দেশের বাজারে আবারও এক লাফে বাড়ল মহামূল্যবান ধাতুর দাম। আন্তর্জাতিক বাজারে গোল্ডের অস্থিরতা এবং স্থানীয় বুলিয়ন মার্কেটে খাঁটি সোনা বা তেজাবি স্বর্ণের (Pure Gold) মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বাজারে সব ক্যারেটের স্বর্ণের দাম বাড়ানোর বড় ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস বা BAJUS)। বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের জরুরি বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ভরিতে ১ হাজার ৬৯১ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬২১ টাকায়। আজ রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দেশব্যাপী সকল বৈধ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে এই নতুন মূল্য তালিকা কার্যকর রয়েছে। আপনি যদি ব্যক্তিগত ব্যবহার, পারিবারিক বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠান কিংবা ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার জন্য নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা বা গহনা কেনার পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে আজকের হালনাগাদ রেট, গ্রাম ও আনাভিত্তিক বিভাজন এবং জুয়েলার্সদের অতিরিক্ত মুনাফার ফাঁদ এড়ানোর সঠিক হিসাবটি জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
১. বাজুস নির্ধারিত আজকের স্বর্ণের রেট (২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬)
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের অফিশিয়াল বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বিভিন্ন ক্যারেটের হলমার্কযুক্ত স্বর্ণের ভরি ও গ্রামভিত্তিক নতুন বিক্রয়মূল্য নিচে টেবিলে তুলে ধরা হলো:
| স্বর্ণের মান (ক্যারেট) | প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) | প্রতি গ্রাম | পূর্বের তুলনায় পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| ২২ ক্যারেট (হলমার্ক ৯১৬) | ২,৩৪,৬২১ টাকা | ২০,১১৪.৯৯ টাকা | +১,৬৯১ টাকা বৃদ্ধি |
| ২১ ক্যারেট (হলমার্ক ৮৭৫) | ২,২৪,০৬৫ টাকা | ১৯,২০৮.৮৩ টাকা | +১,৫৭৫ টাকা বৃদ্ধি |
| ১৮ ক্যারেট (হলমার্ক ৭৫০) | ১,৯২,৩৯৭ টাকা | ১৬,৪৯৪.১৬ টাকা | +১,৩৪১ টাকা বৃদ্ধি |
| সনাতন পদ্ধতি | ১,৫৭,১৭২ টাকা | ১৩,৪৭৪.৯৭ টাকা | +১,১০৮ টাকা বৃদ্ধি |
*বিশেষ দ্রষ্টব্য: বাংলাদেশ সরকারের প্রচলিত ওজন পরিমাপ পদ্ধতি অনুযায়ী ১ ভরি সমান ঠিক ১১.৬৬৪ গ্রাম।
২. এক নজরে ২২ ক্যারেট সোনার আনা ও রতিভিত্তিক হিসাব
আমাদের দেশে সাধারণত গলার চেইন, আংটি বা কানের দুল কেনার সময় ভরি ছাড়াও আনা এবং রতির হিসাবে দরদাম করা হয়। অনেকেই ১ আনা বা ১ রতির নিখুঁত হিসাব না জানায় দোকানে গিয়ে ঠকে যান। আপনার সুবিধার্থে ২২ ক্যারেটের বর্তমান দাম অনুযায়ী বিস্তারিত হিসাব নিচে দেওয়া হলো:
- ১ ভরি = ১৬ আনা = ৯৬ রতি = ১১.৬৬৪ গ্রাম।
- ১ আনা সোনার দাম: প্রায় ১৪,৬৬৪ টাকা (১৪,৬৬৩.৮১ টাকা)।
- ১ রতি সোনার দাম: প্রায় ২,৪৪৪ টাকা (২,৪৪৩.৯৭ টাকা)।
- ৮ আনা (আধা ভরি) সোনার দাম: ১,১৭,৩১০.৫০ টাকা।
- ৪ আনা (এক পোয়া) সোনার দাম: ৫৮,৬৫৫.২৫ টাকা।
- ১০ গ্রাম সোনার দাম: ২,০১,১৫০ টাকা।
৩. স্বর্ণের দাম কেন বাড়ছে? বাজার বিশ্লেষণ
হঠাৎ করে স্বর্ণের বাজারে এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে বেশ কিছু জাতীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাবক কাজ করছে:
