউ করার নিয়ম, পৃষ্ঠা ও মেয়াদভিত্তিক ফি কাঠামো এবং ঝামেলামুক্ত পুলিশ ভেরিফিকেশনের সম্পূর্ণ গাইড নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

১. আবেদনের পূর্বশর্ত ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেকলিস্ট

অনলাইন ফর্ম পূরণ শুরু করার আগে নিচের ডকুমেন্টগুলোর মূল কপি ও স্পষ্ট ফটোকপি প্রস্তুত রাখুন:

  1. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): মূল জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি (১৮ বছরের নিচে হলে অনলাইন ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ বা BRC)।
  2. নাগরিকত্ব ও চারিত্রিক সনদ: ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক ইস্যুকৃত মূল প্রত্যয়নপত্র।
  3. বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ: বর্তমান ঠিকানার ইউটিলিটি বিলের কপি (গ্যাস, বিদ্যুৎ বা পানির বিল)।
  4. পেশাগত প্রমাণপত্র: চাকরিজীবী হলে অফিসিয়াল আইডি কার্ড/এনওসি (NOC), শিক্ষার্থী হলে স্টুডেন্ট আইডি ও প্রশংসাপত্র, ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার/আইনজীবী হলে প্রফেশনাল কাউন্সিল সনদ।
  5. রি-ইস্যু বা রিনিউয়ের ক্ষেত্রে: পূর্ববর্তী মূল পাসপোর্ট এবং এর তথ্য পাতার (Data Page) ফটোকপি।

২. ধাপ ১: অফিশিয়াল পোর্টালে অ্যাকাউন্ট খোলা ও ফরম পূরণ

  1. প্রথমে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের একমাত্র সরকারি ওয়েবসাইট epassport.gov.bd-এ প্রবেশ করুন।
  2. 'Apply online for e-Passport' অপশনে ক্লিক করে আপনার বর্তমান ঠিকানা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জেলা ও নিকটস্থ পাসপোর্ট অফিস নির্বাচন করুন।
  3. আপনার সক্রিয় ইমেইল ও মোবাইল নম্বর দিয়ে ওটিপি ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করে একটি নতুন অ্যাকাউন্ট রেজিস্টার করুন।
  4. ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ: নিজের নাম, পিতা ও মাতার নাম হুবহু জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)-এর সাথে মিলিয়ে ইংরেজিতে বড় হাতের অক্ষরে লিখুন। বৈবাহিক অবস্থা, পেশা এবং জরুরি যোগাযোগের ঠিকানা (Emergency Contact) নির্ভুলভাবে দিন।

৩. ধাপ ২: ই-পাসপোর্ট ফি কাঠামো ২০২৬ (ব্যাংক ও অনলাইন পেমেন্ট)

বাংলাদেশে ই-পাসপোর্টের সরকারি ফি ভ্যাটসহ নির্ধারিত রয়েছে:

পাসপোর্টের পৃষ্ঠা ও মেয়াদনিয়মিত ফি (Regular - ১৫ কর্মদিবস)জরুরি ফি (Express - ৭ কর্মদিবস)অতি জরুরি ফি (Super Express - ২ কর্মদিবস)
৪৮ পৃষ্ঠা, ৫ বছর মেয়াদী৪,০২৫/- টাকা৬,৩২৫/- টাকা৮,৬২৫/- টাকা
৪৮ পৃষ্ঠা, ১০ বছর মেয়াদী৫,৭৫০/- টাকা৮,০৫০/- টাকা১০,৩৫০/- টাকা
৬৪ পৃষ্ঠা, ৫ বছর মেয়াদী৬,৩২৫/- টাকা৮,৬২৫/- টাকা১২,০৭৫/- টাকা
৬৪ পৃষ্ঠা, ১০ বছর মেয়াদী৮,০৫০/- টাকা১০,৩৫০/- টাকা১৩,৮০০/- টাকা

ফি পরিশোধের উপায়: সোনালী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংকের যেকোনো শাখায় স্বশরীরে গিয়ে অথবা পোর্টালে থাকা সরকারি 'A-Challan' বা 'Ekpay' গেটওয়ের মাধ্যমে বিকাশ, নগদ, রকেট বা ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ঘরে বসেই ফি পরিশোধ করা যায়

৪. ধাপ ৩: পাসপোর্ট অফিসে বায়োমেট্রিক অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও ছবি তোলার দিন

অনলাইন ফর্ম পূরণ ও ফি জমা হলে সিস্টেম থেকে একটি Application Summary এবং Online Registration Form জেনারেট হবে। এটি ৩ পাতার রঙিন প্রিন্ট করে নিন।

