দালালের চক্করে না পড়ে কিংবা কোনো অতিরিক্ত টাকা খরচ না করে এখন সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় ঘরে বসেই ই-পাসপোর্ট (E-Passport) তৈরি করা সম্ভব। তবে অনলাইনে আবেদন যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে আবেদনপত্র পূরণের সময় ছোটখাটো ভুল বা পুলিশ ভেরিফিকেশনের নিয়ম না জানার কারণে অনেকের ফাইল মাসের পর মাস আটকে থাকে। আমি নিজে আবেদন করার সময় এবং পরবর্তীতে পরিচিত অনেকের পাসপোর্ট করানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মানলে কোনো ভোগান্তি ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ে পাসপোর্ট হাতে পাওয়া যায়। ২০২৬ সালের হালনাগাদ নিয়ম অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে জেনে নেওয়া যাক।
১. আবেদনের পূর্বশর্ত: তথ্যের শতভাগ মিল থাকা বাধ্যতামূলক
ই-পাসপোর্ট সিস্টেমে আবেদনকারীর তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) সার্ভারের সাথে যাচাই করা হয়। তাই আবেদন করার আগে খেয়াল রাখুন:
- আপনার নিজের নাম, পিতা-মাতার নাম এবং জন্মতারিখ যেন হুবহু স্মার্ট কার্ড বা এনআইডির সাথে মিলে। এমনকি স্পেস বা ডটের অমিল থাকলেও আবেদন গ্রহণ করবে না।
- ১৮ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ (১৭ ডিজিটের) এবং পিতা-মাতার এনআইডি কার্ড প্রয়োজন হবে।
- বিবাহিত হলে ম্যারেজ সার্টিফিকেট বা নিকাহনামা সাথে রাখা ভালো, বিশেষ করে যদি স্পাউসের নাম যুক্ত করতে চান।
২. অনলাইন ফর্ম পূরণ ও সঠিক ক্যাটাগরি নির্বাচন
বাংলাদেশ সরকারের অফিশিয়াল পোর্টাল epassport.gov.bd-এ গিয়ে প্রথমে একটি অ্যাকাউন্ট খুলুন। ফর্ম পূরণের সময় যেসব বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন:
- পাসপোর্টের মেয়াদ ও পৃষ্ঠা: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১০ বছর মেয়াদী ৪৮ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও জনপ্রিয়। ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে ৬৪ পৃষ্ঠা বেছে নিতে পারেন।
- ঠিকানা নির্বাচন: বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা যদি আলাদা হয়, তবে আপনি যে এলাকার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করতে চান, বর্তমান ঠিকানায় সেই এলাকার ঠিকানা দিন। মনে রাখবেন, ঠিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দুটি ঠিকানাতেই ভেরিফিকেশন হতে পারে।
- জরুরি যোগাযোগ (Emergency Contact): এখানে নির্ভরযোগ্য পিতা-মাতা, ভাই-বোন বা নিকটাত্মীয়ের নাম ও কার্যকর ফোন নম্বর দিন।
৩. সরকারি ফি পরিশোধের নিরাপদ উপায়
ই-পাসপোর্টের নির্ধারিত সরকারি ফি সরাসরি চালান (A-Challan) এর মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক অথবা মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ/রকেটের মাধ্যমে জমা দেওয়া যায়। ফি দেওয়ার পর প্রাপ্ত চালানের স্লিপ বা ট্রানজেকশন আইডি যত্ন করে সংরক্ষণ করুন। ৪৮ পৃষ্ঠা ৫ বছর মেয়াদে নিয়মিত ফি ৪,০২৫ টাকা এবং ১০ বছর মেয়াদে ৫,৭৫০ টাকা (১৫% ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত)।
৪. পুলিশ ভেরিফিকেশন সহজে সম্পন্ন করার বাস্তব টিপস
অনেকের মনে পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে অহেতুক ভয় কাজ করে। বাস্তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা (SB বা বিশেষ শাখার অফিসার) শুধু আপনার জাতীয়তা এবং ফৌজদারি কোনো অপরাধের রেকর্ড আছে কি না তা নিশ্চিত করেন। ভেরিফিকেশন দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত করতে যা করবেন:
- অফিসার কল দিলে নির্ধারিত দিনে হাসিমুখে দেখা করুন এবং সব ডকুমেন্টের এক সেট পরিষ্কার ফটোকপি আলাদা ফাইলে সাজিয়ে রাখুন।
- সাধারণত যেসব কাগজ চাওয়া হয়: আপনার এনআইডি ও অনলাইন জন্ম সনদ, পিতা-মাতার এনআইডি, বর্তমান ঠিকানার ইউটিলিটি বিলের কপি (গ্যাস/বিদ্যুৎ বিল), এবং আপনি শিক্ষার্থী হলে আইডি কার্ড বা চাকুরিজীবী হলে অফিস আইডির কপি।
- স্থায়ী ঠিকানার ক্ষেত্রে স্থানীয় চেয়ারম্যান বা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রশংসাপত্র বা ওয়ারিশান সনদ চাওয়া হতে পারে।
৫. সাধারণ ভুল ও সতর্কতা (Common Mistakes to Avoid)
অধিকাংশ আবেদনকারী যে ভুলটি করেন তা হলো—আবেদনপত্র সাবমিট করার পর তা প্রিন্ট না নিয়ে তাড়াহুড়ো করে এডিট করতে চান। ফাইনাল সাবমিটের আগে অন্তত দুইবার তথ্য মিলিয়ে নিন। একবার সাবমিট হয়ে গেলে নাম বা জন্মতারিখ কিন্তু পাসপোর্ট অফিস ছাড়া সংশোধন করা যায় না।
ই-পাসপোর্ট নিয়ে সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: পাসপোর্ট ডেলিভারি পেতে কতদিন সময় লাগে?
উত্তর: নিয়মিত (Regular) ডেলিভারির ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলার দিন থেকে সাধারণত ১৫ থেকে ২১ কর্মদিবস লাগে। জরুরি (Express) ডেলিভারির ক্ষেত্রে ৭ থেকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে পাওয়া যায়।
প্রশ্ন: পুলিশ ভেরিফিকেশন কি সবার জন্যই বাধ্যতামূলক?
উত্তর: প্রথমবার নতুন পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক। তবে পাসপোর্ট রিনিউ বা রি-ইস্যুর ক্ষেত্রে যদি তথ্যের কোনো বড় পরিবর্তন না থাকে, তবে সাধারণত ভেরিফিকেশন লাগে না।
Post a Comment