- তেজাবি স্বর্ণের তীব্র সংকট: দেশের অভ্যন্তরীণ পাইকারি বুলিয়ন মার্কেটে খাঁটি বা পাকা সোনার (Raw Gold Bullion) জোগান কমে যাওয়ায় দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। জুয়েলারি মালিকদের অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দিয়ে গোল্ড সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
- আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ বিনিয়োগের চাপ: মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার সংক্রান্ত পূর্বাভাস এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা ডলার ও শেয়ার ছেড়ে স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয় (Safe Haven Asset) হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। ফলে স্পট গোল্ডের দাম প্রতি আউন্সে বিশ্ববাজারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
- ডলারের বিনিময় হার: ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ এবং আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর আন্তর্জাতিক বিনিময় হারের চাপও স্থানীয় স্বর্ণের দাম বাড়াতে জ্বালানি জুগিয়েছে।
৪. জুয়েলারি দোকান থেকে গহনা কেনার আসল খরচ যেভাবে হিসাব করবেন
অনেকেই মনে করেন, বাজুস নির্ধারিত ভরি প্রতি দাম পরিশোধ করলেই গহনা কেনা হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে একটি স্বর্ণের অলংকার বানাতে গেলে তিনটি আলাদা অংশ যোগ করে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারিত হয়:
চূড়ান্ত অলংকার ক্রয়মূল্য = (সোনার খাঁটি ওজন × প্রতি গ্রামের দাম) + গহনার মজুরি (Making Charge) + ৫% সরকারি ভ্যাট (VAT)
উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি ২২ ক্যারেটের ৫ গ্রাম ওজনের একটি আংটি তৈরি করেন:
- স্বর্ণের আসল মূল্য: ৫ গ্রাম × ২০,১১৪.৯৯ টাকা = ১,০০,৫৭৫ টাকা।
- মজুরি বা মেকিং চার্জ: বাজুসের নিয়ম অনুযায়ী অলংকারের ডিজাইন ভেদে প্রতি গ্রামে সর্বনিম্ন ৩৫০ টাকা থেকে ৭০০+ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ৫ গ্রামের জন্য গড়ে ৫০০ টাকা হিসেবে মজুরি = ২,৫০০ টাকা।
- উপমোট (সোনার দাম + মজুরি): ১,০০,৫৭৫ + ২,৫০০ = ১,০৩,০৭৫ টাকা।
- ৫% সরকারি ভ্যাট: ১,০৩,০৭৫ টাকার ৫% = ৫,১৫৪ টাকা।
- আপনাকে মোট পরিশোধ করতে হবে: ১,০৩,০৭৫ + ৫,১৫৪ = ১,০৮,২২৯ টাকা।
সতর্কতা: কোনো বিক্রেতা যদি সোনার মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত ভ্যাট দাবি করে কিংবা রসিদে ভ্যাটের নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ না করে, তবে অবিলম্বে আপত্তি জানান। সবসময় কম্পিউটারাইজড ক্যাশ মেমো গ্রহণ করুন।
৫. পুরোনো সোনা বিক্রয় ও এক্সচেঞ্জে বাজুসের অফিশিয়াল কাটিং নিয়ম
ঘরে থাকা পুরোনো গহনা বিক্রি করে নগদ টাকা নিতে চাইলে কিংবা পুরোনো গহনা বদলে নতুন ডিজাইনের গহনা বানাতে গেলে বাজুসের সুনির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড রিডাকশন পলিসি রয়েছে:
- পুরোনো সোনা এক্সচেঞ্জ (বদলে নতুন গহনা নেওয়া): আপনি যে ওজনের সোনা দিচ্ছেন, তার ওপর থেকে মজুরি ও পাথরের ওজন বাদ দিয়ে মূল সোনার মূল্যের ১২% কর্তন (Deduction) করা হবে। বাকি ৮৮% মূল্যের সমপরিমাণ টাকা নতুন অলংকারের সাথে সমন্বয় হবে।