  • নির্ধারিত দিনে সকাল সকাল পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হন।
  • পোশাকের সতর্কতা: ছবি তোলার সময় সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড থাকে, তাই কালো বা গাঢ় রঙের কলারযুক্ত শার্ট/পোশাক পরে যান। কোনো সাদা বা অতি হালকা পোশাক পরবেন না। কন্টাক্ট লেন্স ও চশমা খুলে ছবি তুলতে হবে।
  • অফিসের সংশ্লিষ্ট কাউন্টারে আপনার ১০ আঙুলের ছাপ (Biometric Fingerprint), চোখের আইরিশ স্ক্যান ও ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর নেওয়া হবে। সবশেষে আপনাকে একটি ডেলিভারি স্লিপ (Delivery Slip) দেওয়া হবে, যা পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৫. ধাপ ৪: পুলিশ ভেরিফিকেশন (Police Verification) ঝামেলামুক্ত করার কৌশল

সাধারণত বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হওয়ার ৩ থেকে ৫ কার্যদিবসের মধ্যে আপনার এলাকার স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB Police) বা ডিএসবি অফিস থেকে তদন্ত কর্মকর্তা আপনাকে ফোন করবেন:

  1. তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে কথা বলে তিনি থানায় ডাকলে বা বাসায় এলে সব ডকুমেন্টের মূল কপি ও ১ সেট সত্যায়িত ফটোকপি সাথে রাখুন।
  2. এনআইডি কার্ড, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, বিদ্যুৎ বিলের কপি এবং স্থানীয় ভোটার তালিকায় নিজের বা পিতার নাম থাকা পেজের ফটোকপি প্রস্তুত রাখুন।
  3. আপনার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা বা ওয়ারেন্ট না থাকলে পুলিশ ভেরিফিকেশনে কোনো সমস্যা হয় না। তদন্ত শেষ হলে কর্মকর্তা পাসপোর্ট সার্ভারে 'Positive Report' সাবমিট করবেন।

৬. অনলাইন স্ট্যাটাস ট্র্যাকিং ও পাসপোর্ট সংগ্রহ

পাসপোর্ট কোন পর্যায়ে আছে তা জানতে epassport.gov.bd সাইটে গিয়ে 'Check Status' অপশনে আপনার Online Registration ID (OID) অথবা Application ID দিন। যখন স্ট্যাটাসে "Passport is ready for issuance" দেখাবে এবং মোবাইলে ডেলিভারির এসএমএস আসবে, তখন ডেলিভারি স্লিপ ও মূল এনআইডি নিয়ে অফিসে গিয়ে নিজের ই-পাসপোর্ট সংগ্রহ করুন।

আবেদনকারীদের সাধারণ ভুলত্রুটি (Common Mistakes)

অনেকেই এনআইডি কার্ডের সাথে পাসপোর্টের বানানে অমিল রাখেন—মনে রাখবেন ই-পাসপোর্ট সার্ভার সরাসরি নির্বাচন কমিশনের এনআইডি ডাটাবেজের সাথে লিংক করা; সামান্য একটি অক্ষরের অমিল হলেও আবেদন আটকে যাবে। এছাড়া বর্তমান ঠিকানা হিসেবে এমন কোনো মেস বা ভাড়া বাসার ঠিকানা দেওয়া যেখানে নিজের কোনো ইউটিলিটি বিল নেই, পুলিশ ভেরিফিকেশনে বড় বিপত্তি তৈরি করে; বর্তমান ঠিকানায় অন্তত এক বছরের স্থায়ী বা প্রমাণযোগ্য অবস্থান থাকা প্রয়োজন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন: পুরনো এমআরপি পাসপোর্ট থাকলে কি পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগবে?

উত্তর: যদি আগের এমআরপি (Machine Readable Passport) পাসপোর্টের সকল তথ্য (নাম, পিতা-মাতার নাম ও স্থায়ী ঠিকানা) হুবহু একই থাকে, তবে রি-ইস্যু বা ই-পাসপোর্টে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সাধারণত নতুন করে পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগে না।

প্রশ্ন: কত বছর বয়সের জন্য ১০ বছর মেয়াদী পাসপোর্ট পাওয়া যায়?

উত্তর: ১৮ বছরের বেশি এবং ৬৫ বছরের কম বয়সী নাগরিকগণ ১০ বছর মেয়াদী পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারেন। ১৮ বছরের নিচে এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের জন্য কেবল ৫ বছর মেয়াদী পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়।

Post a Comment

Previous Post Next Post