- পুরোনো সোনা সরাসরি বিক্রয় (Cash Out): আপনি যদি কোনো গহনা স্থায়ীভাবে দোকানে বিক্রি করে নগদ ক্যাশ টাকা নিতে চান, তবে জুয়েলার্স সমিতি কর্তৃক নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে ১৮% কর্তন প্রযোজ্য হবে।
- পাথর ও মুক্তার ওজন বাদ: গহনায় যদি কোনো রত্নপাথর, কুন্দন বা মুক্তা বসানো থাকে, তবে ক্রয়ের সময় কখনোই পাথরের ওজনকে সোনার দামে কিনবেন না। বিক্রির সময় দোকানদার পাথর খুলে শুধুমাত্র নিখাদ সোনার ওজন মাপবে।
৬. খাঁটি সোনা চেনার ৭টি পরীক্ষিত উপায় ও হলমার্ক যাচাই
সোনার বাজারে প্রতারণা এড়াতে নিচে উল্লেখিত প্রযুক্তিগত ও ব্যবহারিক বিষয়গুলো সর্বদা যাচাই করুন:
- লেজার খোদাইকৃত হলমার্ক কোড (Hallmark Certification): সরকারি অনুমোদিত ল্যাবরেটরি থেকে টেস্ট করা অলংকারে ভেতরভাগে মাইক্রো-লেজারে কোড লেখা থাকে। ২২ ক্যারেটের ক্ষেত্রে '916', ২১ ক্যারেটের ক্ষেত্রে '875' এবং ১৮ ক্যারেটের ক্ষেত্রে '750' খোদাই করা থাকবে। এটি না থাকলে সেই সোনা কেনা থেকে বিরত থাকুন।
- চৌম্বক পরীক্ষা (Magnet Test): খাঁটি সোনা ডায়াম্যাগনেটিক অর্থাৎ এটি কখনোই চুম্বক দ্বারা আকর্ষিত হয় না। শক্তিশালী নিওডাইমিয়াম চুম্বক গহনার কাছে ধরলে যদি সামান্যতম আকর্ষণও অনুভূত হয়, তবে নিশ্চিত থাকুন তাতে লোহা বা নিকেলের খাদ মেশানো রয়েছে।
- সিরামিক স্ক্র্যাচ পরীক্ষা: একটি আনগ্লেজড সিরামিক টাইলসের ওপর সোনা হালকা ঘষলে যদি সোনালী রেখা পড়ে তবে তা আসল সোনা; কালো বা কালচে ধূসর রেখা পড়লে তা নকল বা তামার ভেজাল।
- নাইট্রিক অ্যাসিড ড্রপ টেস্ট: জুয়েলার্সদের কাছে গোল্ড টেস্টিং অ্যাসিড থাকে। অ্যাসিড ড্রপ করলে যদি কোনো রাসায়নিক বুদবুদ বা সবুজ বর্ণ ধারণ না করে, তবে সোনা শতভাগ পিওর।
আজকের রূপার বাজারদর (Silver Price)
স্বর্ণের দাম বাড়লেও রূপার বাজারদর বর্তমানে আগের মতোই স্থিতিশীল রয়েছে। বাজুস নির্ধারিত রূপার ক্যাটাগরিভিত্তিক দাম নিচে দেওয়া হলো:
- ২২ ক্যারেট রূপা (প্রতি ভরি): ২,১০০ টাকা।
- ২১ ক্যারেট রূপা (প্রতি ভরি): ২,০০৬ টাকা।
- ১৮ ক্যারেট রূপা (প্রতি ভরি): ১,৭১৫ টাকা।
- সনাতন পদ্ধতির রূপা (প্রতি ভরি): ১,২৮৩ টাকা।
স্বর্ণের দাম ও ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: ২২ ক্যারেট ও ২১ ক্যারেট সোনার মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: ২২ ক্যারেট সোনায় ৯১.৬% খাঁটি সোনা এবং ৮.৪% অন্যান্য মিশ্র ধাতু থাকে, যা গহনাকে শক্ত ও স্থায়ী রূপ দেয়। অন্যদিকে ২১ ক্যারেট সোনায় ৮৭.৫% খাঁটি সোনা থাকে। আন্তর্জাতিকভাবে ও বৈশ্বিক বাজারে ২২ ক্যারেটকে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রশ্ন: স্বর্ণ কেনার জন্য কি জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) প্রয়োজন হয়?
উত্তর: বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং (AML) গাইডলাইন ও বাজুসের বিধি অনুযায়ী, বড় অঙ্কের নগদ লেনদেনে (বিশেষ করে লক্ষাধিক টাকার কেনাকাটায়) স্বচ্ছতার স্বার্থে গ্রাহকের এনআইডি ও ফোন নম্বর ক্যাশ মেমোতে লিপিবদ্ধ করা বাধ্যতামূলক।
প্রশ্ন: ক্যাশ মেমো ছাড়া কি পুরোনো সোনা বিক্রি করা সম্ভব?
উত্তর: মূল ক্রয়ের ক্যাশ মেমো না থাকলে যেকোনো জুয়েলার্স সোনা কিনতে অনীহা প্রকাশ করতে পারে অথবা নিরাপত্তার স্বার্থে অতিরিক্ত পুলিশি ভেরিফিকেশন ও অতিরিক্ত ৫-১০% কর্তন করতে পারে। তাই সোনা কেনার ক্যাশ মেমো আজীবন সযত্নে সংরক্ষণ করুন।
Post a Comment